ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬

নৌ-আদালতের বিচার চলছে দুর্বল আইনে

নৌ-আদালতের বিচার চলছে দুর্বল আইনে
×

ওয়াকিল আহমেদ হিরন

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২০ | ১২:০০

দেশে গত ২০ বছরে অসংখ্য নৌদুর্ঘটনায় কয়েক হাজার মানুষ মারা গেলেও তাদের স্বজনরা বিচার পাননি। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর নৌ-আদালতে (মেরিন কোর্ট) মামলা হয়েছে। এরপর তদন্ত ও দোষী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু দুর্বল নৌ-আইনে করা মামলায় ফাঁকফোকর এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশে বছরের পর বছর বিচার প্রক্রিয়া আটকে যায়।
আইনজীবীরা বলছেন, যে কোনো অবহেলায় মৃত্যু গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। এই অপরাধের বিচারে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে অপরাধও নিয়ন্ত্রণে আসবে না।
জানা গেছে, বিগত ২৪ বছরে সংশ্নিষ্টদের অবহেলায় লঞ্চ বা নৌদুর্ঘটনায় নিরপরাধ অসংখ্য মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। ১৯৯৬, ৯৭, ২০০২, ২০০৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত যত মামলা হয়েছে, আসামিরা প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে উল্লেখযোগ্য কোনো মামলায় তাদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার হয়নি। হতাহতের স্বজন পাননি কোনো ক্ষতিপূরণ। এসব দুর্ঘটনার পর আদালতে যেসব মামলা দায়ের হয়েছে তা আজও চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়নি। এদিকে, দুর্ঘটনা কমাতে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার এবং ক্ষতিগ্রস্তদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে সংশ্নিষ্ট আইনগুলো আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে নৌ-মন্ত্রণালয়ে সম্প্রতি প্রস্তাবিত সুপারিশ পাঠানো হয়েছে।
সর্বশেষ গত ২৯ জুন মুন্সীগঞ্জের কাঠপট্টি থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসা 'মর্নিং বার্ড' নামের লঞ্চকে সদরঘাটের কাছে বুড়িগঙ্গায় ধাক্কা দেয় 'ময়ূর-২' নামের বড় লঞ্চ। এতে মর্নিং বার্ড ডুবে যায় এবং ৩৪ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় ময়ূর-২ লঞ্চের মালিক, মাস্টারসহ সাতজনের বিরুদ্ধে কেরানীগঞ্জ থানায় ১ জুন দণ্ডবিধির ৩০৪(ক) ধারায় 'অবহেলাজনিত মৃত্যু'সহ ২৮০, ৩৩৭ ও ৩৪ ধারায় মামলা হয়।
৩০৪(ক) ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি অপরাধজনক নরহত্যা নয় এমন কোনো বেপরোয়া বা তাচ্ছিল্যপূর্ণ কাজের মাধ্যমে কারও মৃত্যু ঘটালে পাঁচ বছর কারাদ ও অর্থদে দি ত হবে। বেপরোয়া নৌযান সম্পর্কিত ২৮০ ধারায় ছয় মাসের কারাদ এবং ৩৩৭ ধারা অনুযায়ী বিপজ্জনক কাজের মাধ্যমে আঘাতের জন্য ছয় মাসের কারাদে র বিধান রয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ বলছেন, এ ধরনের মামলায় তিন-চারটি ধারা সংযোজিত করে আসামির বিরুদ্ধে ৮-৯ বছরের সাজা দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। তবে অধিকাংশ সাজা একই সঙ্গে কার্যকর হওয়ায় সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সাজাই বহাল থাকে।
নৌ-আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি (পিপি) অ্যাডভোকেট পারভীন সুলতানা বলেন, লঞ্চ মালিকরা প্রভাবশালী। তারা দুষ্টু প্রকৃতির, তাদের আইনের আওতায় আনা কঠিন। তা ছাড়া নৌ-আদালতের আইনটা অনেক দুর্বল, সাজাও কম। এটাকে আরও যুগোপযোগী ও আধুনিক করতে আমরা সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠিয়েছি।
সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ সমকালকে বলেন, লঞ্চডুবির ঘটনা স্পষ্টত ফৌজদারি অপরাধ। দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত। প্রচলিত যে আইনটা আছে সেটা অনেক দুর্বল। এটাকে আরও যুগোপযোগী ও শক্তিশালী করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
জানা যায়, ২০০৩ সালের ৮ জুলাই চাঁদপুরের মেঘনা নদীর মোহনায় এমভি নাসরিন লঞ্চ ডুবে ১১০ জনের মৃত্যু হয়। নিখোঁজ ছিল কমপক্ষে ২০০ জন। এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ১২১টি পরিবারকে প্রায় ২৯ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের মামলা করলেও গত ১৭ বছরে তা চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়নি, যা এখন এখন সর্বোচ্চ আদালতে বিচারাধীন।
এদিকে, মতিঝিল বিআইডব্লিউটিএ ভবনের আটতলায় শিপিং অধিদপ্তরে একটি নৌ-আদালত রয়েছে। ঢাকার সিএমএম আদালতের অধীনে এই কোর্টের দায়িত্বে আছেন যুগ্ম ও দায়রা জজ জয়নাব বেগম। জানা গেছে, এ আদালতে বর্তমানে এক হাজার ৫৭০টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
পিপি পারভীন সুলতানা আরও বলেন, দেশে নৌদুর্ঘটনায় শুধু প্রাণহানির ঘটনায় করা ১৮টি মামলা এ আদালতে চলমান। আসামিপক্ষ খুবই চতুর ও প্রভাবশালী। সাজা হওয়ার পর তারা দু-এক বছর জেলে থাকার পর উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে বের হয়ে আসেন। এ ছাড়া সাক্ষীদেরও খুঁজে পাওয়া যায় না। এসব কারণেই মামলার বিচার বিলম্বিত হচ্ছে।


আরও পড়ুন

×