ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

‘পুলিশ কাছে থেকে আবু সাঈদকে শটগান দিয়ে গুলি করে’

‘পুলিশ কাছে থেকে আবু সাঈদকে শটগান দিয়ে গুলি করে’
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১১ নভেম্বর ২০২৫ | ০৭:৪৪ | আপডেট: ১১ নভেম্বর ২০২৫ | ১২:৫০

| প্রিন্ট সংস্করণ

‘আবু সাঈদের হাতে তখন একটি ছোট চিকন লাঠি ছিল। পুলিশ যেন আর গুলি না করে সে জন্য সে হাত প্রসারিত করে আত্মসমর্পণের মতো করে দাঁড়ায়। কিন্তু পুলিশ কাছে থেকে তাঁর দিকে তাক করে শটগান দিয়ে গুলি করে।’ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলার প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী আকিব রেজা খান জবানবন্দিতে এসব কথা বলেছেন।  

বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ গতকাল সোমবার এই মামলায় বাদীপক্ষের ১২ নম্বর সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন তিনি। পরে তাঁকে জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। আজ মঙ্গলবার মামলার পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণ হবে।

আকিব রেজা বলেন, ‘গত বছর ১৬ জুলাই রংপুর মহানগরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা মিছিল করে লালবাগ হয়ে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের সামনে প্রতিবাদ সমাবেশে উপস্থিত হন। দুপুর ১২টার দিকে সেখানে যাই। আমার সঙ্গে বন্ধু রওনক ছিল। তখন আমরা জানতে পারি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে হলে শিক্ষার্থীদের আটকে রাখা হয়েছে, তাদের আন্দোলনে যোগ দিতে দেওয়া হচ্ছে না। ছাত্রলীগ এবং আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের কর্মীরা শিক্ষার্থীদের আটকে রাখে। এ সময় আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ নম্বর গেট দিয়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করলে পুলিশ বাধা দেয়।’

তিনি বলেন, ‘হঠাৎ করেই সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করা হয়। একই সঙ্গে টিয়ার গ্যাসের শেলও নিক্ষেপ করা হয়। এর ফলে শিক্ষার্থীরা কিছুটা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। আমি তখন রাস্তার ডিভাইডার পার হয়ে রাস্তার পূর্ব পাশে চলে যাই। পুলিশ টিয়ার শেল নিক্ষেপ এবং লাঠিচার্জ করছিল। এর মধ্য এসি আরিফুজ্জামান ও তাঁর সঙ্গে কিছু পুলিশ অফিসার আবু সাঈদের ওপর লাঠিচার্জ শুরু করে। এরপর পুলিশ পিছু হটে ১ নম্বর গেট দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে চলে গিয়ে গেটটি বন্ধ করে দেয়।’

সাক্ষী আকিব রেজা বলেন, ‘পুলিশ ভেতরে চলে যাওয়ার পর শিক্ষার্থীরা আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ নম্বর গেটের সামনে সমবেত হয়ে ভেতরে যাওয়ার চেষ্টা করে। আমি এবং অন্যান্য শিক্ষার্থী গেটে ধাক্কা দিয়ে খোলার চেষ্টা করি এবং এক পর্যায়ে গেট খুলে যায়। ভেতরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ শটগান দিয়ে ছররা গুলি এবং টিয়ার শেল নিক্ষেপ করতে করতে এগিয়ে আসে। আমার শরীরে ছররা গুলি লাগে, তখন আমি গেট থেকে সরে এসে ডিভাইডারের পূর্ব পাশে অবস্থান নেই। এ সময় আবু সাঈদ ডিভাইডারের পূর্ব পাশ থেকে পশ্চিম পাশে আসেন এবং ১ নম্বর গেটের সামনে দাঁড়িয়ে বাকি শিক্ষার্থীদের সমবেত হওয়ার জন্য ডাক দেন। কিন্তু তখন পুলিশ গুলি করতে করতে গেট দিয়ে বের হয়ে আসছিল। আবু সাঈদ সেটা দেখে দুহাত উঁচু করে দুপাশে প্রসারিত করে দাঁড়ান। পুলিশ কাছে থেকে তাক করে শটগান দিয়ে গুলি করে। এরপর আবু সাঈদ ভারসাম্য হারিয়ে রাস্তার ডিভাইডার অতিক্রম করে পশ্চিম পাশ থেকে পূর্ব পাশে চলে যান এবং রাস্তায় বসে পড়েন। তাঁকে দেখে আয়ান দৌড়ে আসে, তাঁকে ধরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে আবু সাঈদ দাঁড়ানোর পর আবার পড়ে যান। সেটা দেখে পাশে থাকা বন্ধু রওনক এবং আরও দু-তিন শিক্ষার্থী এসে আবু সাঈদ, আয়ানসহ অন্যদের সরিয়ে নিতে চেষ্টা করেন। তখনও পুলিশ শটগান দিয়ে গুলি করছিল এবং টিয়ার শেল নিক্ষেপ করছিল। কিছুদূর আসার পরে রওনক ও অন্য শিক্ষার্থীরা আবু সাঈদকে ধরে রাখতে পারছিলেন না, তখন আমি দৌড়ে গিয়ে আবু সাঈদকে ধরি।’

সাক্ষী জবানবন্দিতে আরও বলেন, ‘আবু সাঈদকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্কের মোড়ের দিকে নিয়ে যাই। তখন আবু সাঈদের মাথা ও সারাশরীর দিয়ে রক্ত ঝড়ছিল এবং জ্ঞান ছিল না।  বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে জানতে পারি আবু সাঈদ মারা গেছেন।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ও প্রক্টরের দায়িত্বহীনতাকে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার জন্য দায়ী করে হত্যায় জড়িতদের বিচার চান এই সাক্ষী।

আরও পড়ুন

×