ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬

'হাতে-পায়ে ধরতাম তবু নির্যাতন থামত না'

'হাতে-পায়ে ধরতাম তবু নির্যাতন থামত না'
×

বকুল আহমেদ

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২০ | ১২:০০

'দিনে আট ঘণ্টা কাজ করিয়ে মাসে ১২০ দিনার (প্রায় ৩৩ হাজার টাকা) বেতনের চুক্তিতে এমপি কাজী শহীদ ইসলাম পাপুলের কোম্পানি কুয়েতে নিয়ে যায় আমাকে। সেখানে নিয়ে আট ঘণ্টার পরিবর্তে প্রতিদিন ১৬ ঘণ্টা কাজ করানো হতো। কিন্তু বেতন দিত ১০০ দিনার। প্রতিবাদ করলেই কুয়েতে পাপুলের অফিসে ডাকা হতো। একটি রুমে আটকে রেখে তার নির্দেশে লাঠিসোটা দিয়ে মারধর করত তার লোকজন। হাতে-পায়ে ধরতাম, কিন্তু নির্যাতন থামত না। বলত- আমরা যেভাবে বলব, সেভাবেই কাজ করতে হবে। না হলে মাসের পর মাস ঘরে আটকে রেখে নির্যাতন চালানো হবে। ভয়ে তাদের কথা মতোই কাজ করতাম।' এ কথাগুলো কুয়েতে নির্যাতনের শিকার আব্দুল আলিম ওরফে আলিমের।
এক বছর ১১ মাস প্রবাস জীবনের মাথায় গত ১৬ জুন তিনিসহ ১১ জন কুয়েত থেকে দেশে ফিরে এসেছেন। মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে গত মঙ্গলবার রাজধানীর মতিঝিল থানায় কাজী শহীদ ইসলাম পাপুলসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন আলিম। অন্য তিন আসামি হলেন- রেজাউল করিম, রাশেদ এবং মনির। রেজাউল ও রাশেদ আপন দুই ভাই। তাদের বাড়ি টাঙ্গাইল জেলায়। তারা কুয়েতে পাপুলের কোম্পানির ম্যানেজার। সে দেশেই থাকেন তারা। অজ্ঞাত আরও ১০-১২ জনকে আসামি করা হয়েছে। আলিম জানান, তার বাড়ি নওগাঁ জেলা সদরের আদমদুর্গাপুরে। তিনি কৃষিকাজ করতেন। সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে কুয়েতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। মারাফি কুয়েতিয়া গ্রুপে কাজের জন্য কাজী শহিদ ইসলাম পাপুলের প্রতিষ্ঠান সাত লাখ টাকার বিনিময়ে তাকে ২০১৮ সালের জুলাই মাসে কুয়েতে নিয়ে যায়। কুয়েতে একটি মার্কেটে কাজ দেওয়া হয় তাকে। আট ঘণ্টার পরিবর্তে ১৬ ঘণ্টা কাজ করানো হতো। আট ঘণ্টা কাজে মাসে বেতন চুক্তি ছিল ১২০ দিনার, কিন্তু ১৬ ঘণ্টা কাজ করিয়ে বেতন দিত ১০০ দিনার। তিনি প্রতিবাদ করে বলেছিলেন, আট ঘণ্টার চুক্তিতে কুয়েতে আনা হয়েছে। এর বেশি কাজ করতে পারব না। বেশি কাজ করলে বেতন বাড়াতে হবে। এর পরই তার ওপর নেমে আসে নির্যাতনের খড়্‌গ। পাপুলের অফিসে নিয়ে একটি কক্ষে আটকে নির্যাতন করা হতো প্রায়ই। শুধু আলিম নন, তার সঙ্গে থাকা সব কর্মচারীকেই একইভাবে নির্যাতন করা হতো। মার্কেটে এক বছর দুই মাস কাজ করানোর পর তাকেসহ কয়েকজনকে সে দেশের বিমানবন্দরে শ্রমিকের কাজে দেয় পাপুলের প্রতিষ্ঠান। বিমানবন্দরে ১২ ঘণ্টা ডিউটি করানো হতো। বিমানবন্দরে মাসিক বেতন ছিল ৮০ দিনার, যা বাংলাদেশের ২২ হাজার টাকা। বিমানবন্দরে যাত্রীদের লাগেজ বহন করে আলিম প্রতিদিন ১০-১২ দিনার অতিরিক্ত আয় করতেন। এ থেকেও প্রতিদিন আট দিনার নিয়ে নিত পাপুলের কোম্পানি। শুধু তাই নয়, লাগেজ বহন করে টাকা আয় করার কারণে মাসের ৮০ দিনারও হাতিয়ে নিত তারা।
মানব পাচারের অভিযোগে জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে কুয়েতে এমপি কাজী শহীদ ইসলাম পাপুলকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর পরই আলিম, নোয়াখালীর সোহাগ, কুমিল্লার জালাল ও আলামিন, টাঙ্গাইলের রাসেল ও আমজাদ, ময়মনসিংহ ভালুকার শাহআলম, রাজশাহীর রুবেল এবং জামালপুরের আপেল আহমেদসহ ১১ শ্রমিককে কুয়েত পুলিশ আটক করে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ- পাপুলের প্রতিষ্ঠান মারাফি কুয়েতিয়া গ্রুপ তাদের অবৈধভাবে কুয়েতে এনেছে। তারা ছয় দিন সেদেশের পুলিশ হেফাজতে থাকেন। ১৬ জুন দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয় তাদের।
আলিম জানান, কুয়েতে যেতে পাপুলের প্রতিষ্ঠান তার কাছ থেকে সাত লাখ টাকা নিয়েছিল। বেশিরভাগ টাকা এলাকায় ধারদেনা এবং সুদের ওপর নিয়েছিলেন তিনি। খালি হাতে তাকে দেশে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন ওই ঋণ কীভাবে শোধ করবেন তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন দরিদ্র আলিম।
আলিমের দায়ের করা মামলাটি তদন্ত করছেন মতিঝিল থানার এসআই ফারুক হোসেন। তিনি বলেন, 'তদন্তাধীন মামলার বিষয়ে এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না।'
এদিকে কুয়েতে পাপুল গ্রেপ্তার হওয়ার পরপরই পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তার বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে। গত সোমবার মালিবাগে সিআইডি সদর দপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পাপুলের বিষয়ে সাংবাদিকদের বলা হয়- 'ধৈর্য ধরুন। সাক্ষ্য-প্রমাণসহ এ বিষয়ে সময় মতো সব জানানো হবে।'


আরও পড়ুন

×