শ্রমিকের বদলে ভেকু দিয়ে দুই খাল খনন, মিল নেই নকশার
নকশার সঙ্গে মিল নেই খননকাজের। মরে গেছে দুই পাড়ের গাছের চারা। মাদারগঞ্জ উপজেলার আদারভিটা ইউনিয়নের পলিশা-দুধিয়াগাছা খাল সমকাল
মাদারগঞ্জ (জামালপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৪৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
মাদারগঞ্জ উপজেলায় দুটি খাল খনন প্রকল্প বাস্তবায়নে নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পে শ্রমিক নিয়োগের কথা থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশ কাজ ভেকু মেশিন দিয়ে করা হয়েছে। একই সঙ্গে শ্রমিক মজুরির জন্য বরাদ্দের প্রায় ৫০ শতাংশ অর্থ ফেরত পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী খননকাজ না হওয়া, রাস্তার ক্ষতি এবং রোপণ করা গাছ মারা যাওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন (পিআইও) কার্যালয়ের তথ্যমতে, আদারভিটা ইউনিয়নের পলিশা খাল খননের জন্য এক কোটি ২৭ লাখ ৪৪ হাজার ৭১০ টাকা এবং চরপাকেরদহ ইউনিয়নের তেঘরিয়া খাল খননের জন্য এক কোটি ১৫ লাখ ৯ হাজার ৮৩০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কর্মসৃজন প্রকল্পের আওতায় শ্রমিক দিয়ে খাল দুটি খনন করার কথা ছিল। প্রকল্প দুটির উদ্বোধন করেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত এবং জামালপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল। উদ্বোধনের সময় তেঘরিয়া খালে প্রতীকীভাবে মাথায় মাটি বহন করে কাজের সূচনা করেন তারা।
তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় শ্রমিকের পরিবর্তে ভেকু মেশিন ব্যবহার করা হয়েছে বলে স্বীকার করেছেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) তাজ উদ্দিন। তাঁর ভাষ্য, কর্মসৃজন প্রকল্পে শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ছিল ৫০০ টাকা। বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে ওই মজুরিতে শ্রমিক পাওয়া সম্ভব না হওয়ায় প্রকল্প কমিটির সিদ্ধান্তে শ্রমিক মজুরির প্রায় ৫০ শতাংশ অর্থ ফেরত পাঠানো হয়। পরে ‘নন-ওয়েজ কস্টের’ আওতায় ভেকু মেশিন ব্যবহার করে অধিকাংশ খননকাজ সম্পন্ন করা হয়।
পিআইওর দাবি, পলিশা খালের প্রায় ৭৮ শতাংশ এবং তেঘরিয়া খালের প্রায় ৭৯ শতাংশ খননকাজ ভেকু মেশিনে করা হয়েছে। অবশিষ্ট কাজ শেষ করতে পুনরায় বরাদ্দ চাওয়া হবে। নতুন বরাদ্দ পাওয়া গেলে অসমাপ্ত কাজ ও প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করা হবে।
তবে সরেজমিন দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। প্রকল্প অনুযায়ী খালের গভীরতা ১০ ফুট, নিচের প্রস্থ (বটম) ১২ ফুট, ওপরের প্রস্থ (টপ) ৪০ ফুট এবং দুই পাশে ৫ ফুট করে রাস্তা থাকার কথা। পাশাপাশি রাস্তার ধারে প্রায় দুই হাজার গাছ লাগানোরও পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু বাস্তবে কোথাও খালের গভীরতা মাত্র ৬ থেকে ৭ ফুট, কোথাও নিচের প্রস্থ ৮ থেকে ১০ ফুট এবং অধিকাংশ স্থানে ওপরের প্রস্থ ৪০ ফুটের অনেক কম পাওয়া গেছে। দুই পাশের রাস্তার প্রস্থও কোথাও এক ফুট, কোথাও দেড় ফুট, আবার কোথাও আড়াই ফুটের বেশি নয়।
এদিকে উপজেলার পশ্চিম পলিশা থেকে দুধিয়াগাছা পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার খাল খননের আরেকটি প্রকল্পেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের দাবি, জনবহুল একটি সড়কের পাশ থেকে অতিরিক্ত মাটি কাটার কারণে রাস্তার গাইডওয়াল ধসে পড়েছে। এতে সড়কটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে এবং যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এ ছাড়া খালের পাড়ে রোপণ করা অধিকাংশ বনজ ও ফলদ গাছ ইতোমধ্যে মারা গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা শরাফত জানান, এগুলো নিয়ে কথা বলতে গেলেই সমস্যায় পড়তে হয়। আপনারা দেখে বুঝতে পারছেন খাল খননের কাজ কেমন হয়েছে।
কোয়ালিকান্দী এলাকার এক শ্রমিক বলেন, ‘কাজের অভাবে পরিবার নিয়ে কষ্টে আছি। ভেবেছিলাম খাল খননের কাজে শ্রমিক হিসেবে কাজ পাব, কিন্তু সেই সুযোগ হয়নি।’
আদারভিটা ইউনিয়নের খাল খনন প্রকল্পের সভাপতি রকির দাবি, নিয়ম অনুযায়ী কাজ করেছেন তারা। অতিবৃষ্টির কারণে খালের দুই পাড়ের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নতুন বরাদ্দ এলে সেগুলো মেরামত করা হবে। প্রকল্পের মোট বরাদ্দের প্রায় ৫০ শতাংশ ফেরত দেওয়া হয়েছে।
মাদারগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমন চৌধুরীর ভাষ্য, শ্রমিক মজুরির অর্থ ফেরত দেওয়া হয়েছে। ‘নন-ওয়েজ’ খাতের অর্থ দিয়ে ভেকু মেশিনে খনন ও গাছ লাগানো হয়েছে। খননের গভীরতা ঠিক ছিল, বিষয়টি ঢাকার তদন্ত দলও পরিদর্শন করেছে। অতিবৃষ্টির কারণে রাস্তা ধসে এবং মাটি ভরাট হয়ে কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পুনরায় বরাদ্দ পাওয়া গেলে সংস্কার করা হবে।
- বিষয় :
- খাল