নানা প্রেক্ষাপটে আগেও ৯ বার স্থাপিত হয় সাব- জেল
সাহাদাত হোসেন পরশ
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৫ | ০৮:৫৫ | আপডেট: ১৮ অক্টোবর ২০২৫ | ১৭:৪৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
ঢাকা সেনানিবাসের একটি ভবনকে সম্প্রতি সাব-জেল বা অস্থায়ী কারাগার ঘোষণা করা হয়েছে। এ নিয়ে চলেছে নানা আলোচনা। যদিও গত ৫৪ বছরে কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারের বাইরে বিশেষ প্রেক্ষাপটে আরও ৯ বার সাব-জেল স্থাপন করা হয়েছে। কার্যক্রম শেষে এসব সাব-জেল গুটিয়ে নেওয়া হয়। শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা ছাড়াও বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্তদের এসব অস্থায়ী কারাগারে রাখা হয়েছিল। সেনানিবাসের ভবনে সাব-জেল স্থাপন এ ধরনের দশম ঘটনা।
১৯৭১ সালে চারটি কেন্দ্রীয় কারাগার, ১৩টি জেলা কারাগার ও ৪৩টি উপকারাগার নিয়ে দেশে জেলখানার যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে ১৪টি কেন্দ্রীয় কারাগার ও ৬০টি জেলা কারাগার রয়েছে। এগুলোর ধারণ ক্ষমতা ৪২ হাজার ৮৭৭ জন। সব মিলিয়ে এখন বন্দি আছে ৭০ হাজারের বেশি। এর বাইরে গত ১২ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে ঢাকা সেনানিবাসের বাশার রোডসংলগ্ন ‘এমইএস বিল্ডিং নম্বর ৫৪’কে অস্থায়ী কারাগার হিসেবে ঘোষণা করেছে সরকার। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তিনটি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হওয়া বর্তমান ও সাবেক ২৫ কর্মকর্তার মধ্যে ১৫ জন বর্তমানে সেনা হেফাজতে রয়েছেন। তারা সেনানিবাসের এ অস্থায়ী কারাগারে থাকবেন। এরই মধ্যে সেনানিবাসের অস্থায়ী কারাগারে জনবল নিয়োজিত করাসহ সার্বিক প্রস্তুতি শুরু করেছে কারা অধিদপ্তর।
এ প্রসঙ্গে কারা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন সমকালকে বলেন, সরকার চাইলে যে কোনো স্থাপনাকে জেল বা সাব-জেল হিসেবে ঘোষণা করতে পারে। জেল কোডের সব বিধিবিধান সাব-জেলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এটি দেখভালের পুরোপুরি দায়িত্ব জেল কর্তৃপক্ষের। বিশেষ কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নেওয়া হয়।
কারা সূত্রে জানা গেছে, এর আগে ২০০৭ সালে এক-এগারোর সময় সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে সংসদ ভবন এলাকার দুটি বাড়ি সাব-জেল ঘোষণা করে সেখানে আটকে রাখা হয়। ওই বছরের জুলাইয়ে চাঁদাবাজির এক মামলায় শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর তাঁকে নেওয়া হয়েছিল শেরেবাংলা নগরে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় বিশেষভাবে তৈরি সাব-জেলে। এর দুই মাস পর আরেকটি আদেশে খালেদা জিয়াকে অন্য এক সাব-জেলে রাখা হয়।
২০০৬ সালে তিনটি সাবজেল স্থাপনের ঘটনা ঘটে। ওই সময় ঝালকাঠিতে একটি সাব-জেল স্থাপন করা হয়। আলোচিত সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাইসহ আরও কয়েকজন সেই সাব-জেলে ছিলেন। পরে তাদের আনা হয় ঢাকায়। এরপর মিরপুরের পাইকপাড়ার একটি সাব-জেলে ছিলেন তারা। সব শেষ তাদের জন্য সাব-জেল করা হয়েছিল চাঁদপুরেও।
১৯৯৬ সালে যশোরে সাব-জেল ঘোষণা করা হয়। পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির যারা আত্মসমর্পণ করেছিলেন, তাদের মধ্যে অনেককে যশোরের ওই সাব-জেলে আটক রাখার ব্যবস্থা করা হয়।
গণআন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালে জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পতনের পর তাঁকে সাব-জেলে রাখা হয়েছিল। গুলশানের ওই সাব-জেলে মাস কয়েক ছিলেন তিনি।
১৯৮২ সালে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পাশের একটি ভবনকে সাব-জেল করা হয়েছিল। ওই সময় বিশেষ ক্ষমতা আইনে স্পেশাল ব্রাঞ্চ যাদের গ্রেপ্তার করত, তাদের সেখানে রাখা হতো। ওই এলাকায় প্রায় একই সময় আরেকটি ভবনকে সাব-জেল হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
এর কার্যক্রম চালু ছিল ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত।
কারাগার সূত্র বলছে, ১৯৭৩ সালে দেশে প্রথম সাব-জেল স্থাপন করা হয় খুলনার বয়রাতে। দালাল আইনের আওতায় ওই সাব-জেলে অনেককে রাখা হয়েছিল। ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত খুলনার ওই সাব-জেল চালু ছিল।
কারা অধিদপ্তরের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, সব সাব-জেল সাধারণত কোনো না কোনো কেন্দ্রীয় কারাগারের তত্ত্বাবধানে থাকে। একজন ডেপুটি জেলার এর দায়িত্বে থাকেন। এর কোনো স্থায়ী জনবল কাঠামো থাকে না। বিশেষ নিরাপত্তার প্রয়োজনে কারারক্ষীদের পাশাপাশি অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সাব-জেলের নিরাপত্তায় থাকেন। জেলা বা কেন্দ্রীয় কারাগারের নিয়মে পরিচালিত হয় সাব-জেল। এর জন্য আলাদা কোনো আইন বা ব্যবস্থা থাকে না। কারাবিধি অনুযায়ী যে বন্দি যে মর্যাদা পেয়ে থাকেন, সাব-জেলের ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রযোজ্য।
কারাবিধি অনুযায়ী বন্দিদের কারাগারে তিন ধরনের ডিভিশন দেওয়া হয়ে থাকে। ডিভিশন-১, ডিভিশন-২ এবং ডিভিশন-৩। বিধিতে বলা হয়েছে, সব বন্দিকে তিনটি ডিভিশনে ভাগ করতে হবে। এর মধ্যে ভালো চরিত্রসংবলিত অনভ্যাসগত বন্দি, সামাজিক মর্যাদাসম্পন্ন শিক্ষিত ও উন্নত জীবনযাপনে অভ্যস্ত বন্দি এবং নিষ্ঠুরতা, মারাত্মক অপরাধ, সম্পদের আত্মসাৎসহ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণে দণ্ডিত নন– এমন ব্যক্তিরা ডিভিশন-১-এর যোগ্য হবেন।
এরাই মূলত প্রথম শ্রেণির বন্দি বলে বিবেচিত হন। আর প্রথম শ্রেণিতে যারা অন্তর্ভুক্ত হবেন তাদের মধ্যে থাকবেন সরকার কর্তৃক প্রকাশিত ‘ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে’র ১ থেকে ১৮ নম্বর পর্যন্ত অবস্থানে থাকা সব সাবেক ব্যক্তি।
এ ছাড়া জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক, বীরউত্তম, বীরবিক্রম ও বীরপ্রতীক বীরত্বসূচক মর্যাদাপ্রাপ্ত ব্যক্তি, স্বাধীনতা পদক ও একুশে পদকপ্রাপ্ত ব্যক্তি, বাণিজ্যিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা সিআইপি, প্রফেসর অব ইমিরেটাস হিসেবে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিরাও ডিভিশন-১-এর সুবিধা পাবেন। এর বাইরে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পরামর্শক্রমে সময়ে সময়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক বিবেচিত ব্যক্তিরাও এ সুবিধা পেতে পারেন।
কারাবিধিতে বলা হয়েছে, বন্দির নিয়োগ করা আইনজীবী এবং আত্মীয়স্বজনকেই এ বিষয়ে কারা কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে হবে। আর তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকলে কারা কর্তৃপক্ষ প্রথমে বন্দিকে ডিভিশন দেবে এবং এরপর বিষয়টি সরকারের কাছে পাঠাবে।
বিধি অনুসারে প্রথম শ্রেণির ডিভিশনপ্রাপ্ত প্রত্যেক বন্দির জন্য আলাদা রুম থাকে। খাট, টেবিল, চেয়ার, তোশক, বালিশ, তেল, চিরুনি, আয়না সবকিছুই থাকে। আর তাঁর কাজকর্ম করে দেওয়ার জন্য আরেকজন বন্দিও দেওয়া হয়। পুরুষ বন্দির ক্ষেত্রে সাহায্যকারী হিসেবে পুরুষ আর নারী বন্দির জন্য একজন নারী থাকবেন। তা ছাড়া তিনি বইপত্র পাবেন এবং তিনটি দৈনিক পত্রিকা পাবেন। সাধারণ বন্দিদের চেয়ে ডিভিশনপ্রাপ্ত বন্দির খাওয়ার মানও ভালো থাকে।
এতে আরও বলা হয়েছে, নাগরিকত্ব নির্বিশেষে সামাজিক মর্যাদা, শিক্ষা এবং অভ্যাসের কারণে জীবনযাপনের ধরন উচ্চমানের বন্দিরা ডিভিশন-২ প্রাপ্তির যোগ্য হবেন। অভ্যাসগত বন্দিরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই শ্রেণির বহির্ভূত হবেন না, সরকারের অনুমোদন বা পুনর্বিবেচনার শর্তে শ্রেণি বিভাজনকারী কর্তৃপক্ষকে বন্দির চরিত্র এবং প্রাক-পরিচিতির ভিত্তিতে এ শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্তির জন্য ক্ষমতা দেওয়া হবে। যেসব বন্দি ডিভিশন ১ ও ২-এর অন্তর্ভুক্ত নন, তারা তৃতীয়টির অন্তর্ভুক্ত হবেন।
