ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মালয়েশিয়ার বন্ধ দুয়ার খুলবে কি

মালয়েশিয়ার বন্ধ দুয়ার খুলবে কি
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০১৯ | ১৩:১৯

বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার পথ খুঁজতে আজ বুধবার বৈঠক হবে। মালয়েশিয়ার পুত্রজায়ায় দেশটির মানবসম্পদ মন্ত্রী এম কুলসেগারেনের সঙ্গে বৈঠক করবে বাংলাদেশি প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী ইমরান আহমদের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দল। মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, মালয়েশিয়ার তিন শর্ত ধরে আলোচনা হবে আজকের বৈঠকে।

মালয়েশিয়ার শর্তগুলো হলো- কর্মীর কাজের অনুমতি দূতাবাসের মাধ্যমে দেওয়া হবে এবং তার পাসপোর্ট নিয়োগকারীর কাছে থাকবে। এ নিশ্চয়তা নিয়োগকারীদের নিতে হবে। কর্মী নিতে এবং তার কাজের অনুমতিপত্র নবায়নে নিয়োগকারীকে নিশ্চয়তাপত্র দিতে হবে।

দ্বিতীয় শর্ত হচ্ছে, নেপাল থেকে যে ব্যয়ে মালয়েশিয়ায় কর্মী যাচ্ছে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তা প্রয়োজ্য হবে। কর্মীরা রিক্রুটিং এজেন্টকে কোনো টাকা দেবে না। কর্মী বাছাই, চাহিদাপত্র যাচাই, কর্মী নিয়োগসহ সব কাজ মালয়েশিয়ার নির্ধারিত পদ্ধতিতে হবে। এ পদ্ধতি নিয়ন্ত্রণ করবে দেশটির নিয়োগ দেওয়া কোম্পানি। কর্মীপ্রতি ৬০০ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত (১২ হাজার ৩১২ টাকা) পাবে মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্টরা।

তৃতীয় শর্ত হচ্ছে, যে প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিয়ে কর্মীরা মালয়েশিয়ায় যাবে, তাকে সেখানেই থাকতে হবে। বিনা অনুমতিতে কর্মক্ষেত্র পরিবর্তন করতে পারবে না। কোনো কর্মী পালিয়ে অন্য কোথাও কাজ করলে, তার দায়দায়িত্ব বাংলাদেশকে নিতে হবে। বাংলাদেশ তাকে ফিরিয়ে নেবে। সেই কর্মী আর কখনও মালয়েশিয়ায় যেতে পারবে না। নিয়োগকারীর কাছ থেকে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাকে বাংলাদেশে অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে।

তবে এসব শর্ত নিয়ে মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের অগ্রাধিকার হচ্ছে, দ্রুত শ্রমবাজার খোলা এবং অভিবাসন ব্যয় কমানো। এ দুই বিষয়ে নিশ্চয়তা পাওয়া গেলে বাংলাদেশ বাকি শর্ত মেনে নেবে।

প্রবাসীকল্যাণ সচিব মো. সেলিম রেজা কুয়ালালামপুর থেকে সমকালকে বলেছেন, বৈঠকের পরই বলা যাবে কী শর্তে, কত অভিবাসন ব্যয়ে, কবে থেকে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশিদের জন্য উন্মুক্ত হবে। এর আগে মন্তব্য করা ঠিক হবে না। তবে তিনি আশাবাদী। শিগগির মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলবে বাংলাদেশিদের জন্য।

মালয়েশিয়া সরকারের সঙ্গে বৈঠক করতে গত সোমবার ছয় সদস্যের প্রতিনিধি দল নিয়ে সে দেশে গেছেন প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী। বহুল প্রতীক্ষিত এ বৈঠক নিয়ে ক'দিন ধরেই সরগরম জনশক্তি খাত। মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর নিয়ন্ত্রণ পেতে 'সিন্ডিকেটের' তৎপরতা নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ রয়েছে। তবে মালয়েশিয়া যাওয়ার আগে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী জানিয়েছিলেন, আর সিন্ডিকেট করতে দেওয়া হবে না।

অনিয়মের অভিযোগ তুলে ২০০৯ সালে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়া বন্ধ করে দেয় মালয়েশিয়া। দীর্ঘ আলোচনার পর বাংলাদেশ থেকে সরকারি ও বেসরকারি যৌথ ব্যবস্থাপনায় কর্মী নিতে ২০১৬ সালে বহুল আলোচিত জিটুজি প্লাস চুক্তি সই করে মালয়েশিয়া। কিন্তু পরের দিনই তা স্থগিত করে। এর এক বছর পর তারা কর্মী নেওয়া শুরু করে।

দুর্নীতির অভিযোগ তুলে গত বছর জিটুজি প্লাস বাতিল করে দেয় মাহাথির মোহাম্মদের সরকার। জিটুজি প্লাসের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে কর্মী যেতে প্রথমে ৩৭ হাজার ৫০০ টাকা অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণ করা হয়। পরে তা এক লাখ ৬০ হাজার টাকা করা হয়। কিন্তু 'সিন্ডিকেটের' কারণে প্রায় সব কর্মী মালয়েশিয়া যেতে তিন থেকে সাড়ে চার লাখ টাকা দিতে বাধ্য হন। এর মাধ্যমে দুই দেশের এজেন্টরা পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি হাতিয়ে নিয়েছে বলে মালয়েশিয়া সরকারের অভিযোগ। জিটুজি প্লাসে কর্মী পাঠানোর কাজ পেয়েছিল ১০টি রিক্রুটিং এজেন্সি। যারা সিন্ডিকেট হিসেবে পরিচিতি পায়।

এবার যেন সিন্ডিকেট না হয় তা নিশ্চিত করতে গত মাসে মালয়েশিয়াকে চিঠি দেয় রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর সংগঠন বায়রা। এ চিঠিকে ভালোভাবে নেয়নি মন্ত্রণালয়। বায়রা মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান সমকালকে বলেছেন, বায়রা সিন্ডিকেট চায় না। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রীও চান না।

মালয়েশিয়ার তিন শর্ত সম্পর্কে বায়রা মহাসচিব বলেছেন, তিনি এ বিষয়ে নিশ্চিত নন। কর্মীরা এক জায়গার কাজ নিয়ে মালয়েশিয়ায় গিয়ে অন্য জায়গায় চলে যাওয়া সমর্থনযোগ্য নয়। এ নিয়ে দু'দেশের জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকেও কথা হয়েছে। কিন্তু অভিবাসন ব্যয়ের ক্ষেত্রে নেপালের পদ্ধতি অনুসরণ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বাস্তবিক হবে না। নেপালে চাকরিপ্রার্থী কম। বাংলাদেশে বিদেশ যেতে আগ্রহীর সংখ্যা ১৫ থেকে ২০ লাখ। কিন্তু বছরে যেতে পারেন সাত থেকে আট লাখ। বায়রা অবশ্যই শূন্য অভিবাসন নীতিকে সমর্থন করে।

বায়রার সাবেক সভাপতি নূর আলী অভিযোগ করেছেন, বাজার খোলার আগেই সিন্ডিকেটের পাঁয়তারা শুরু হয়েছে। তার দাবি, যাদের কারণে জিটুজি প্লাস ব্যর্থ হয়েছিল, তারা ফের তৎপর হয়েছে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর কাজ পেতে।

জিটুজি প্লাসে কর্মী নিতে স্বাস্থ্য পরীক্ষার কাজ পেয়েছিল বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মালয়েশিয়ান নাগরিক দাতো আমিন নূরের বেস্টিনেট। কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের কাজ পেয়েছিল সিনারফ্ল্যাক্স। সিনারফ্ল্যাক্সকে বাদ দিলেও বেস্টিনেটের সঙ্গে এখনও চুক্তি রয়েছে মালয়েশিয়া সরকারের। প্রতিষ্ঠানটি আবারও শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। মালয়েশিয়া যেতে ইচ্ছুক কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষায় ১৭টি মেডিকেল সেন্টারকে তালিকাভুক্ত করেছে বেস্টিনেট। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে ১২৭টি প্রতিষ্ঠান আবেদন করেছে স্বাস্থ্য পরীক্ষায় যুক্ত হতে।

বায়রার একজন সাবেক সভাপতি বলেছেন, মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পর ফের কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে মালয়েশিয়া সরকার মনোনীত ফোমেমা। এতে উত্তীর্ণ হতে না পেরে অনেক কর্মী বিমানবন্দর থেকে খালি হাতে দেশে ফেরত আসে। তাই দেশ ছাড়ার আগেই ফোমেমার মাধ্যমে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা উচিত। এতে ব্যয় কমবে। কর্মীও ফেরত আসবে না। আজকের বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে এ বিষয়টি তোলা উচিত।

আরও পড়ুন

×