ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বিরোধে আটকে আছে কেআইবির ভোট

পেশাজীবী সংগঠনে নির্বাচন নিয়ে অনীহা

বিরোধে আটকে আছে কেআইবির ভোট
×

জাহিদুর রহমান

প্রকাশ: ২৬ নভেম্বর ২০২৫ | ০৭:৫১ | আপডেট: ২৬ নভেম্বর ২০২৫ | ০৯:২৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

জোর দাবি থাকলেও পেশাজীবীদের সংগঠনগুলোতে নির্বাচন আয়োজনে অনাগ্রহ দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন দলের সমর্থকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব, ক্ষোভ-বিক্ষোভ, হামলা, ভাঙচুরের ঘটনায় নির্বাচন আটকে আছে। তপশিল ঘোষণা করেও পরে তা পিছিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। কোথাও কোথাও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর পেশাজীবীদের নির্বাচন করার কথা বলা হচ্ছে

কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের (কেআইবি) নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের সদস্যরা পক্ষপাতদুষ্ট– এই অভিযোগ তুলে বিএনপিপন্থি কৃষিবিদদের সংগঠন এগ্রিকালচারিস্টস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এ্যাব) আন্দোলনে নামে। রাজধানীর ফার্মগেটে কেআইবি ভবনে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। এমন পরিস্থিতিতে সব পক্ষকে নিয়ে সমাজকল্যাণবিষয়ক উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশিদ বৈঠক করলেও অনিশ্চয়তা কাটছে না। 

১৬ বছর পর নির্বাচনের পথে হাঁটছিল কেআইবি। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দখলদারিত্ব, আর্থিক অনিয়ম ও দ্বন্দ্বের পর সংগঠনটিতে শৃঙ্খলা ফিরে আসে। ইতোমধ্যে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছে, ভোটার তালিকা হালনাগাদের কাজও চলছে। কিন্তু এ্যাব জাতীয় নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত কেআইবির ভোট স্থগিত রাখার দাবি জানাচ্ছে।

কৃষিবিদরা জানান, ২০০৯ সালের পর থেকে কেআইবিতে কোনো নির্বাচন হয়নি। তখন থেকে আওয়ামী লীগপন্থি বঙ্গবন্ধু কৃষিবিদ পরিষদের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। তপশিল ঘোষণার পরও দলীয় কোন্দল, মামলা ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ভোট বারবার স্থগিত হয়েছে। সর্বশেষ ২০১৬ সালে নির্বাচন আয়োজনের চেষ্টাও ব্যর্থ হয়। পরে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হলেও রাজনৈতিক বিরোধে তা ভেস্তে যায়। 

গণঅভ্যুত্থানের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। বিএনপিপন্থি কৃষিবিদদের সংগঠন কেআইবির নিয়ন্ত্রণ নিলেও দুই পক্ষের দ্বন্দ্ব-সংঘাতে রূপ নেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় গত ২০ জানুয়ারি লে. কর্নেল (অব) মো. আব্দুর রব খানকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতি তদন্তে শুদ্ধি অভিযান শুরু করেন। এতে বেরিয়ে আসে দীর্ঘদিনের ভুয়া খরচের চালান, অর্থ আত্মসাৎ ও হিসাববিহীন ব্যয়ের তথ্য। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ও জিডি হয়েছে।

গত ২৯ সেপ্টেম্বর সাত সদস্যের নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়। কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পান বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. লুৎফুর রহমান। সদস্যরা হলেন বিএডিসির সাবেক মহাব্যবস্থাপক মাহমুদ হোসাইন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক মো. তারিক হাসান, তুলা উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক পরিচালক মো. আব্দুল বাতেন, সাবেক সচিব ড. আফজাল হোসেন, সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (কৃষিবিদ) ড. সাইফুল্লাহ আনসারী, মৎস্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক ড. আবুল হাছানাত ও প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শরীফ আহমেদ চৌধুরী। কমিশন ৩০ নভেম্বরের মধ্যে ভোটার তালিকা চূড়ান্ত এবং পরে তপশিল ঘোষণা করবে। 

নির্বাচন কমিশন গঠনের পর থেকেই এ্যাবের একাংশ জাতীয় নির্বাচনের আগে কেআইবির ভোট না করার দাবি জানায়। গত ২০ অক্টোবর বিকেলে তারা ফার্মগেট এলাকায় কেআইবি কমপ্লেক্সের সামনে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে। এ্যাবের আহ্বায়ক ড. কামরুজ্জামান কায়সার ও সদস্য সচিব শাহাদাত হোসেন বিপ্লব মিছিলে নেতৃত্ব দেন। তারা অভিযোগ করেন, বর্তমান প্রশাসক পক্ষপাতদুষ্ট, নির্বাচন কমিশনও নিরপেক্ষ নয়। সমাবেশের পর এ্যাব নেতারা উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশিদ এবং সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. সাইদুর রহমান খানের সঙ্গে দেখা করে ভোট পেছানোর দাবি জানান। 

গত ২৭ অক্টোবর দুপুরে এ্যাব নেতারা সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সঙ্গে দেখা করে প্রশাসকের অপসারণ চান। এর পরপরই ওই দিন বিকেলে এ্যাবের কিছু নেতাকর্মী কেআইবি ভবনে প্রবেশ করে ভাঙচুর চালান। প্রশাসক আব্দুর রব খানকে প্রায় ১ ঘণ্টা দপ্তরে অবরুদ্ধ করে রাখেন এবং পদত্যাগের হুমকি দেন। ভাঙচুর করা হয় প্রশাসক ও নির্বাচন কমিশনের নামফলক, অফিস সরঞ্জাম, সিসি ক্যামেরা ও নিয়ন্ত্রণকক্ষের হার্ডডিস্ক। রাতেই কেআইবি কর্তৃপক্ষ তেজগাঁও থানায় মামলা করে। মামলায় এ্যাবের আহ্বায়ক কামরুজ্জামান কায়সার, সদস্য সচিব শাহাদাত হোসেন বিপ্লবসহ ৬০ জনকে আসামি করা হয়। 
হামলার ঘটনার পরদিন ২৮ অক্টোবর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলনে ড. কামরুজ্জামান কায়সার বলেন, তারা জাতীয় নির্বাচনের আগে কেআইবির ভোট চান না। নির্বাচন কমিশনের সদস্যরা পক্ষপাতদুষ্ট। তিনি প্রশাসক আব্দুর রব খানের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তাঁর অপসারণ দাবি করেন।

তবে হামলার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কৃষিবিদ শাখা। তাদের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কেআইবি কোনো রাজনৈতিক সংঘাতের ক্ষেত্র নয়, এটি কৃষিবিদ সমাজের ঐক্য ও মর্যাদার প্রতীক। সংগঠনটি হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানিয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে গত মঙ্গলবার কেআইবিতে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির কৃষিবিদ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশিদ। তিনি তিন গ্রুপের সমন্বয়ে একটি কমিটি করে দেন। যে কমিটি দ্রুত কেআইবির সাম্প্রতিক ঘটনা এবং নির্বাচনের বিষয়ে প্রতিবেদন দেবে। এরপর থেকে কেআইবি শান্ত হলেও নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না।

শারমিন এস মুরশিদ বলেন, ‘গত ৯ মাসে কেআইবিতে দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়ন বন্ধ হয়েছে। শৃঙ্খলা ফিরিয়ে যখন নির্বাচন কমিশন গঠন হয়েছে, তখনই একটি পক্ষ অস্থিতিশীলতা তৈরি করেছে। কেআইবির প্রায় ৩৩ হাজার সদস্য দীর্ঘদিনের ভোটবঞ্চনা শেষে নিজেদের প্রতিনিধি বেছে নিতে চান। আমরা উভয় পক্ষের সঙ্গে বসেছি।’
কেআইবির নির্বাচন কমিশনের চেয়ারম্যান ড. লুৎফুর রহমান বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম নির্বাচন শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ ও মর্যাদাপূর্ণ হোক। কৃষিবিদ সমাজ সবসময় শৃঙ্খলা ও পেশাগত মর্যাদার প্রতীক– নির্বাচনে সেই ঐক্য ফেরাতে চেয়েছি।’

 

আরও পড়ুন

×