জবানবন্দিতে নাহিদ ইসলাম
১৯ জুলাই বুঝতে পারি সরকার ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে
শেখ হাসিনার আমলে কোনো দুর্নীতি-হত্যাকাণ্ড হয়নি, দাবি রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীর
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এসেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ২০:৪৪
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ১৯ জুলাই বুঝতে পারি সরকার ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে গেছে। কারণ আন্দোলন ও হতাহতদের কোনো খবর কোনো মিডিয়ায় প্রচার হচ্ছিল না।
আজ বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দেওয়া জবানবন্দিতে এ কথা বলেন তিনি। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বে দুই সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১ এ ৪৭তম সাক্ষী হিসেবে আংশিক জবানবন্দি দেন নাহিদ ইসলাম। আগামীকাল বৃহস্পতিবার তার অবশিষ্ট জবানবন্দি গ্রহণ করা হবে। এরআগে সকালে আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে জেরা শেষ করেন রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন।
জবানবন্দিতে নাহিদ ইসলাম বলেন, গত বছরের ১৪ জুলাই শেখ হাসিনা একটি সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারী ছাত্রদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ এবং ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ অভিহিত করে কোটাপ্রথার পক্ষে অবস্থান নেন। তার এই বক্তব্যে সারাদেশের ছাত্রছাত্রীরা অপমানিত বোধ করেছিলেন। সেই রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা প্রতিবাদমুখর হয়ে রাস্তায় নেমে আসেন।
তিনি বলেন, মূলত এই বক্তব্যের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের ওপর আক্রমণের একটি বৈধতা প্রদান করা হয়। আমরা সবসময় দেখেছি, সরকারের বিরুদ্ধে কোনো ন্যায্য আন্দোলন করা হলে তাদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ আখ্যা দিয়ে আন্দোলনের ন্যায্যতা নস্যাৎ করা হতো।
গত বছরের ১৭ জুলাই ডিজিএফআই তাদের কর্মসূচি প্রত্যাহার এবং সরকারের সঙ্গে সংলাপের জন্য চাপ দেয় বলেও জানান নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, আমাদের বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় মামলা দেওয়া হয়। সারাদেশেই এ ধরনের বাধা সৃষ্টি করা হয়েছিল। তবু সব বাধা অতিক্রম করে তারা আন্দোলন অব্যাহত ছিল।
নাহিদ ইসলাম বলেন, গত বছরের ১৭ জুলাই রাতে দেশব্যাপী ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। ঘোষণার প্রেক্ষিতে পরদিন (১৮ জুলাই) সারাদেশের সর্বস্তরের ছাত্র-জনতা রাস্তায় নেমে আসেন। বিশেষত প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার ছাত্রছাত্রীরা সেদিন রাজপথে ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। আন্দোলনের নেতাদের জীবন হুমকির মুখে পড়ে এবং গ্রেপ্তার এড়াতে তারা আত্মগোপনে চলে যান। সেদিন সারাদেশে অনেক ছাত্র-জনতা আহত ও নিহত হন। সেদিন রাতে সারাদেশে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। একইভাবে ১৯ জুলাই পুলিশ এবং আওয়ামী সন্ত্রাসীরা আন্দোলনরত ছাত্র–জনতার ওপর নির্বিচার গুলি চালায়। এতে অনেক ছাত্র–জনতা আহত ও নিহত হন।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এক দফার এই ঘোষক আরও বলেন, ১৯ জুলাই আমরা বুঝতে পারি যে, সরকার ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে গেছে। কারণ আন্দোলন এবং হতাহতদের কোনো খবর কোনো মিডিয়ায় প্রচার হচ্ছিল না।
জুলাই হত্যাযজ্ঞে জড়িত সব বাহিনীর বিচার দাবি
জুলাই হত্যাযজ্ঞে জড়িত সব বাহিনীর সদস্যকে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, কোনো অপরাধী যেন এই বিচার থেকে রেহাই না পায়।
আজ বিকেলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য প্রদান শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এ পর্যন্ত বিচার কার্যক্রমে সন্তোষ প্রকাশ করেন নাহিদ ইসলাম।
হাসিনার আমলে কোনো দুর্নীতি ও হত্যাকাণ্ড হয়নি
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কোনো হত্যাকাণ্ড কিংবা দুর্নীতি হয়নি বলে দাবি করেছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন।
তিনি বলেন, মাহমুদুর রহমান তার জবানবন্দিতে ১৫ বছরে শেখ হাসিনার শাসনামলে ‘চরম দুর্নীতিপরায়ণ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের শাসন’ তুলে ধরেছেন; তার কোনো ভিত্তি নেই। তার মতে, এ ধরনের মন্তব্য শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। কেননা বাংলাদেশে কোনো মানবতাবিরোধী অপরাধ হয়নি।
তিনি আরও বলেন, কোনো ধরনের হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ দেননি শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামাল। এ কারণে তারা সবাই কমান্ড রেসপনসেবিলিটির আওতাভুক্ত নয়। অর্থাৎ এ মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো অন্যায় সংঘটিত হয়নি। ফলে ‘কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ প্রসঙ্গ এখানে অবান্তর। এ সময় জুলাই অভ্যুত্থানের সময় কোনো হত্যাকাণ্ড ঘটেনি বলে যুক্তি দেন স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী।
তাই হত্যাকাণ্ড প্রতিরোধে নির্দেশ দেওয়া কিংবা পদক্ষেপ নেওয়ার প্রশ্নও ওঠে না। অর্থাৎ যেহেতু কোনো প্রকার হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়নি, সেহেতু হত্যাকাণ্ড বন্ধের নির্দেশ প্রদান বা উদ্যোগ গ্রহণ অবান্তর। এছাড়া গত ১৬ বছরে কোনো ফ্যাসিবাদের উত্থান হয়নি বলেও দাবি করেন এই আইনজীবী।
জেরা শেষে এ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আমির হোসেন বলেন, জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে আমার মক্কেল শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামাল কোনো হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তাদের নির্দেশেও এসব হয়নি। মাহমুদুর রহমান নিজস্ব অভিমত থেকে সাক্ষ্য দিয়েছেন।
