খোকার মরদেহ ঢাকায় পৌঁছাবে বৃহস্পতিবার সকালে
ফাইল ছবি
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০১৯ | ১৩:০৪ | আপডেট: ০৪ নভেম্বর ২০১৯ | ১৩:২৩
অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকার মরদেহ বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা ১০ মিনিটে এমিরেটস এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে ঢাকায় পৌঁছার কথা রয়েছে। রাজধানীর জুরাইন কবরস্থানে মা-বাবার কবরের পাশে তাকে সমাহিত করার প্রস্তুতি রয়েছে।
সোমবার বাংলাদেশ সময় দুপুর ১টা ৫০ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের মেমোরিয়াল স্লোন ক্যাটারিং ক্যান্সার সেন্টার হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা স্ত্রী ইসমত হোসেন, একমাত্র মেয়ে সারিকা সাদেক, দুই ছেলে প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন, ইশফাক হোসেনসহ অসংখ্য রাজনৈতিক সহকর্মী-সহমর্মী রেখে গেছেন।
মুক্তিযুদ্ধের ক্র্যাক প্লাটুনের এই গেরিলা যোদ্ধা দীর্ঘ পাঁচ বছর দুরারোগ্য কিডনি ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন। তার মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে। নিউইয়র্কের জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারে তার প্রথম জানাজা হয়েছে। জানাজার আগে প্রবাসী মুক্তিযোদ্ধারা তার প্রতি সম্মান জানান। সেখানে বাংলাদেশ দূতাবাসের আনুষ্ঠানিকতা শেষে তার মরদেহ দেশে আনা হবে।
বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা সাদেক হোসেন খোকার মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তারা মুক্তিযুদ্ধে সাদেক হোসেন খোকার অবদানের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে বলেন, বর্ষীয়ান এই রাজনীতিকের মৃত্যুতে এ দেশ একজন দেশপ্রেমিককে হারাল। এ শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়।
সাদেক হোসেন খোকা তার বর্ণময় জীবনে ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে একসময় তরুণদের নজর কাড়েন। পরে মুক্তিযুদ্ধের যোদ্ধা ও সংগঠক এবং ঢাকার অন্যতম প্রভাবশালী নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন তিনি। পর্যায়ক্রমে জনপ্রতিনিধি, মন্ত্রী, অবিভক্ত ঢাকার নগরপিতাও ছিলেন টানা ১০ বছর।
যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুর্নীতির মামলায় সাজা হয় সাদেক হোসেন খোকার। সেখানে থাকা অবস্থায় ২০১৭ সালে তার পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর তিনি আর পাসপোর্ট পাননি বলে তার পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। খোকার শ্যালক শফিউল আলম আজম খান সংবাদমাধ্যমকে জানান, পরিবারের পক্ষ থেকে খোকার মৃতদেহ ঢাকায় আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ট্রাভেল ডকুমেন্টস হাতে পাওয়ার পরই খোকার মরদেহ ঢাকায় আনার সময়ক্ষণ নির্ধারণ করা হবে।
সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ও তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বিএনপির এই ভাইস চেয়ারম্যানের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে তার মরদেহ দেশে আনার বিষয়ে সরকার সহযোগিতা করবে বলে জানিয়েছেন।
সাদেক হোসেন খোকার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, সাদেক হোসেন খোকা শুধু একজন রাজনীতিক ছিলেন না, ছিলেন জনদরদি বীর মুক্তিযোদ্ধা। তার এই অসময়ে চলে যাওয়া শুধু দলের জন্যই নয়, দেশের জন্যও বড় ক্ষতি। মির্জা ফখরুল বলেন, সরকারের নির্যাতনের ফলে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তাকে মামলা দিয়ে সাজা দেওয়া হয়েছিল।
তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, খোকার লাশ দেশে আনতে 'সর্বাত্মক' সহযোগিতা করা হচ্ছে।
সাদেক হোসেন খোকা ১৯৫২ সালের ১২ মে পুরান ঢাকার গোপীবাগে জন্ম নেন। গোপীবাগ রামকৃষ্ণ মিশন স্কুল, কলতাবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, জয়দেবপুর রানী বিলাস মনি উচ্চ বালক বিদ্যালয়, পুরান ঢাকার জগন্নাথ কলেজ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোবিজ্ঞানে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নেন তিনি। একাত্তরের উত্তাল সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র খোকা মা-বাবাকে না জানিয়েই মুক্তিযুদ্ধে যান বন্ধুদের নিয়ে।
মুক্তিযুদ্ধে ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে যুদ্ধ করেছেন খোকা। জড়িত ছিলেন বিভিন্ন সাহসী গেরিলা অপারেশনে। ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর তিনি ও তার সহযোদ্ধারা মিলে টেলিভিশন ও রেডিওর নিয়ন্ত্রণভার গ্রহণ করেন। তার সহযোদ্ধাদের মধ্যে ছিলেন জনপ্রিয় পপগায়ক প্রয়াত আজম খান, ইকবাল সুফী, আলমাস লস্কর, কাজী মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ, মোহাম্মদ শফি, খুরশিদ, আবদুল মতিন, আবু তাহের, মোহাম্মদ বাশার, খন্দকার আবু জায়েদ জিন্নাহ, ফরহাদ জামিল ফুয়াদ, মোহাম্মদ শামসুল হুদা, ড. নিজাম, জাহের, কচিসহ আরও অনেকে।
মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরে ১৯৭২ সালে ব্রাদার্স ইউনিয়নের দায়িত্ব নিয়ে সাদেক হোসেন খোকা ক্লাবকে তিন বছরের মধ্যে তৃতীয় থেকে প্রথম বিভাগে উন্নীত করেন। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা খোকা ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ও ফরাশগঞ্জ ক্লাবের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান ছিলেন। জনপ্রতিনিধি হিসেবে তিনি প্রথম গোপীবাপ-কোতোয়ালির ওয়ার্ড কমিশনার নির্বাচিত হন। এরপর ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন ২০০২ সালের ২৫ এপ্রিল। টানা দু'দফা ২০১১ সালের ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত ১০ বছর তিনি ঢাকার মেয়র ছিলেন। ঢাকা সিটি মেয়র হিসেবে তিনি দেশের বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বরেণ্য শিল্পী-সাহিত্যিকদের নামে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কের নামকরণ করেন।
রাজনীতিতে সাদেক হোসেন খোকা মওলানা ভাসানীর অনুসারী বামপন্থি রাজনীতি ছেড়ে আশির দশকে বিএনপির রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। বিএনপির ঢাকা মহানগরের সভাপতির পাশাপাশি তিনি দলের নির্বাহী কমিটির সহসাংগঠনিক সম্পাদক থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির বিভিন্ন পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। সর্বশেষে তিনি দলের ভাইস চেয়ারম্যান হন। বিএনপির পাশাপাশি দলটির অঙ্গসংগঠন জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতিও ছিলেন খোকা। অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিক নেতা হিসেবেও তার সুনাম রয়েছে। ভারতের বাবরি মসজিদ ভাঙাকে কেন্দ্র করে পুরান ঢাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলার যে চেষ্টা হয়েছিল, তা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন খোকা।
১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৭ আসন (সূত্রাপুর-কোতোয়ালি) থেকে প্রথমবারের মতো এমপি নির্বাচিত হয়ে আলোচনায় আসেন খোকা। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হন তিনি। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ঢাকার আটটি আসনের মধ্যে সাতটিতে বিএনপি প্রার্থী পরাজিত হলেও একমাত্র খোকা নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের নির্বাচনেও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে মৎস্য ও পশুসম্পদমন্ত্রী হন। ঢাকা মহানগর বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
সাদেক হোসেন খোকার মৃত্যুতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংগঠন ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ শোক জানিয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন, বিস্থায়ী কসদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোথসেন, বিরোধীদলীয় উপনেতা গোলাম মোহাম্মদ কাদের, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম, এলডিপির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রম, জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ্ চৌধুরী, গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক ড. রেজা কিবরিয়া, জেএসডি সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন ও উত্তর সিটির মেয়র আতিকুল ইসলাম।
পৃথক শোকবার্তায় তারা বলেন, এরশাদবিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অগ্রভাগে ছিলেন সাদেক হোসেন খোকা। আপাদমস্তক রাজনীতিক ছিলেন তিনি। যখনই কোথাও মানুষের বিপদ হয়েছে, ছুটে গেছেন সাদেক হোসেন খোকা।
এ ছাড়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর), জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি-জাগপা, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপি, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, যুবদলসহ অন্যান্য অঙ্গসংগঠন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটের শরিক দলের নেতারা ও বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন শোক প্রকাশ করেছে।