ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিচার বিভাগ পৃথক্‌করণ দিবস আজ

উচ্চ আদালতের নির্দেশনা কার্যকর হয়নি এক যুগেও

উচ্চ আদালতের নির্দেশনা কার্যকর হয়নি এক যুগেও
×

আবু সালেহ রনি

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০১৯ | ১৩:৩৬

আজ ১ নভেম্বর। বিচার বিভাগ পৃথক্‌করণ দিবস। সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুসারে ২০০৭ সালের এই দিনে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করা হয় বিচার বিভাগকে। ওই রায়ে বিচার বিভাগ পৃথক্‌করণের লক্ষ্য পূরণে অধস্তন আদালতের বিচারকদের পদোন্নতি-সংক্রান্ত বিধিমালা প্রণয়নসহ ১২ দফা নির্দেশনা দেন। যেগুলোর অধিকাংশই পৃথক্‌করণের এক যুগেও বাস্তবায়ন করেনি সরকার। হয়নি বিচার বিভাগের নিজস্ব পৃথক সচিবালয়ও। ফলে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসেনি বিচার বিভাগে; বরং মামলাজট বেড়েছে দুই গুণ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচার বিভাগ পৃথক্‌করণ-সংক্রান্ত মাসদার হোসেন মামলার রায়ে সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া ১২ দফা নির্দেশনার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়ায় উচ্চ আদালতের স্বাধীনতা থমকে আছে। পৃথক সচিবালয় গঠন না হওয়ায় স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। কারণ, এখনও বিচারকদের পদোন্নতি, বদলি ও পদায়নের বিষয়গুলোতে আইন মন্ত্রণালয়ই প্রাধান্য পাচ্ছে। ঢাকার বাইরে আবাসন, যাতায়াত, নিরাপত্তাসহ কয়েকটি সমস্যাও বিচারকদের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে। যদিও পৃথক সচিবালয় গঠন করে সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় এসব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব।

তবে বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয়ের প্রয়োজন নেই বলে মন্তব্য করেছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। তার মতে, বিশ্বের কোনো গণতান্ত্রিক বা অগণতান্ত্রিক দেশেই বিচার বিভাগের জন্য আলাদা সচিবালয় নেই। ভবিষ্যতে যাই হোক, এখন যে ব্যবস্থা বিদ্যমান, বিচার বিভাগের জন্য সেটাই ভালো।

অবশ্য অধস্তন আদালতের বিচারকদের সমস্যা সমাধানে সরকার সচেষ্ট রয়েছে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। তিনি সমকালকে বলেন, 'সরকার মামলাজট কমানোকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে তা কমানোর জন্য নিরলস চেষ্টা করে যাচ্ছে। বিচার কাজ ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে বিচারকের সংখ্যা বাড়াতে এবং এজলাস সংকট নিরসনে বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্যও এসেছে।'

আইনমন্ত্রীর মতে, মামলার দ্রুত বিচার ও নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হলো এজলাস সংকট। এ সংকট দূর করে সর্বোচ্চ কর্মঘণ্টা ব্যবহার করে বিচার কাজে গতিশীলতা আনতে সরকার কাজ করছে। মামলা ব্যবস্থাপনার দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। এ পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়িত হলে সারাদেশে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসবে।

বিচারাধীন মামলা বেড়েছে :২০০৭ সালের ১ নভেম্বর বিচার বিভাগ পৃথক্‌করণের সময় দেশের সব আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল ১৫ লাখ ৭০ হাজার। বর্তমানে দেশের সব আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ৩৭ লাখ। এর মধ্যে অধস্তন আদালতে বিচারাধীন মামলা ৩০ লাখ ৮৮ হাজার ২৯১টি। সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিচার বিভাগ পৃথক্‌করণের সময় ২০০৭ সালে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতগুলোতে বিচারাধীন মামলার জট ছিল পাঁচ লাখ ৬৩ হাজার। গত এক যুগে এ জট বেড়ে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে নয় লাখ ১৬ হাজার ৭২৯টি। অর্থাৎ প্রায় চার লাখ মামলা বেড়েছে। সার্বিকভাবে অধস্তন আদালতে অন্যান্য শাখায় মামলাজট বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। ২০১৯ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত দেশের অধস্তন আদালতগুলোতে বিচারাধীন দেওয়ানি মামলার সংখ্যা ১৩ লাখ ৩৩ হাজার ১১৭টি এবং বিচারাধীন ফৌজদারি মামলার সংখ্যা ১৭ লাখ ৫৫ হাজার ১৭৪টি। এর মধ্যে সিজেএম ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতগুলোতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছয় লাখ ৪৮ হাজার ৬০৩টি এবং সিএমএম ও মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতগুলোতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা দুই লাখ ৬৮ হাজার ১২৬টি। ম্যাজিস্ট্রেট আদালতগুলোতে বিচারাধীন মোট মামলার সংখ্যা নয় লাখ ১৬ হাজার ৭২৯টি।

আলোচনাতেই নেই পৃথক সচিবালয় :মাসদার হোসেন মামলার রায় অনুসারে সুপ্রিম কোর্টে বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় গঠন ও এর প্রয়োজনীয়তা জানিয়ে ২০১২ সালের ১৯ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি চিঠি দেওয়া হয়। এ চিঠিতে প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে সচিবালয় নির্মাণের কার্যক্রম উদ্বোধনের জন্য দিন ও সময় চাওয়া হয়েছিল। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন এই চিঠি পাঠান। কিন্তু সাত বছরেও চিঠির কোনো জবাব মেলেনি।

এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এএম আমিন উদ্দিন বলেন, বিচার বিভাগে কাজের পরিধি বর্তমানে অনেক বেড়েছে। এসব কাজের সবকিছুই সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনকে দেখতে হয়। ফলে অনেকাংশে সমন্বয়হীনতা দেখা দেয়। পৃথক সচিবালয় হলে বিচার প্রশাসন আরও গতিশীল হবে।

মামলাজট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আদালতের প্রতি মানুষের আস্থা বেড়েছে। তাই যে কোনো প্রতিকারের জন্য তারা আদালতে ছুটে আসছেন। কিন্তু বিচার বিভাগ পৃথক্‌করণের পর সরকার চাইলেও এককভাবে কোনো কিছু করতে পারে না। তাই মামলাজট নিরসনের জন্য সরকার ও বিচার প্রশাসনকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।

অবশ্য সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেনের মতে, কোনো রাজনৈতিক সরকারই চায়নি বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করুক। এই পৃথক্‌করণকে কার্যকর করতেই সর্বোচ্চ আদালত ১২ দফা নির্দেশনা দিয়েছিলেন। কিন্তু পৃথক সচিবালয় না হওয়ায় বিচারকদের পদোন্নতি-বদলিসহ অনেক কিছুই আইন মন্ত্রণালয় থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহ্‌দীন মালিক বলেন, বিচার বিভাগে দ্বৈত শাসন এখন বৈধতা পেয়েছে। তবে এর অধীনে পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা পেলে এই সংকট অনেকটাই কেটে যাবে। এ জন্য প্রয়োজনে আইনি লড়াইও চালাতে হবে।

সুফলও আছে :মাসদার হোসেন মামলার রায় অনুযায়ী সরকার ইতোমধ্যে অধস্তন আদালতের বিচারক নিয়োগের জন্য পৃথক জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন গঠন করেছে। এর আওতায় এ পর্যন্ত ১২টি পরীক্ষা হয়েছে। বর্তমান সরকারের টানা তিনটি মেয়াদে ২০০৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত অধস্তন আদালতে ৮৭৬ জন সহকারী জজ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আরও ১০০ জন সহকারী জজ নিয়োগের কার্যক্রম প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ২০০৭ সালের আগে সরকারি কর্মকমিশনের আওতায় বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে সহকারী জজ পদে নিয়োগ দেওয়া হতো। এ ছাড়া দেশের ৬৪ জেলায় অধস্তন আদালতের জন্য বহুতল ভবন নির্মাণ, বিদেশে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, স্বতন্ত্র পে-স্কেল প্রণয়ন, কয়েকটি স্তরে গাড়ি সুবিধা দেওয়াসহ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।

বিচার বিভাগের জন্য বাজেটে বরাদ্দও বেড়েছে। যদিও তা পর্যাপ্ত নয়। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতগুলোর জন্য বাজেট বরাদ্দ করা হয়েছে ২৭৩ কোটি ৮২ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। এ ছাড়া জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসি পদের সংখ্যা কয়েক বছরে বেড়েছে। সব মিলিয়ে ম্যাজিস্ট্রেটের সংখ্যা ৬৮৬টি। তবে বিচারকস্বল্পতার কারণে কর্মরত ম্যাজিস্ট্রেটের সংখ্যা অনুমোদিত পদের চেয়ে কম।

প্রেক্ষাপট :১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সরকারের নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে পৃথক করা-সংক্রান্ত মাসদার হোসেন বনাম সরকার মামলার যুগান্তকারী রায় ঘোষণা করেন। রায়ে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা করার জন্য সরকারকে ১২ দফা নির্দেশনা দেন সর্বোচ্চ আদালত। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা হয়ে ৩০১ জন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা নিয়ে বিচার বিভাগের কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে অধস্তন আদালতে এক হাজার ৭৯০ জন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা কাজ করছেন।

আরও পড়ুন

×