ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬

বন্যায় বিপদে আমনচাষিরা

বন্যায় বিপদে আমনচাষিরা
×

ফাইল ফটো

জয়নাল আবেদীন

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২০ | ১২:০০

সিলেটের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার রসুলপুর গ্রামের কৃষক জহুর মিয়া তিন মণ বীজ ফেলেছিলেন আমন ধানের। উজানের ঢলে তলিয়ে যায় সেই বীজতলা। পানি সরে যাওয়ার পর নতুন করে বীজ ফেলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে পুনরায় উজানের ঢল ধেয়ে আসে কিনা, সে চিন্তায় ঘুম নেই তার। বারবার বীজতলা করার সামর্থ্য নেই এই কৃষকের।
বিশ্বম্ভরপুরের পাশাপাশি সিলেটের আরও কয়েকটি উপজেলায় মৌসুমের শুরুতেই ধাক্কা খেলেন আমনচাষিরা। তবে কোনো কোনো এলাকায় পানি সরে যাওয়ায় জোরেশোরে বীজতলায় মন দিয়েছেন তারা। অবশ্য এই ভাগ্য হয়নি উত্তরাঞ্চলের কৃষকদের। সেদিকে এখনও মাইলের পর মাইল জমি পানির নিচে। অনেকে শুরুর দিকেই বীজতলা করে ফেলেছিলেন। অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলে প্রায় পুরোটাই নষ্ট হয়ে গেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পুনরায় বীজ ফেলতে সরকারের সহযোগিতা চান তারা।
কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, এবার দেশে ৫৯ লাখ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ হয়েছে এক কোটি ৫৬ লাখ টন। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) থেকে ইতোমধ্যে সাড়ে ১৯ হাজার টন ধানের বীজ চাষিপর্যায়ে বিক্রির জন্য ২০ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে উৎপাদনের আশার মধ্যেই বন্যার প্রকোপ বেড়ে চলায় চ্যালেঞ্জ বাড়ছে। বন্যা দীর্ঘতর হলে অনেক অঞ্চলে আমনের আবাদ ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলছে, আজ শুক্রবার থেকে উজানের ঢলে বড় নদীগুলোর পানি আরও বাড়বে। প্লাবিত হতে পারে নতুন নতুন এলাকা। এই বন্যার স্থায়িত্ব হতে পারে প্রায় এক মাস। দেশের অন্তত অর্ধেক জেলায় বন্যার প্রভাব পড়তে পারে। অন্যদিকে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলেছে, মধ্য আগস্ট পর্যন্ত আমনের আবাদ করা যাবে। ১৫ থেকে ২০ দিন বয়সী চারা রোপণ করতে হলে জুলাইয়ের মধ্যেই বীজতলা প্রস্তুত করতে হবে। ফলে চলতি মাসজুড়ে বন্যার এই অবস্থা বিরাজ করলে বীজ লাগানোই হবে বড় চ্যালেঞ্জের বিষয়।
সংশ্নিষ্টরা বলছেন, বন্যার স্থায়িত্ব দীর্ঘ হলে জনদুর্ভোগের পাশাপাশি ফসলের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। ইতোমধ্যে তলিয়ে গেছে আমনের অনেক বীজতলা। অবশ্য বন্যা পরিস্থিতি সরকার পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক। বিশেষ করে আমনসহ বিভিন্ন ফসলের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে রাখার কথা জানান মন্ত্রী। মঙ্গলবার সরকারি বাসভবন থেকে একটি অনলাইন অনুষ্ঠানে কৃষিমন্ত্রী এ তথ্য দিয়েছিলেন।
বন্যার জন্য আমন চাষ ব্যাহত হলে খাদ্য নিরাপত্তায় সরকারের জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে বলে মনে করছেন খাদ্য সচিব ড. নাজমানারা খানুম। চলমান বন্যা পরিস্থিতি ইতোমধ্যে আমনের জন্য বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে উল্লেখ করে তিনি সমকালকে বলেন, 'চলমান বন্যা পরিস্থিতিতে আউশের খুব একটা ক্ষতি হচ্ছে না। তবে আমনের বীজতলার জন্য বড় ধরনের সংকট তৈরি হচ্ছে। আমন মার খেলে সরকারের জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। এ জন্য কৃষকদের বেশি বেশি সচেতন করা উচিত। তারা যেন উঁচু জমিতে বীজতলা তৈরি করেন। পরিস্থিতি খুব বেশি প্রতিকূলে থাকলে এ মুহূর্তে বীজতলা না করাই ভালো।'
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. আবদুল মুঈদ সমকালকে বলেছেন, বন্যা পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে তারা নতুন একটি পরিকল্পনা নিয়ে রেখেছেন। মেশিনের মাধ্যমে চারা রোপণের অংশ হিসেবে বীজতলার ট্রে পদ্ধতির দিকে ঝুঁকছেন তারা। অবশ্য পরীক্ষামূলক হওয়ায় খুব বেশি সম্প্রসারিত হচ্ছে না এই উদ্যোগ। পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজনীয় উপজেলাগুলোর ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি প্রয়োগ করা হবে।
তিনি বলেন, প্রতি বিঘা বীজতলার জন্য ২৫টি ট্রে দরকার হয়। প্রতি উপজেলার জন্য ১৫ থেকে ২০ বিঘা বীজতলা নির্মাণের মতো ট্রে সরবরাহ করার প্রস্তুতি রয়েছে তাদের। বন্যার পানি সরতে দেরি হলে জমিতে বাঁশের মাচা বানিয়ে ট্রেতে বীজতলা নির্মাণ করার নির্দেশনা দেওয়া হবে। তবে সে রকম পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে না বলেই আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বীজতলা এবং অনেক বীজ মজুদ থাকার কথা উল্লেখ করে ড. মুঈদ জানান, এখন পর্যন্ত যে পরিস্থিতি তাতে ভয়ের কিছু নেই। বিভিন্ন এলাকায় উঁচু জমি লিজ নিয়ে বীজতলা তৈরির পরিকল্পনাও তাদের রয়েছে। আগাম বন্যায় আমনের বীজতলায় তেমন প্রভাব পড়েনি। তবে বন্যা দীর্ঘতর হলে বিপদ বাড়বে। তখন বীজতলা করার সময় পাওয়া যাবে না।

আরও পড়ুন

×