না বদলাতেই তোলপাড়
রাজবংশী রায়
প্রকাশ: ২৭ জুন ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ২৭ জুন ২০২০ | ১৫:১৬
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) নিয়ে নতুন সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে যে, অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদকে সরিয়ে তার স্থলে অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার এক কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। এতে চিকিৎসক নেতাসহ স্বাস্থ্য খাতে কর্মরতদের পাশাপাশি এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
করোনা পরিস্থিতি প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতার পাশাপাশি অনিয়ম-দুর্নীতি সামাল দিতে না পারার দায়ে অধ্যাপক আজাদের অপসারণ চাইলেও তার স্থলে কোনো আমলাকে চান না বলে জানিয়েছেন অনেকে। তারা চিকিৎসকদের মধ্য থেকেই সৎ, যোগ্য ও দক্ষ কাউকে মহাপরিচালক পদে নিয়োগ দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান।
কয়েকজন চিকিৎসক নেতা বলেছেন, আমলা নিয়োগ দিলে স্বাস্থ্যসেবা বন্ধ করে তারা অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘটের ডাক দিতে পারেন। কর্মসূচি ঠিক করতে আজ রোববার জরুরি সভা ডেকেছে চিকিৎসকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ)। সংগঠনের এক শীর্ষ নেতা সমকালকে জানান, মহাপরিচালক পদে চিকিৎসক ছাড়া কাউকে নিয়োগ দিলে তার প্রতিবাদে কী কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে, তা এ সভায় চূড়ান্ত করা হবে।
তিনি বলেন, চিকিৎসক সমাজকে নিয়ে কোনো ষড়যন্ত্র সহ্য করা হবে না। এ জন্য যা যা করতে হবে, বিএমএ সারাদেশের চিকিৎসকদের ঐক্যবদ্ধ করে তার সবকিছুই করবে।
করোনা পরিস্থিতিতে ব্যর্থতার জন্য অধ্যাপক আজাদের ওপর ক্ষুব্ধ সরকারের হাইকমান্ডও। তাকে যে কোনো সময় সরিয়ে দেওয়া হতে পারে- এমন গুঞ্জনও আছে। এ পরিস্থিতিতে অপসারণ এড়াতে এ ধরনের গুজব ছড়িয়ে চিকিৎসকদের মধ্যে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এমনটি করা হতে পারে বলে ধারণা করছেন অনেকে। ডিজি পদে কোনো আমলাকে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে কিনা, সরকারের উচ্চ পর্যায়ও তা নিশ্চিত করতে পারেনি। স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেও এ বিষয়ে অবগত নন বলে সমকালকে জানিয়েছেন।
বিএমএ ও স্বাচিপ নেতাদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া :মহাপরিচালক পদে কোনো আমলাকে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি প্রথমে প্রকাশ করেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সভাপতি অধ্যাপক ডা. এ ইকবাল আর্সলান। গতকাল শনিবার বিকেলে ফেসবুকে তিনি এ নিয়ে একটি স্ট্যাটাস দেন। এতে তিনি লেখেন, 'আমরা অবগত হয়েছি, প্রশাসনের উচ্চপর্যায় থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে সিএমএসডির মতো আমলা পদায়নের পাঁয়তারা করছেন। আপনারা ইতোমধ্যেই গণতন্ত্রের মানসকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা ও তার সরকারকে বিব্রত করেছেন। আপনাদের ব্যর্থতার দায় অন্যের ঘাড়ে চাপাবেন না, আর বেশি ধৃষ্টতা দেখাবেন না। এ ধরনের কোনো পদক্ষেপ এ দেশের চিকিৎসক সমাজ কোনোভাবেই মেনে নেবে না। যারা এই ষড়যন্ত্র করছেন, তাদের হুঁশিয়ার করছি, আমাদের এই করোনাকালে সর্বাত্মক আন্দোলনে বাধ্য করবেন না।' বহু লোক তার এই স্ট্যাটাসটি শেয়ার করেছেন। লাইক এবং কমেন্ট পড়েছে শত শত। প্রায় প্রত্যেকেই স্বাচিপ সভাপতিকে সমর্থন করেছেন।
একই সময়ে ফেসবুকে আরেকটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন চিকিৎসকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী। তিনি লিখেছেন, 'আমরা এখন এক চরম দুর্যোগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আমাদের দুঃসময়ের একমাত্র কাণ্ডারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার প্রতি আমাদের অবিচল আস্থা। আমাদের লক্ষ্য করোনা প্রতিরোধ। রোগীদের পাশে থাকা আমাদের অঙ্গীকার। সুযোগ বুঝে অনেকে ষড়যন্ত্রের জাল বোনার চেষ্টা করছেন। যারা নিজেদের আখের গুছিয়ে অধিদপ্তরের বারোটা বাজিয়েছেন, তারা আবারও সক্রিয়। নিশ্চিত করে বলতে পারি, তাদের সফল হওয়ার সুযোগ নেই। আমাদের যারা দুর্বল ভাবেন, তারা ভুল করবেন। যে কোনো অপশক্তি ও দুরভিসন্ধি মোকাবিলায় করোনাকালেও আমরা প্রস্তুত।'
ফেসবুকের স্ট্যাটাসের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএমএ মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী সমকালকে বলেন, চিকিৎসকের পরিবর্তে অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার একজন আমলাকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদে নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে তারা বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পেরেছেন। এরপরই ওই স্ট্যাটাস দেওয়া হয়েছে।
বিএমএ মহাসচিব বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গঠিত হওয়ার পর সবসময় একজন চিকিৎসক এই পদে নিয়োগ পেয়ে আসছিলেন এবং এটি চিকিৎসকদের জন্য নির্ধারিত একটি পদ। কিন্তু করোনার এই দুর্যোগে চিকিৎসকদের কাছ থেকে এই পদটি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে একটি চক্র। করোনা পরিস্থিতি নিয়ে অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম-দুর্নীতিসহ সার্বিকভাবে ব্যর্থতার কারণে বর্তমান মহাপরিচালকে সরিয়ে যোগ্য ও দক্ষ কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার কথা আমরা সবসময় বলে আসছি। কিন্তু তার স্থলে কোনো আমলাকে আমরা চাইনি। চিকিৎসক সমাজের মধ্য থেকে সৎ, যোগ্য ও দক্ষ- এমন কাউকে এই পদে দায়িত্ব দেওয়া হবে এমনটি আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম। কিন্তু এখন শুনতে পাচ্ছি, একজন আমলাকে দেওয়া হবে। এটি তো হতে পারে না। আমলার কি জনস্বাস্থ্য সম্পর্কিত জ্ঞান আছে? তাহলে তার নাম আসবে কেন?
এই কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী বলেন, জনস্বাস্থ্য সম্পর্কিত করোনা দুর্যোগের এই সময়ে কোনো ষড়যন্ত্র করা হলে তারা বসে থাকবেন না। এজন্য যা যা করতে হয়, তার সবকিছুই করা হবে। সব চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে কার্যক্রম বন্ধ করে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘটের মতো কর্মসূচিও গ্রহণ করা হবে। সুতরাং এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্নিষ্টরা সার্বিক বিষয় বিবেচনায় নেবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ডা. ইকবাল আর্সলান সমকালকে বলেন, অন্যান্য খাতের মতো স্বাস্থ্য খাতের ওপরও আমলাদের শ্যেনদৃষ্টি পড়েছে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরকে তারা আমলাকরণ করেছে। সেখানে চিকিৎসকদের চাকর-বাকর করে রাখা হয়েছে। সর্বশেষ কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের পরিচালক পদে দীর্ঘদিনের রেওয়াজ ভেঙে একজন আমলাকে বসানো হয়েছে। এখন তাদের নজর পড়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওপর। একজন আমলা কি জনস্বাস্থ্যবিদ। আমলার কি জনস্বাস্থ্য সম্পর্কিত কোনো জ্ঞান আছে? আমলা স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার কী বুঝবেন? তাহলে একজন আমলাকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদে বসানোর আয়োজন কেন?
স্বাচিপ সভাপতি বলেন, যেসব মানুষ প্রধানমন্ত্রীকে এসব বুদ্ধি দিচ্ছেন তারা সরকারের ভালো চান নাকি ক্ষতি করতে চাইছেন, তা নিয়ে আমি সন্দিহান। করোনার এই দুর্যোগে সবকিছুতে তালগোল পাকিয়ে তারা সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে চাইছেন। না হলে এমন সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হবে? চিকিৎসক ছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদে অন্য কাউকে কোনোদিনই মেনে নেওয়া হবে না। এজন্য যা যা করা প্রয়োজন চিকিৎসক সমাজ সবকিছু করতে সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে এবং তা এই করোনার দুর্যোগের মধ্যেই করা হবে।
জনস্বাস্থ্যবিদরাও ক্ষুব্ধ : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদে কোনো আমলাকে নিয়োগ দেওয়া হলে সেটি সবচেয়ে অগ্রহণযোগ্য ঘটনা হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে যেসব আমলা আছেন, জনস্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় তাদের বোঝাতেই তো আমরা দিশেহারা হয়ে পড়ি। এখন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের মতো একটি টেকনিক্যাল পদের দায়িত্ব তাদের দেওয়া হলে তারা কী করবেন? এমবিবিএস পাসের পর ধাপে ধাপে উচ্চ শিক্ষার বিভিন্ন কোর্স সম্পন্ন করে মাঠ পর্যায়ে কাজের মধ্য দিয়ে একজন চিকিৎসক তৈরি হন। এভাবে একজন জ্যেষ্ঠ চিকিৎসককে মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। যার জনস্বাস্থ্য সম্পর্কিত জ্ঞানের পাশাপাশি একাডেমিক ও প্রশাসনিক ভালো দক্ষতা থাকতে হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদে এভাবেই নিয়োগ হয়ে আসছে।
ক্ষোভ প্রকাশ করে ডা. নজরুল ইসলাম আরও বলেন, একজন আমলাকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলে স্বাস্থ্য খাতের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও যেন তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়। মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ, বিভিন্ন বিভাগের চেয়ারম্যান, বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক, সিভিল সার্জন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা এসব পদ বাদ থাকবে কেন? আর দেশের মেডিকেল শিক্ষারই বা প্রয়োজন কী? বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসার দায়িত্বও তারা পালন করুক। তাহলে তো সবকিছুই তাদের হাতে থাকবে।
বিএমএর সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব সমকালকে বলেন, চিকিৎসদের ওপর আস্থাহীনতার কারণে এমন সিদ্ধান্ত হতে পারে। এমনটি হলে চিকিৎসকরা তাদের ওপর কীভাবে আস্থা রাখবেন? এখন কোনো কিছুতে অবাক হই না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদে আসবেন আমলা? এটি কীভাবে হতে পারে? কারা এটি করছেন? তারা কি দেশের কিংবা জনগণের ভালো চাইছেন নাকি অন্য কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে এসব কাজ করছেন- এগুলো জানা প্রয়োজন। যদি এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত আসে, তাহলে চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্য খাতের সবার উচিত হবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। এখানে কাউকে ছাড় দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সমকালকে বলেন, এসব বিষয়ে তিনি অবগত নন। তা ছাড়া তাকে কেউ কিছু জানায়ও নি। সুতরাং এ বিষয়ে মন্তব্য করার কিছু নেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে করোনা দুর্যোগ মোকাবিলায় সবাই কাজ করে যাচ্ছেন। সুতরাং প্রধানমন্ত্রী যখন যে সিদ্ধান্ত দেবেন সে অনুযায়ী কাজ করে যাবেন বলে জানান তিনি।