ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

সিলেটে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের সংলাপ

সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়তে না পারার দায় স্বীকার রাজনীতিবিদদের

সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়তে না পারার দায় স্বীকার রাজনীতিবিদদের
×

নাগরিক প্লাটফর্মের প্রাক-নির্বাচনী আঞ্চলিক সংলাপে সঞ্চালক ছিলেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। ছবি: সমকাল

সমকাল প্রতিবেদক, সিলেট থেকে ফিরে

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৫ | ০১:৪৬ | আপডেট: ২৪ অক্টোবর ২০২৫ | ০১:৪৯

বৈষম্যবিরোধী স্লোগানে জুলাই অভ্যুত্থান সংঘটিত হলেও অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি; বরং দুর্নীতি কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেড়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে। ক্ষমতাসীনদের সম্পদের হিসাব প্রকাশের প্রতিশ্রুতি দিলেও বিদায়ী আওয়ামী লীগ সরকারের মতো অন্তর্বর্তী সরকারও তা রক্ষা করেনি।

নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আয়োজিত এক সংলাপে অংশ নিয়ে সিলেটে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ এমন বক্তব্য দেন। বৃহস্পতিবার নগরীর একটি হোটেলে প্রাক-নির্বাচনী উদ্যোগের অংশ হিসেবে আয়োজিত এই সংলাপে সঞ্চালক ছিলেন সিপিডির (সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। এতে অংশ নেন বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, সিপিবি ও চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলনের সিলেটের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা। সিপিডির সহায়তায় দেশের সব বিভাগীয় শহরে এই সংলাপের পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তী সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে রাজশাহীতে।

সংলাপে অংশ নিয়ে পেশাজীবী প্রতিনিধিরা রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে ধরেন। এ সময় স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পরও সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে না পারার দায় স্বীকার করে নেন তারা। এমনকি সভায় একযোগে সিলেটের বহুল আলোচিত সাদাপাথর লুটের প্রসঙ্গ তুলে সব দলকে এ জন্য দায়ী করা হয়।

বলা হয়, আগামী সংসদ নির্বাচনের পর আবারও সাদাপাথর লুটের ঘটনা ঘটবে বলে সিলেটবাসীর মধ্যে শঙ্কা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে কোনো রাজনৈতিক নেতা কোনে জবাব দেননি। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ভোটে সরকার পরিবর্তনের ধারা চালু রাখা সম্ভব হয়নি বলেই রাজনীতিবিদরা নির্বাচনী ইশতেহার পূরণে আন্তরিক নন– এমন অভিযোগও স্বীকার করে নেন অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া নেতারা।

সংলাপে সাদেকুর রহমান নামের একজন এনজিওকর্মী বলেন, শুধু নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা নয়, নির্বাচনের মান নিয়েও জনমনে শঙ্কা রয়েছে। কারণ, ভোটের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে না পারায় সর্বক্ষেত্রে জবাবদিহির সংকট দেখা দিয়েছে। 

মুস্তফা সাজিদুল ইসলাম নামের একজন বলেন, আইন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে আসামির জামিন ও সাজা নির্ধারণের সংস্কৃতি চলমান। এ থেকে বের হতে হলে বিচার বিভাগের সত্যিকারের স্বাধীনতা বা পৃথক্করণের বিকল্প নেই।

সংলাপের সঞ্চালক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সংস্কারবিরোধী জোট ভাঙতে পরিকল্পিত উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ, নতুন বাংলাদেশ গড়তে এবং দেশকে মধ্যম আয়ের কাতারে নিয়ে যেতে সংস্কার অপরিহার্য। 

রাজনীতিবিদদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমাদের প্রত্যাশা রাজনীতিবিদরা জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কাজ করবেন। এ জন্য ইশতেহার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নির্বাচনও গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন নিয়ে মানুষের মধ্যে যে শঙ্কা আছে, তা দ্রুত দূর হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। 

সংস্কার ধারাবাহিক প্রক্রিয়া উল্লেখ করে দেবপ্রিয় বলেন, এই সরকার কিছু কাজ করেছে, কিছু করতে পারেনি। এখন যে সময়টুকু আছে, চলে যাওয়ার আগে তাদের বলা উচিত– কী কী করে যাবেন। 

তিনি বলেন, রাজনীতিবিদদের বিষয়টি উপলব্ধি করতে হবে, নির্বাচনী ইশতেহারে তার প্রতিফলন থাকতে হবে। এই সরকার একা সব করতে পারবে না। আগামী দিনের সরকারকে এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে।

সভার শুরুতে মূল প্রবন্ধে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, অতীতে এ দেশে কেবল দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়েছে। স্কুল-কলেজের কেবল ইমারত হয়েছে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মান বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। দেশে একটি গোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল, যা দৃশ্যমান বিভিন্ন প্রকল্প নিতে সাহায্য করেছিল।

দেশে ‘চামচা পুঁজিবাদী’ অর্থনীতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই পুঁজিবাদে কিছু চামচা তৈরি হয়। এই চামচারা দেশকে লুটপাটতন্ত্র ও চোরতন্ত্রে পরিণত করেছে। রাষ্ট্রের পুরো কাঠামোকে তারা এ ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছে। তারা সব সময়ই সংস্কারবিরোধী। সংস্কার প্রণয়ন করা যত সহজ, বাস্তবায়ন করা তত সহজ নয়। আগামী দিনে যারা দেশ পরিচালনা করবেন, তাদের এ ব্যাপারে আগ্রহী হতে হবে।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বর্তমান সরকার, বিশেষ করে প্রধান উপদেষ্টা যে উৎসাহ ও আগ্রহ নিয়ে শ্বেতপত্র ও বিভিন্ন টাস্কফোর্স রিপোর্ট তৈরি করেছিলেন, তা তাঁর সহযোগীরা এবং সংশ্লিষ্ট আমলাতন্ত্র বেশিদূর এগিয়ে নিতে পারেননি। এটি পরিতাপের বিষয়। রাজনীতিবিদরা নাগরিকদের মুখোমুখি হয়ে আগের ব্যর্থতার দায় স্বীকার করছেন– একে ইতিবাচক দিক হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

সংলাপের সমাপনী বক্তব্যে সিপিডির আরেক সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অতীতে রাজনৈতিক দলগুলো অনেক আশ্বাস দিয়েছে। তার বাস্তবায়ন হয়নি। গত বছরের জুলাইয়ে একটা বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এসেছি। সবার মতামত নিয়ে একটি নাগরিক ইশতেহার তৈরি করা প্রয়োজন। 

তিনি বলেন, জুলাইয়ে অনেক কিছু হারানোর পাশাপাশি নতুন একটি প্রজন্মের সঙ্গে জাতির পরিচয় ঘটেছে। শুধু ভোটে গণতন্ত্র নয়, সর্বক্ষেত্রে জবাবদিহির ধারাবাহিকতা রক্ষা করাই হচ্ছে গণতন্ত্র। 

সংলাপের মুক্ত আলোচনা পর্বে জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, নগর জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ড. নুরুল ইসলাম বাবুল, অ্যাডভোকেট ইরফানুজ্জামান চৌধুরী, সিলেট প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি ইকবাল সিদ্দিকীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রতিনিধি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা নিজেদের মতামত তুলে ধরেন। 

আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, তাঁর দল ক্ষমতায় গেলে দুর্নীতি প্রতিরোধে ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠা করা হবে, যাতে দুর্নীতিকে চিরতরে বিদায় করা যায়। পাশাপাশি বিএনপি ঘোষিত ৩১ দফা বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় ভারসাম্য তৈরির কথা বলেন তিনি। 

নগর জামায়াতের নায়েবে আমির ড. নুরুল ইসলাম বাবুল বলেন, তারা ক্ষমতায় গেলে দুর্নীতিকে জিরো টলারেন্সে নিয়ে আসবেন। নির্বাচন নিয়ে জনমনে শঙ্কার বিষয়ে তিনি বলেন, সরকার যেহেতু নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছে, সেহেতু এ নিয়ে কোনো শঙ্কা থাকার কথা নয়।

সিলেট প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি ইকবাল সিদ্দীকী বলেন, সাংবাদিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি এখনও অমীমাংসিত। সাংবাদিকরা আগে যে চাপের মধ্যে ছিলেন, সেটি এখনও রয়ে গেছে এবং ভবিষ্যতেও এই চাপ অব্যাহত থাকবে বলে শঙ্কা রয়েছে। 

এ ছাড়া নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা আগামী নির্বাচনে রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিতের ওয়াদা, জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক নিরাপত্তা, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের (এআই) অপব্যবহার রোধ, সামাজিক মাধ্যমে প্রচারণাকে জবাবদিহিতে আনাসহ নানা বিষয় তুলে ধরেন।

আরও পড়ুন

×