ঢাকা বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬

পানের দাম পাচ্ছেন না চাষি অনেকে ভাঙছেন বরজ

পানের দাম পাচ্ছেন না চাষি অনেকে ভাঙছেন বরজ
×

মোস্তফা কামাল, কিশোরগঞ্জ

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৪০

| প্রিন্ট সংস্করণ

কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার পান চাষের জন্য প্রসিদ্ধ এলাকা গোবিন্দপুরের চাষিরা সিন্ডিকেটের কারণে ন্যায্যমূল্য না পেয়ে পুঁজি হারাচ্ছেন। কেউ কেউ ক্ষতির বোঝা টানতে না পেরে জমিতে হাজার হাজার পানগাছ রেখেই বরজ ভেঙে ফেলছেন। গতকাল মঙ্গলবার গোবিন্দপুর ইউনিয়নের মধ্য গোবিন্দপুর ও উত্তর পানান এলাকায় গিয়ে এমন দৃশ্য দেখা গেছে।
পানচাষিরা বলছেন, হোসেনপুর উপজেলায় প্রায় ৫০০ জন পানচাষি আছেন। এর মধ্যে গোবিন্দপুর ইউনিয়নেই আছেন প্রায় ৪০০ জন। এই এলাকাটি পান চাষের জন্য বেশ উর্বর। লাভজনক অর্থকরী ফসল হওয়ায় যুগ যুগ ধরে এই এলাকায় ব্যাপকভাবে পান চাষ হয়ে আসছে। কিন্তু দু-তিন বছর ধরে একটি সিন্ডিকেটের কারণে পানচাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বাজারে যে দাম পাওয়া যায় তাতে খরচের টাকাও উঠছে না। এতে পুঁজিতে টান পড়েছে।

উত্তর পানান এলাকায় গিয়ে দেখা যায় বর্ষীয়ান পানচাষী আব্দুল কাদির তাঁর পানের বরজ ভেঙে ফেলছেন। তিনি জানান, তিন বছর ধরে ১৮ শতাংশ জমিতে পান চাষ করছেন। সপ্তাহে অন্তত ৪০ বিড়া (১৬০টি পাতায় এক বিড়া) পান তুলতে পারতেন। মাসে অন্তত ২০ হাজার টাকা খরচ হয়। আগে এক বিড়া পান পাইকারি বিক্রি হতো ২০০ টাকায়। এখন তা নেমে এসেছে ৫০ থেকে ৬০ টাকায়! এভাবে পানচাষ করা যাবে না। এই তিন বছরে তাঁর দুই লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এই বরজ টিকিয়ে রাখলে ক্ষতির মাত্রা বাড়তেই থাকবে। যে কারণে মনের ক্ষোভে বরজ ভেঙে ফেলছেন। এই জমিতে অন্য ফসল চাষ করবেন বলে জানান তিনি। 
একই এলাকার আবু সিদ্দিক ৫৩ শতাংশ জমিতে পান চাষ করেছেন। শ্রমিক দিয়ে পুরো জমির পান তুলতে খরচ হবে প্রায় ৭০ হাজার টাকা। কিন্তু বিক্রি করা যাবে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকায়। এ কারণে সময় পেরিয়ে গেলেও জমিতেই পান পড়ে আছে।

মধ্য গোবিন্দপুর এলাকার আরেক পানচাষি শুকুর মামুদ বলেছেন, তিনি ৪১ শতাংশ জমিতে পান চাষ করেছেন। সপ্তাহে অন্তত ৯০ বিড়া পান তোলা যায়। কিন্তু দাম কম থাকায় পান আহরণ করছেন না। পানের বয়স বেড়ে গিয়ে গাছ থেকে ঝরে পড়ছে। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখা ছাড়া কোনো উপায় নেই। একই এলাকার চাষি স্বপন মিয়া ৩৬ শতাংশ, শাহজাহান মিয়া ২৭ শতাংশ, বাবুল মিয়া ১৮ শতাংশ, এরশাদ মিয়া ১০ শতাংশ জমিতে পান চাষ করেছেন। তারাও অন্য চাষিদের মতোই ক্ষতির কারণে জমি থেকে পান তুলছেন না। আরও অনেক পানচাষি একইভাবে করুণ অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন।
গোবিন্দপুর চৌরাস্তা বাজারে পানের হাট বসে শনি, সোম, মঙ্গল ও শুক্রবার। পানচাষিরা বলেছেন, তারা হাটের দিন জমির পান নিয়ে যান পাইকারদের কাছে বিক্রির জন্য। বিভিন্ন এলাকা থেকে ১৫-২০ জন পাইকার আসেন পান কিনতে। কিন্তু বাজার কমিটির সভাপতি আব্দুর রশিদের নেতৃত্বে কয়েকজনের একটি সিন্ডিকেট অন্য পাইকারদের পান কিনতে বাধা দেয়। এ কারণে পানচাষিরা সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন। আব্দুর রশিদ এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, বাজার তো আর একটা না। চাষিরা তাহলে অন্য হাটেও পান নিয়ে যেতে পারেন।  
জেলা খামারবাড়ি সূত্রে জানা গেছে, জেলায় গত ২০২৪-২৫ মৌসুমে ১৪৫ হেক্টর জমিতে পানের আবাদ হয়েছিল। এর মধ্যে হোসেনপুর উপজেলায় ছিল ৩২ হেক্টর। এখানে লালডিংগি, সাচি, গয়াসুর ও গ্যাচ জাতের পানের আবাদ হয়ে থাকে। চলতি ২০২৬-২৭ মৌসুমের হিসাব এখনও প্রস্তুত করা হয়নি। 
চাষিরা অভিযোগ করেছেন, তারা বহু বছর ধরে পানের আবাদ করছেন। কিন্তু পান চাষ ভালো হচ্ছে কিনা, দাম ভালো পাচ্ছেন কিনা, কোনো পরামর্শ লাগবে কিনা এসব জানতে হোসেনপুরের কোনো কৃষি কর্মকর্তা আসেন না। হোসেনপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ মহসিন এ অভিযোগ নাকচ করে বলেন, প্রতিটি ইউনিয়নে একাধিক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আছেন। তারা সবসময় এলাকা পরিদর্শন করেন। তিনি বলেন, চাষিরা পানের দামের বিষয়ে কিছু জানাননি। তিনি বলেন, গত মৌসুমে ৩২ হেক্টর জমিতে পানের আবাদ হলেও এবার ৩০ হেক্টরে হয়েছে। তিনি মনে করেন, নিচু এলাকা হওয়ার কারণে এবার আবাদ কমে গেছে। 

আরও পড়ুন

×