ঢাকা বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬

ঢাকার দুই সিটি

পাঁচ বছরেও চালু হয়নি ড্রেনেজ সার্কেল

জলাবদ্ধতা নিরসনে কোনো লোকবল নেই

পাঁচ বছরেও চালু হয়নি ড্রেনেজ সার্কেল
×

রাজধানীর রোকেয়া সরণির তালতলা লায়ন্স অগ্রগতি স্কুলের সামনের ড্রেন। সম্প্রতি তোলা সমকাল

 অমিতোষ পাল

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৪৭ | আপডেট: ১৫ জুলাই ২০২৬ | ০৯:৫৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

ভারী বৃষ্টিতে গত রোববার রাজধানী ঢাকার বেশির ভাগ এলাকা ডুবে যায়। যেসব এলাকায় কখনও পানি ওঠে না, সেখানেও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা প্রায় স্থবির হয়ে যায়। জলাবদ্ধতা নিরসনে দুই সিটি মাঠে কুইক রেসপন্স টিম নামায়। এতসব ঘটনার পর সামনে এলো, জলাবদ্ধতা নিরসনের কাজে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের কোনো লোকবলই নেই।

একসময় রাজধানীতে জলাবদ্ধতা হলেই সিটি করপোরেশনের সঙ্গে ঢাকা ওয়াসার রশি টানাটানি চলত। সিটি করপোরেশন বলত, জলাবদ্ধতা নিরসনের দায়িত্ব ওয়াসার। ওয়াসা বলত, সিটি করপোরেশনের। শেষ পর্যন্ত জলাবদ্ধতার ভোগান্তি থেকে নগরবাসীকে মুক্তি দিতে ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ঢাকার দুই সিটির তৎকালীন মেয়র ও ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালকের উপস্থিতিতে ওয়াসার ড্রেনেজ (পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ) সার্কেলকে আনুষ্ঠানিকভাবে দুই সিটি করপোরেশনে স্থানান্তর করা হয়। খাল ও নালা রক্ষণাবেক্ষণই এই সার্কেলের মূল কাজ। তবে গত সাড়ে পাঁচ বছরের বেশি সময়ে দুই সিটি করপোরেশন নিজস্ব ড্রেনেজ সার্কেল চালু করতে পারেনি। এমনকি ওয়াসার যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সিটি করপোরেশনে দেওয়া হয়েছিল, তারাও ওয়াসায় ফিরে গেছেন। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় এখনও ড্রেনেজ সার্কেলে লোকবল নিয়োগ হয়নি।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে ও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ড্রেনেজ সার্কেল স্থানান্তরের সময় ঢাকা ওয়াসা দুই সিটি করপোরেশনকে লোকবল ও আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম দিতে চেয়েছিল। তবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কোনো জনবল ও যন্ত্রপাতি নেয়নি। তখন ওয়াসার ড্রেনেজ সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলী, সহকারী প্রকৌশলীসহ ৪৫ জন জনবলকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু তারা কোনো যন্ত্রপাতি নেয়নি। এর বছরখানেকের মধ্যে ওই কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ঢাকা ওয়াসায় ফিরে যেতে আবেদন করেন। পরে সবাই পুরোনো কর্মস্থলে ফিরে যান। 

ওয়াসার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওয়াসায় ফেরত নেওয়া প্রসঙ্গে ঢাকা ওয়াসার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম শহিদ উদ্দিন সমকালকে বলেন, যাদের সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল, তাদের কোনো কাজ দেওয়া হতো না। এমনকি বসার জায়গাও দেওয়া হয়নি। এ জন্য তারা ক্ষোভ-অপমানে ওয়াসায় ফিরে আসেন। আর তারা যেহেতু ওয়াসারই জনবল ছিল, এ জন্য ওয়াসা ফেরত নিয়েছে। এ ধরনের ক্ষেত্রে কেউ ফিরে আসতে চাইলে আইনগত বাধাও থাকে না। 

রাজধানীর ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পাওয়ার পর ২০২১ সালের মার্চে নিজস্ব ড্রেনেজ সার্কেলের জন্য উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন পৃথক অর্গানোগ্রাম (জনবল কাঠামো) তৈরি করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়। গত সাড়ে পাঁচ বছরে সেই অর্গানোগ্রামের চূড়ান্ত অনুমোদন মেলেনি। ফলে বর্ষা মৌসুম হলে সিটি করপোরেশনের অন্য বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দিয়ে জলাবদ্ধতা নিরসনের কাজ করানো হচ্ছে। অথচ তাদের কেউই ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। 

নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, দুই সিটি করপোরেশন থেকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে ড্রেনেজ সার্কেলের জন্য যে জনবল কাঠামো (অর্গানোগ্রাম) পাঠানো হয়, তাতে দুজন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, পাঁচজন নির্বাহী প্রকৌশলী (পুরঃ), দুজন নির্বাহী প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ), দুজন নির্বাহী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) ছিল। এ ছাড়া প্রত্যেক নির্বাহী প্রকৌশলীর অধীনে দুজন করে সহকারী প্রকৌশলী ও দুজন করে উপসহকারী প্রকৌশলী পদ ছিল। পাশাপাশি ব্যক্তিগত সহকারী, উচ্চমান সহকারী, অফিস সহকারী, মুদ্রাক্ষরিকসহ বিভিন্ন পদের লোক মিলিয়ে ছিল মোট ১৫৬ জন। কিন্তু এত জনবল দিতে মন্ত্রণালয় অনাগ্রহ প্রকাশ করে। এরপর বছরের পর বছর চলে চিঠি চালাচালি। সর্বশেষ গত ২৬ জানুয়ারি দুই সিটি করপোরেশনের জন্য ৩১ জন করে জনবল কাঠামো অনুমোদন দেয় স্থানীয় সরকার বিভাগ। এরপর সেটা যায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় যাচাই-বাছাই শেষে সম্প্রতি সেটা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে আর্থিক অনুমোদনের জন্য। বর্তমানে তা অর্থ মন্ত্রণালয়ে আছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর জনবল কাঠামো যাবে আইন মন্ত্রণালয়ে। তারপর যাবে সচিব কমিটিতে। এরপর চূড়ান্ত হবে। 

জনবল কাঠামো অনুমোদনে বিলম্ব প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (সিটি করপোরেশন) রবিউল ইসলাম সমকালকে বলেন, এটা সে সময় যারা ছিল, তারাই ভালো বলতে পারবে। 
জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজ সমকালকে বলেন, ‘তারা (মন্ত্রণালয়) বিভিন্ন ধরনের কোয়েরি (প্রশ্ন) দেয়। অনেক তথ্য চেয়ে পাঠায়। সেটার উত্তর দিতে হয়। এ জন্য দেরি হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ে যাওয়ার পর আবার তারা এ রকম কোয়েরি দিয়ে পাঠিয়েছে।’ তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত তিনি বলতে চাননি।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী খন্দকার মাহবুব আলমের কাছে জানতে চাইলে তিনি কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। শুধু বলেন, ‘শুনেছি, আমরা যে জনবল কাঠামো পাঠিয়েছিলাম, সেটা কাটছাঁট করে অনুমোদন দিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এত বড় সিটির ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার জন্য এটা কম হয়ে যায়।’

দেখা গেছে, যে জনবল কাঠামো অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর পদ আছে একটি, পুরঃ, বিদ্যুৎ ও যান্ত্রিকের নির্বাহী প্রকৌশলী আছে মোট তিনজন। সহকারী প্রকোশলী আছে তিনজন, উপসহকারী তিনজন ছাড়া ব্যক্তিগত সহকারী একজন, উচ্চমান সহকারী কাম হিসাবরক্ষক দুজন, জিআইএস অপারেটর একজন, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক দুজন ও কার্যসহকারী আছে ছয়জন। সব মিলিয়ে রয়েছে মোট ৩১ জন।

কিন্তু ঢাকা ওয়াসার সাবেক এমডি এ কে এম শহীদউদ্দিন জানান, ওয়াসার ড্রেনেজ সার্কেলেও তাদের ৬২ জন লোক ছিল। তাহলে এত কম জনবল দিয়ে কীভাবে রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনের কাজ হবে। তার পরও এই সার্কেলের দ্রুত কার্যক্রম শুরু করা দরকার। তা না হলে সমস্যা আরও বাড়বে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শেখ মুহাম্মদ মেহেদী আহসান সমকালকে বলেন, অর্গানোগ্রাম (জনবল কাঠামো) অনুমোদনের বিষয়টি বাংলাদেশে জটিল করে রাখা হয়েছে। সিটি করপোরেশন হলো একটা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। তাদের জনবলের বেতন দেয় সিটি করপোরেশন। যদি সরকারের রাজস্ব তহবিল থেকে এসব জনবলের বেতন হতো, তাহলে তারা এতসব কোয়েরি দিতে পারতেন। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণেই আমাদের দেশে কাজের গতি আসে না। এ ছাড়া মন্ত্রণালয়ে কারিগরি জনবল না থাকাও একটি সমস্যা।

 

আরও পড়ুন

×