ঐতিহ্য
ভোটের আমেজে ফিকে ফাগুনের উৎসব
রাজধানীর আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের লবিতে গতকাল শনিবার সকালে বসন্ত উৎসবে নৃত্য পরিবেশন করেন শিল্পীরা সমকাল
দ্রোহী তারা
প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৮:৪৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
একদিকে ঋতুরাজ বসন্তের প্রথম দিন ‘পহেলা ফাল্গুন’, অন্যদিকে ‘বিশ্ব ভালোবাসা দিবস’ উদযাপন করা হলো গতকাল। প্রতিবছর এ দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, শাহবাগ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান জনসমুদ্রে পরিণত হয়। বাসন্তী শাড়ি, মাথায় ফুলের টায়রা আর পাঞ্জাবি পরা তরুণ-তরুণীর ভিড়ে পা ফেলার জায়গা থাকে না। কিন্তু এবার চিত্রপট ভিন্ন। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচনের ঠিক এক দিন পর দুটো উৎসব হওয়ায় ঢাকায় অনেকে না থাকার প্রভাব পড়েছে। এবারের বসন্তবরণ ও ভালোবাসা দিবসে ছিল না চিরচেনা সেই জৌলুস।
টিএসসির চত্বর আছে, কিন্তু বইমেলার সেই ধুলোমাখা আড্ডা নেই। চারুকলার বকুলতলা আছে, কিন্তু নেই সুরের মূর্ছনা। উৎসব আছে; মানুষও সেজেগুজে বেরিয়েছে, কিন্তু কোথায় যেন এক ‘প্রাণহীন’ আবহ বিরাজ করছে পুরো এলাকাজুড়ে!
ভোরবেলা থেকেই চারুকলার বকুলতলায় যেখানে বসন্তের গানের সুরে দিন শুরু হতো, গতকাল সেখানে শুধুই গাছের পাতার মর্মর ধ্বনি ছিল। বড় কোনো সাংস্কৃতিক আয়োজক বা সংগঠনের পক্ষ থেকে ছিল না কোনো আয়োজন। তবুও অনেকে এসেছিলেন। অনেকটা অভ্যাসবশতই তরুণ-তরুণী ভিড় করেছেন চারুকলার সামনে। আয়োজন নেই শুনে ফিরে গেছেন।
তবে গতকাল সকাল সাড়ে ৭টায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রাঙ্গণে জাতীয় বসন্ত উৎসব উদযাপন পরিষদের আয়োজনে বসন্ত উৎসবের আয়োজন করা হয়। হলদে রঙে ও শিশুদের কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে ওঠে প্রাঙ্গণ। এ ছাড়া শহরজুড়ে কোথাও ছিল না বড় পরিসরে কোনো আয়োজন কিংবা উৎসবকেন্দ্রিক জমায়েত।
ইডেন কলেজের শিক্ষার্থী সুমাইয়া ইসলাম বান্ধবীদের নিয়ে এসেছিলেন চারুকলার সামনে। তিনি বলেন, ‘প্রতিবার ভোরে এখানে গান শুনতে আসি। এবার নির্বাচনের কারণে কোনো আয়োজন নেই জানতাম, তবুও মন মানল না। এসে দেখি, আসলেই সব ফাঁকা। আমরা নিজেরা কিছু ছবি তুলেছি, কিন্তু সেই উৎসবের আমেজটা পাচ্ছি না। মনে
হচ্ছে, বসন্ত এসেছে, কিন্তু বরণ করে নেওয়ার কেউ নেই।’
ফেব্রুয়ারির এ সময়ে টিএসসি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান মানেই বইমেলার প্রাণচাঞ্চল্য। কিন্তু ভোটের কারণে এবার মেলার আয়োজন পিছিয়ে গেছে। বইমেলাহীন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান যেন খাঁ খাঁ করছে। উদ্যানের গেটের বাইরে কিছু মানুষের জটলা থাকলেও ভেতরে সেই পরিচিত কোলাহল নেই।
বেসরকারি চাকরিজীবী আহসান হাবিব তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে ঘুরতে এসেছিলেন। তিনি বলেন, অন্যবার ফাগুনে বইমেলায় ধুলো মেখে হাঁটার আলাদা একটা আনন্দ ছিল। বই দেখা, কেনা আর প্রিয়জনের হাত ধরে
হাঁটা– এটাই তো ছিল প্যাকেজ। আজ টিএসসিতে এলাম, চা খেলাম। কিন্তু মেলা না থাকায় মনে হচ্ছে কোনো একটা সাধারণ ছুটির দিনে ঘুরতে এসেছি। উৎসবের সেই ‘ভাইব’টা মিস করছি।
বড় কোনো আয়োজন না থাকলেও প্রিয়জনকে ফুল দেওয়ার রীতিতে ভাটা পড়েনি। শাহবাগের ফুলের দোকানগুলোতে সকাল থেকেই ভিড় দেখা গেছে। গোলাপ, জারবেরা আর গ্লাডিওলাসের চাহিদা তুঙ্গে। তবে ফুল বিক্রেতারাও বলছেন, বিক্রিতে ভাটা না থাকলেও পরিবেশটা অন্য রকম।
শাহবাগের প্রবীণ ফুল বিক্রেতা মতিন মিয়া বলেন, বেচাকেনা ভালোই। মানুষ ফুল কিনছে, খোঁপায় পরছে। কিন্তু অন্যবার যেমন মানুষের স্রোত থাকে, আমরা দম ফেলার সময় পাই না। এবার তা নেই।
বড় পরিসরে আয়োজন না থাকায় মানুষ নিজেরাই খুঁজে নিয়েছে উদযাপনের পথ। রমনা পার্ক, চন্দ্রিমা উদ্যান কিংবা টিএসসির সড়কদ্বীপগুলোতে ছোট ছোট জটলা করে বসেছে যুগল ও বন্ধুরা। কেউ কেউ মোবাইলে গান বাজিয়ে বসন্ত উদযাপন করছেন।
- বিষয় :
- ঐতিহ্য
