গোলটেবিলে বক্তারা
রাজনীতিতে অর্থের ব্যবহারের জন্য দায়ী প্রচলিত আইন
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৫ নভেম্বর ২০২৫ | ০৮:১২ | আপডেট: ২৫ নভেম্বর ২০২৫ | ১০:১৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশের সর্বোচ্চ নির্বাচনী আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) এমনভাবে তৈরি যে, অর্থ না থাকলে রাজনীতি করা যায় না। নির্বাচন কমিশনের আইনে আছে, একটি রাজনৈতিক দলকে ১০০টি দলীয় কার্যালয় চালাতে হয়। এ জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। ফলে অর্থ না থাকলে রাজনীতি করা যাবে না। আর দেশে যেহেতু সুশাসনের অভাব এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা নেই, ফলে কালো টাকাকে রাজনীতি থেকে আলাদা করা অসম্ভব।
গতকাল সোমবার ঢাকা ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালেটিকস (দায়রা) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্থায়ন সংস্কৃতি ও ব্যবসা সুরক্ষা: বাস্তবতা ও সমাধানের পথ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। রাজনীতিতে অর্থায়ন সংস্কৃতি নিয়ে এ গোলটেবিল বৈঠক রাজধানীর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়।
শুরুতে পলিসি ব্রিফ করেন দায়রার গবেষক রাগীব আনজুম ও আহমুদুল হক। বৈঠক পরিচালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ শাহান। আলোচনায় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, গবেষক, তরুণ শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক দলের সদস্যরা অংশ নেন।
নির্বাচন সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, দেশে রাজনৈতিক দল নেই, আছে একদল ব্যযবসায়ী আর একদল ধর্মীয় কর্মী। মনোনয়ন বাণিজ্যের মাধ্যমে রাজনীতি ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের মতো আচরণ করে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে তথ্য অধিকার আইনের আওতায় আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। আরও অনেক সংস্কার প্রস্তাব করেছিলাম। কিন্তু কিছুই দেখছি না।
অর্থ, পেশিশক্তি, ধর্মকে সবসময়ই রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাজনৈতিক, ব্যবসা ও আমলাতান্ত্রিক ক্ষেত্রে কোথাও সংস্কার করা হয়নি, অথচ সরকারের কাছে তিন ক্ষেত্রেই সংস্কার চেয়েছি। মূল বাধা আমলাতন্ত্র।
বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের মহাসচিব সৈয়দ হাসিব উদ্দিন হোসেন বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনে দলের নিবন্ধন নিয়ে বেশ সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি। নিবন্ধন পেতে ১০০টি উপজেলায় দলীয় কার্যালয় থাকতে হয়। এগুলোর ভাড়ার চুক্তিপত্র দিতে হয়। দায়বদ্ধতা থেকে যারা রাজনীতিতে আসেন, তারা এত কার্যালয় কীভাবে চালাবে?’
বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ বলেন, স্বচ্ছতার প্রশ্নে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। আর শুধু রাজনৈতিক দলগুলোকেই কেন সবসময় কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়? আমলা, সচিবসহ যারা ক্ষমতা উপভোগ করেন, তাদের কেন আমরা প্রশ্ন করি না? যেখানে ঘুষ দিয়ে ব্যবসায়ীদের কাজ করতে হয়, সেখানে রাজনৈতিক দলগুলো কীভাবে স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করবে? রাজনৈতিক দলকে আর্থিকভাবে স্বচ্ছ করতে নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী হওয়া ছাড়া উপায় নেই। পাশাপাশি প্রয়োজন ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ।
নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সদস্য জেসমিন তুলি বলেন, দেশের আইনের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থ সংগ্রহ, আয়ের বৈধ উৎস– এসব বিষয় সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ নেই। এগুলো আইনে উল্লেখের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছাই পারবে চলমান সংকটের সমাধান করতে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক আয় ও ব্যয়ের বিষয়ে উল্লেখ করে দলটির সহকারী মহাসচিব আহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, রসিদ ও ভাউচার ছাড়া জামাতের কোনো আয়-ব্যয় নেই। প্রতিমাসে সদস্যরা তাদের আয়ের ৫ শতাংশ দলকে দিতে বাধ্য থাকে।
রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থায়ন সংস্কৃতির চলমান সংকট নিরসনে নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতার ওপর সন্দেহ পোষণ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবর রহমান। দলগুলোর সঙ্গে ব্যবসায়ীদের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করেন এনসিপর যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ। তিনি বলেন, গত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনে ব্যবসা ও রাজনীতির সম্পর্ক অনেক বেশি বেড়েছে।
সাশা ডেনিমস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস মাহমুদ বলেন, নানা ধরনের ব্যবসার স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলোকে অর্থ দিতে এক প্রকার বাধ্য হন ব্যবসায়ীরা।
বিডিজবস ডটকমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠাতা একেএম ফাহিম মাশরুর বলেন, আমাদের সমস্যাটা রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী বলেন, স্বচ্ছতার জন্য আইনের শাসনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
- বিষয় :
- রাজনীতি
- গোলটেবিল আলোচনা
