ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বিজয়ের মাস

বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে মুক্তিযোদ্ধারা

বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে মুক্তিযোদ্ধারা
×

প্রতীকী ছবি

ইফতেখারুল ইসলাম

প্রকাশ: ১১ ডিসেম্বর ২০২৪ | ০০:৪৯ | আপডেট: ১১ ডিসেম্বর ২০২৪ | ০৮:০৩

আজ ১১ ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালের এই দিনে মুক্তিবাহিনী বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। একদিকে স্থানীয়ভাবে যোদ্ধারা সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের পরাস্ত করছিল, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের পক্ষে জোরালো সমর্থন গড়ে ওঠে। দেশের বিভিন্ন জেলা একের পর এক শত্রুমুক্ত হতে থাকে। এর মধ্যে ছিল খুলনা, সিলেট, নড়াইল, দিনাজপুর, রংপুর, সৈয়দপুর, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, টাঙ্গাইল। মুক্তিযোদ্ধারা বিভিন্ন অঞ্চলে পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে লড়ে তাদের পরাস্ত করেন। সরকারি বিভিন্ন দপ্তর বোমা মেরে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে জোট বাঁধে ভারতীয় সেনারা।

১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর নওগাঁ জেলার মধ্যে রাণীনগর উপজেলা প্রথম শত্রুমুক্ত হয়। ৯ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনারা রাণীনগর থানা, পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বাড়িঘর ঘেরাও করে। এক পর্যায়ে সম্মুখ যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা লুৎফুর রহমান শহীদ হন। পরদিন পরিস্থিতি বদলে যায়। রাণীনগরবাসী গেরিলা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে সম্মুখে অগ্রসর হতে থাকে। এতে পাকিস্তানি সেনারা পিছু হটে এবং এক পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে।

৯-১০ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে লড়ে মাদারীপুর স্বাধীন করেন। দু’দিনের মতো যুদ্ধ করে মাদারীপুরবাসী শত্রুমুক্ত হয়। ১০ ডিসেম্বর ঘটকচর ব্রিজ পার হওয়ার সময় মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি সেনাদের ওপর হামলা চালান। এতে পাকিস্তানি বাহিনী বেকায়দায় পড়ে গিয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হয় এবং মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পরাজয় বরণ করে নেয়। যুদ্ধে পাকিস্তান বাহিনীর ১৯-২০ জন সৈন্য নিহত হয়। একই দিন খুলনার বটিয়াঘাটায় মুক্তিবাহিনীরা স্থানীয় একটি রাজাকার ক্যাম্পে অতর্কিতে হামলা চালিয়ে শত্রুদের হটিয়ে দেন। এদিন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পাকিস্তানি বাহিনী মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনীর সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে আত্মসমর্পণ করে।

১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীর যুদ্ধ বাধে। মিত্রবাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে মুক্তিযোদ্ধারা দুর্গাপুর অঞ্চল থেকে আশুগঞ্জ আক্রমণ করেন। যোদ্ধাদের আরেকটি দল ভৈরব সেতুর আশুগঞ্জ অংশ ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেন। এ সময় যৌথ বাহিনীর হামলায় হানাদার বাহিনীর ব্যাপক ক্ষতি হয়। যুদ্ধের এক পর্যায়ে পাকিস্তান বাহিনী পিছু হটে এবং ভৈরবের দিকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।

৯ ডিসেম্বর ভোলায় পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ বাধে। মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি সেনাদের ঘিরে ফেলে। দিনের প্রথম প্রহরে পাকিস্তানিরা মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর হামলা করে। এতে কমান্ডার কাজী জয়নাল আহমেদের নেতৃত্বে মুক্তিসেনারা পাল্টা হামলা চালান। অভিযানে সর্বস্তরের জনসাধারণ শরিক হয়ে পাকিস্তানি সেনাদের ধাওয়া দেয়। এভাবে ভোলা শহরের মানুষ শত্রুমুক্ত হয়।

এ ছাড়া ১০ ডিসেম্বর শত্রুমুক্ত হয় মাদারীপুর, ভোলা ও নড়াইল। নড়াইলে যোদ্ধারা সংগঠিত হয়ে পাকিস্তানিদের সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে লড়াই করে। শুরুতেই পাকিস্তানি সেনারা আত্মসমর্পণ করতে রাজি হয়নি; কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা কয়েকটি দলে সম্মুখ যুদ্ধে গিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের পরাস্ত করেন। এভাবেই একের পর এক জেলা-উপজেলা স্বাধীন হতে থাকে। 

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ১১-১২ ডিসেম্বর গুরুত্বপূর্ণ দুটি দিন। ওই সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী বঙ্গোপসাগরে নোঙর করে। ১৩ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে রাশিয়া রণতরী প্রেরণ করলে আন্তর্জাতিক মঞ্চে উত্তেজনা আরও বাড়তে থাকে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ একটি আন্তর্জাতিক লড়াইয়ের ক্ষেত্রে পরিণত হয়। এদিন যশোরে আওয়ামী লীগের অধীনে প্রথমবারের মতো জনসভার আয়োজন করা হয়। স্বাধীনতার আগমুহূর্তে এটিই গুরুত্বপূর্ণ এক জনসমাবেশ। পরিস্থিতি ধীরে ধীরে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসছে। যশোরের এ ঘটনা তারই বার্তা দেয়। জনসভায় দাঁড়িয়ে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। আরও উল্লেখযোগ্য দিক হলো, এতে তাৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ‘স্বাধীনতা অর্জন করেছি’ এবং খুব শিগগির বাকি অঞ্চলগুলো স্বাধীন হবে বলে ঘোষণা দেন।

১৯৭১ সালের ১১ ডিসেম্বর ঢাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছিল। দুপুরে অনির্দিষ্টকালের জন্য জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। খুলনা, যশোর, বগুড়া, রংপুর, টাঙ্গাইল, জামালপুর, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন জায়গায় হানাদার বাহিনীর সঙ্গে মিত্রবাহিনীর তুমুল যুদ্ধ বাধে। একের পর এক যুদ্ধে পাকবাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে থাকে। তখন নেতৃবৃন্দ জনগণের কাছে স্বাধীনতার স্পষ্ট বার্তা দিতে আরম্ভ করেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কয়েক দিন পরেই পাকিস্তানি সেনাদের হাতে দেশের বহু মেধাবী সন্তানকে প্রাণ দিতে হবে। এরই মধ্যে পাকিস্তানি সেনারা রাজাকারদের সঙ্গে মিলে সেই নীলনকশা বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে।

আরও পড়ুন

×