ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ইলিশের দাম বেঁধে দেওয়ার চিন্তা

ইলিশের দাম বেঁধে দেওয়ার চিন্তা
×

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১০:৩৯ | আপডেট: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১১:০৩

ইলিশের অস্বাভাবিক দাম নিয়ন্ত্রণে আকার অনুযায়ী সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়ার সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি)। ইলিশের উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থা নিয়ে তৈরি করা এক সমীক্ষা প্রতিবেদনে এ সুপারিশ করেছে ট্যারিফ কমিশন। গতকাল রোববার প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। 

ট্যারিফ কমিশন বলেছে, প্রথম ধাপে নৌকা বা ফিশিং ট্রলারে ইলিশ ধরার খরচ সর্বনিম্ন ৪৮৪ এবং সর্বোচ্চ ৫০৪ টাকা। এর পর অন্যান্য খরচ যুক্ত হওয়ার পর মোট ব্যয় হয় কেজিপ্রতি সর্বনিম্ন ৬৮৮ থেকে ৭০৬ টাকা। কিন্তু স্থানীয় বাজারে দাম এর চেয়ে অনেক বেশি। এর মূল কারণ হচ্ছে, দাদন ব্যবসায়ীরা ঘাটে মাছের সর্বনিম্ন দর নির্ধারণ করে দেয়। ফলে দাম বেড়ে যায়। দাদন ব্যবসায়ীদের উচ্চ হারে দাম নির্ধারণ নিরুৎসাহিত করতে হবে। সে জন্য সরকার ইলিশের আকার অনুযায়ী সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে দিতে পারে।

ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান মইনুল খান সমকালকে বলেন, ইলিশ দেশীয় পণ্য হলেও বাজারে এর দামের পেছনে কৃত্রিমতার সংযোগ রয়েছে। কেননা, ইলিশ আহরণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বা ডলারের ওঠানামার প্রভাব নেই। সমীক্ষায় চিহ্নিত মূল জায়গা হলো আহরণ-পরবর্তী মধ্য স্বত্বভোগীদের নানা স্তর ও তাদের অতিরিক্ত মুনাফা। তিনি আরও বলেন, মূলত দাদন ব্যবসায়ীদের কারসাজি এর পেছনে বেশি ভূমিকা রাখছে। 

এর আগে সরকার বিভিন্ন সময় ডিম ও মুরগির দাম নির্ধারণ করে দিয়েছিল। এ ছাড়া বর্তমানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মতি নিয়ে ভোজ্যতেলের দাম নির্ধারণ করেন ব্যবসায়ীরা। তবে পণ্যের দর বেঁধে দেওয়ার প্রভাব বাজারে তেমন পড়ে না। 

স্থানীয় দামের চেয়ে রপ্তানি মূল্য কম

দেশে বাজারমূল্যের চেয়ে কম দামে ইলিশ রপ্তানি হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। বর্তমানে স্থানীয় বাজারে এক কেজি ইলিশের দাম (আকারভেদে) সর্বনিম্ন ৯০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ২ হাজার ২০০ টাকা। কিন্তু চলতি মাসে ভারতে রপ্তানি করা প্রতি কেজি ইলিশের দাম পড়েছে গড়ে ১ হাজার ৫৩৪ টাকা। ভারতে এখন পর্যন্ত ৯৭ টনের বেশি ইলিশ রপ্তানি হয়েছে। এই রপ্তানি মূল্যে ব্যবসায়ীরা মুনাফা করছেন। আর স্থানীয় বাজারে ব্যবসায়ীরা অস্বাভাবিক হারে মুনাফা করছেন।

টিসিবির বরাতে ট্যারিফ কমিশন বলেছে, গত চার মাসে ইলিশের দামের ঊর্ধ্বগতি বেশ লক্ষণীয় ছিল। গত জুনে প্রতি কেজি ইলিশের দাম ছিল স্থানভেদে ৬০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা। জুলাইয়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯০০ থেকে দুই হাজার টাকা। আগস্টে সরবরাহ বাড়ার ফলে দাম কিছুটা কমে হয় ৮০০ থেকে দুই হাজার টাকা। তবে সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে ৯০০ থেকে দুই হাজার ২০০ টাকায় উন্নীত হয়। গত পাঁচ বছরে দাম ৫৭ শতাংশ বেড়েছে। 

দাম বাড়ার ১১ কারণ

ট্যারিফ কমিশন ইলিশের দাম বাড়ার পেছনে ১১টি কারণ চিহ্নিত করেছে। এগুলো হলো– চাহিদা থাকলে সরবরাহ কম থাকে। ফলে দাম বেড়ে যায়। সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা মৌসুমে মাছ কিনে সংকটের সময় বাজারে অধিক দামে বিক্রি করে। জ্বালানি তেল ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধির প্রভাব মাছের দামে পড়ে। জেলেদের মজুরি, ট্রলারের খরচ, জাল মেরামত, বরফ ও অন্যান্য কারণে দাম বাড়ে। নদীর নাব্য সংকট ও পরিবেশগত সমস্যার কারণে মাছের প্রজনন ও বিচরণ ক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার প্রভাব পড়ে দামে। নিষিদ্ধ সময়ে মাছ ধরলে প্রজনন কমে। ইলিশ আহরণ থেকে ভোক্তা পর্যায়ে বেশ কয়েকটি হাতবদল হয়, প্রতি ধাপেই দাম বাড়ে। রপ্তানির কারণে স্থানীয় বাজারে ক্রেতার চাপ বাড়ে। এ ছাড়া অবৈধ জালের ব্যবহার, দাদন ব্যবসা, অপ্রতুল বিকল্প কর্মসংস্থানের কারণে ইলিশের দাম বাড়ে।

কমিশনের সুপারিশ

ট্যারিফ কমিশন বলছে, মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য রোধে জেলেদের সমবায় সমিতি গঠন, হাতবদল কমাতে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা এবং উৎপাদন মৌসুমে বড় শহরগুলোতে সরকারি উদ্যোগে ইলিশের বিশেষ বিপণন কেন্দ্র স্থাপন করা যেতে পারে। রাজস্ব বাড়াতে ইলিশের সব ধরনের ব্যবসায়ীকে বাধ্যতামূলক নিবন্ধন ও সনদ দিয়ে করজালের আওতায় আনা, লেনদেনে স্বচ্ছতা আনতে জেলেদের জন্য ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমের প্রচলন ও দাদনের দৌরাত্ম্য কমাতে সহজ শর্তে জামানতবিহীন ব্যাংক ঋণ এবং ক্ষুদ্রঋণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। পাশাপাশি উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থায় আইনের কঠোরভাবে প্রয়োগ, ন্যায্যমূল্য ও সুষম বণ্টনের জন্য নীতি প্রণয়ন ও যৌক্তিক মুনাফা নির্ধারণ করা উচিত।

আরও পড়ুন

×