ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মৎস্যসম্পদ জরিপ

সাগরে মাছের নতুন ৬৫ প্রজাতি মিললেও মজুত দ্রুত কমছে

সাগরে মাছের নতুন ৬৫ প্রজাতি মিললেও মজুত দ্রুত কমছে
×

বিবিসির ব্যবহার করা ছবি

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১০:১৫

বঙ্গোপসাগর নিয়ে নতুন এক জরিপ একসঙ্গে সম্ভাবনা আর সতর্কতা– দুই তথ্যই দিয়েছে। দেশের সমুদ্রসীমায় নতুন ৬৫ প্রজাতির মাছ পাওয়া গেছে, যার মধ্যে পাঁচটি আগে কখনও বিশ্বের কোনো জলসীমায় পাওয়া যায়নি। প্রথমবারের মতো টুনা মাছ ও টুনার লার্ভাও ধরা পড়েছে। এতদিন সাগরে ৪৭৫ প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। আগের প্রজাতির সঙ্গে এখন নতুন করে এসব মাছের প্রজাতি যুক্ত হবে। 

গবেষকদের মতে, এটি গভীর সমুদ্রভিত্তিক সম্ভাবনার নতুন দরজা খুলতে পারে। সাগরের ৭০০ মিটার গভীর পর্যন্ত মাছ রয়েছে; কিন্তু সামগ্রিক মজুত দ্রুত কমছে। ছোট আকারের প্যালাজিক মাছের স্টক ২০১৮ সালের এক লাখ ৫৮ হাজার টন থেকে এখন নেমে এসেছে মাত্র ৩৩ হাজার টনে। জেলিফিশ উপকূলের দিকে চলে আসছে, অক্সিজেনহীন অঞ্চল বাড়ছে, মাইক্রোপ্লাস্টিকও বেড়েছে।

গতকাল রোববার প্রকাশিত রাজধানীর একটি হোটেলে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন মৎস্য অধিদপ্তর এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) যৌথ উদ্যোগে করা মৎস্যসম্পদ জরিপের প্রাথমিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। এফএওর সহায়তায় আটটি দেশের ২৪ জন বিজ্ঞানীর মাধ্যমে মাসব্যাপী এ জরিপ পরিচালনা করা হয়। জাতিসংঘের একটি গবেষণা জাহাজ এ বছরের ২১ আগস্ট থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ জরিপ পরিচালনা করে। জরিপে বঙ্গোপসাগরের ৬৮টি স্টেশন থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

এ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। বিশেষ অতিথি ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মুহাম্মদ জাবের। সভাপতিত্ব করেন মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আবদুর রউফ। 

জরিপ দলের নেতৃত্বে ছিলেন নরওয়ের বিজ্ঞানী এরিক ওলসেন। বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সায়েদুর রহমান চৌধুরী। জরিপের প্রাথমিক প্রতিবেদনের বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরে মৎস্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশ সীমানায় প্রথমবারের মতো টুনা মাছের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। মাছের পাশাপাশি টুনা মাছের লার্ভা বা বাচ্চাও মিলেছে। সাগরের মাত্র ২০০ মিটার গভীরে মাছ ধরা গেলেও সাগরের ৭০০ মিটার নিচেও মাছের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। নতুন প্রজাতির ৬৫ জাতের মাছের বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য দক্ষিণ আফ্রিকার গবেষণাগারে পাঠানো হয়েছে। সাগরের একটি নির্দিষ্ট এলাকায় মাছ ধরা হলেও গভীর সাগরে কোনো মাছ ধরা হচ্ছে না জানিয়ে তিনি গভীর সাগর থেকে মাছ ধরার উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন।

এদিকে জরিপে বঙ্গোপসাগর থেকে মাছ আহরণ কমে যাওয়ার তথ্যও উঠে এসেছে। দেশের প্রধান ২০ প্রজাতির মাছের মধ্যে ২০১৮ সালে ৯ প্রজাতির মাছ আহরণের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক উপযোগিতা ছিল; কিন্তু এবার তা পাঁচটিতে নেমে এসেছে। জরিপের তথ্যে বলা হয়, সাগরের পানির ওপরের স্তরের ছোট আকৃতির (স্মল প্যালাজিক) মাছের পরিমাণও কমে এসেছে। ২০১৮ সালে যেখানে স্টক ছিল এক লাখ ৫৮ হাজার টন, ২০২৫ সালে তা নেমে এসেছে মাত্র ৩৩ হাজার ৮১১ টনে। একইভাবে ২০১৮ সালে গভীর সাগরে জেলিফিশের উপস্থিতি থাকলেও এখন তা উপকূলের কাছাকাছি চলে এসেছে। ফলে জেলেদের জাল জেলিফিশে ভরে যাচ্ছে।

জরিপের বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরে অধ্যাপক সায়েদুর রহমান চৌধুরী বলেন, সাগরের ৮০ থেকে ৯০ মিটারের পর অক্সিজেনের মাত্রা কম। কিছু জায়গায় অক্সিজেন নেই বললেই চলে। তবে সাগরে প্রচুর উদ্ভিদের উপস্থিতি দেখা গেছে। আমাদের জাহাজ সাগরের উপকূলের ২০ মিটারের নিচে নামতে পারে না। তাই উপকূলের কোনো তথ্য সংগ্রহ করা যায়নি।

উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, সাগরকে অব্যবস্থাপনার কারণে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। অতিরিক্ত আহরণ, অবৈধ ট্রলার, ক্ষতিকর জাল এবং সোনার প্রযুক্তির অপব্যবহার মাছের অপচয় বাড়াচ্ছে। তিনি শিল্প ট্রলারের লাইসেন্স নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ অ্যাসোসিয়েশনের সচিব আবিদ হোসেন বলেন, সাগরে মাছের পরিমাণ কমছে। এটা আমাদের জন্য খুবই সতর্কতার বিষয়। এটা নিয়ে করণীয় নির্ধারণ করা না হলে সাগরে মাছ ধরা শিল্প হারিয়ে যাবে।

আরও পড়ুন

×