‘আমার কান্না শুনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওনাকে আসতে দিন’
অপহৃত স্কুলছাত্রকে উদ্ধারে প্রধানমন্ত্রীর সহায়তার বর্ণনা দিলেন বাবা শামীম
তথ্য মন্ত্রণালয়ের পিআইডির ল্যাব সহকারী খন্দকার শামীম হাসান। ছবি-সমকাল
ইন্দ্রজিৎ সরকার
প্রকাশ: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ২০:৩৬
‘প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা আমাকে বলেন, এভাবে দেখা করতে দেওয়ার সুযোগ নেই। ওনাদের আমি বলেছি, স্যার আমার ছেলেকে কিডন্যাপ করেছে, মারধর করছে, টাকা চাচ্ছে। আমাকে যেতে দেন প্লিজ। আমি বারবার অনুরোধ করার মধ্যেই একজন বলেন, উনি তো সচিবালয়েই চাকরি করেন। তারপর তারা বললেন, আচ্ছা আমরা দেখছি। এরপর প্রধানমন্ত্রী অফিস থেকে নেমে এলে আমি কাছে যাওয়ার চেষ্টা করি। নিরাপত্তাসংশ্লিষ্টরা তবুও রাজি হচ্ছিলেন না। কিন্তু আমার কান্না–চিৎকার শুনে প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেন, কী হয়েছে? ওনাকে আসতে দিন।’ অপহৃত ছেলেকে উদ্ধারে সহায়তা চাইতে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে যাওয়ার ঘটনা এভাবেই বর্ণনা করেন তথ্য মন্ত্রণালয়ের পিআইডির ল্যাব সহকারী খন্দকার শামীম হাসান।
মঙ্গলবার বিকেলে তাঁর নবম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে কে এম আফ্ফান সাইফকে অপহরণ করা হয়। পরে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এক ঘণ্টার মধ্যেই রাজধানীর শান্তিনগর থেকে তাকে ‘উদ্ধার’ করে পুলিশ। সে বিষয়ে বুধবার সমকালের সঙ্গে কথা হয় শামীম হাসানের।
তিনি বলেন, ছেলেকে উদ্ধারের কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছিলাম না। আমার চাচা বললেন, স্বরাষ্ট্র সচিবের কাছে যাও। তখন আমি তাকে বলি, সচিবালয় থেকে বের হওয়ার সময় দেখেছি, প্রধানমন্ত্রী স্যার আছেন। যদি স্যার বের হন, তাহলে আমি তাঁর কাছেই যাব। এই সাহস নিয়েই আমি গেছি। একটু পরই দেখি স্যার নামছেন। আমি কাঁদতে কাঁদতে স্যারকে ঘটনা বলেই অচেতন হয়ে পড়ি। পরে স্যার বলেন, আচ্ছা কান্নাকাটি করিও না, আমি দেখছি। সঙ্গে থাকা একজনকে স্যার বলেন, ওই এলাকায় পুলিশের কে আছে? আরেকজন জানালেন, ডিসি মাসুদ। স্যার বলেন, ওকে জানিয়ে দাও আর ফোনে আমাকে ধরিয়ে দাও। দ্রুত একজন ফোন করে স্যারের সঙ্গে কথা বলিয়ে দেন। উনি ডিসি স্যারকে বলেন, খন্দকার শামীম নামে একজন যাচ্ছে, ওনার ছেলেকে কিডন্যাপ করা হয়েছে, তুমি দ্রুত ব্যবস্থা নাও। এরপর প্রধানমন্ত্রী আমাকে জিজ্ঞেস করেন, তুমি কোথায় চাকরি করো? আমি জানাই যে তথ্য মন্ত্রণালয়ে কাজ করি। আমি ছেলের খোঁজে রমনা পর্যন্ত গিয়ে কোনো উপায় না পেয়ে আবার ফিরে এসেছি। তবে এত বড় সাপোর্ট পাব আশা করিনি।
শামীম জানান, প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দেওয়ার পর তিনি দ্রুত পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার মাসুদ আলমের কার্যালয়ে যান। সেখানে আগে থেকেই তৈরি ছিল পুলিশ। উপকমিশনার আমাকে নিয়ে শান্তিনগর এলাকায় যান। সেখানে নির্মাণ শেষ না হওয়া একটি পরিত্যক্ত ভবনে আমার ছেলেকে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। কিন্তু আমরা পৌঁছার আগেই অপহরণকারীরা কোনোভাবে খবর পেয়ে ছেলেকে ভবনের নিচে রেখে পালিয়ে যায়। ছেলে হাঁটার সময় পড়ে গেলে আশপাশের লোকজন তাকে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরে ডিসি স্যার আমার ছেলের সঙ্গে কথা বলে ঘটনার সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেন।
তিনি জানান, পরিবারের সঙ্গে খিলগাঁওয়ের গোড়ান এলাকার শান্তিপুরে থাকে ১৫ বছর বয়সী আফ্ফান সাইফ। মঙ্গলবার বিকেল ৩টার দিকে সে প্রাইভেট পড়া শেষে সাইকেল চালিয়ে বাসায় ফিরছিল। পথে শান্তিনগর এলাকায় প্রথমে দুইজন তার পথ আটকায়। তাকে জিজ্ঞেস করে, তুমি এই এলাকায় আসছ কেন? আসো তোমার সঙ্গে কথা আছে। ছেলে বোঝানোর চেষ্টা করে যে, সে বাসায় যাচ্ছিল। কিন্তু ওই দুজন এবং পরে যুক্ত হওয়ার আরও চার–পাঁচজন তাকে জোর করে পরিত্যক্ত ভবনটির সাততলায় নিয়ে যায়। সেখানে আরও বেশ কয়েকজন ছিল। তারা আফ্ফানকে মারধর করে। একপর্যায়ে তার ফোন থেকে তার মায়ের মোবাইল নম্বরে কল দেওয়া হয়। প্রথমে আফ্ফান কাঁদতে–কাঁদতে ঘটনা জানায়, পরে কথা বলে অপহরণকারীরা। তারা ৫০ হাজার টাকা দাবি করে। যদিও কয়েক দফা কথোপকথনে টাকার পরিমাণ কমাতে কমাতে শেষে তারা ১০ হাজার চায়। কিন্তু কোনো মোবাইল ব্যাংকিং নম্বর দেয়নি। আর তারা শান্তিনগরে থাকলেও বলেছিল খিলগাঁও চৌধুরীপাড়ার কথা।
উপকমিশনার মাসুদ আলম জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা পাওয়ার পর দ্রুত অপহরণকারীদের অবস্থান শনাক্ত করে সেখানে অভিযান চালায় পুলিশ। এর আগে অপহরণকারীরা যে নম্বর থেকে কল দিয়েছিল সেই নম্বর নিয়ে টাকা পাঠানোর আশ্বাস দিয়ে যোগাযোগ শুরু করে পুলিশ। তবে শেষপর্যন্ত পুলিশের উপস্থিতি বুঝতে পেরে অপহরণকারীরা পালিয়ে যায়। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে তাদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
