ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

পাহাড়-সাগর-চরে সর্বত্র ভ্রমণপিয়াসী

পাহাড়-সাগর-চরে সর্বত্র ভ্রমণপিয়াসী
×

ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার মুহুরী প্রকল্প এলাকায় ঈদ-পরবর্তী সময়ে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীরা। ছবিটি সোমবার বিকেলে মুহুরী নদী থেকে তোলা সমকাল

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ২৫ মার্চ ২০২৬ | ০৭:৪৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

ঈদের দীর্ঘ ছুটিতে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত বা পাহাড়ের সাজেক ভ্যালির মতো প্রচলিত স্থানগুলোর পাশাপাশি পদ্মা সেতু, পায়রা সেতুর মতো স্থাপনাও হয়ে উঠেছিল অলিখিত পর্যটন কেন্দ্র। ভ্রমণপিপাসুরা ছুটি উপভোগে নিজ নিজ এলাকার বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানেও ভিড় জমিয়েছিলেন। পর্যটকের ভিড়ে নতুন নতুন স্থান পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।
ঈদুল ফিতরের ছুটিকে কেন্দ্র করে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে নামে পর্যটকের ঢল। প্রাণ ফিরে পায় ব্যবসা-বাণিজ্য। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে সুগন্ধা পয়েন্টে গিয়ে দেখা গেছে, ছুটি শেষ হলেও এখনও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পর্যটক রয়েছেন। কক্সবাজার আবাসিক হোটেল মোটেল গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার জানান, ঈদের দিন থেকে গত তিন দিনে কক্সবাজার ভ্রমণে এসেছেন অন্তত চার লাখ পর্যটক। 

ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার জোনের পরিদর্শক জাহিদুল ইসলাম বলেন, ঈদের ছুটিতে কক্সবাজারে প্রচুর পর্যটকের আগমন ঘটেছে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। 
চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত লাখো মানুষের পদচারণায় মুখর ছিল। গতকালও সৈকতে হাজারো মানুষ ভিড় করে। এ ছাড়া বিনোদন স্পট ফয়’স লেক এবং ও সি ওয়ার্ল্ড ওয়াটারে ঈদের ছুটিতে পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরতে গেছেন অনেকে। এর বাইরে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা, সীতাকুণ্ডের গুলিয়াখালী সাগরপাড়, মিরসরাইয়ের মহামায়া লেক, আনোয়ারার পারকি সমুদ্রসৈকতও ছিল পর্যটকমুখর। চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার ডেপুটি কিউরেটর শাহাদাত হোসেন বলেন, দিনে প্রায় ২০ হাজার দর্শনার্থী আসছেন। 
গতকাল সরকারি ছুটি শেষ হলেও সিলেটে পর্যটক আসার স্রোত থামেনি। ছুটি শুরুর পরদিন থেকেই জেলার বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে ছিল ভ্রমণপিপাসুদের উপস্থিতি। লাক্কাতুরা চা-বাগান, বাইশটিলা, খাদিম রিসোর্ট, জাফলং, সাদাপাথর, বিছনাকান্দি, উৎমাছড়া, দমদমছড়া, লক্ষণছড়া, পান্থুমাই, খাসিকম, তামাবিল, নলিউরি ফলস, ডিবির হাওর, জৈন্তাপুর, লালাখাল ও জলার বন রাতারগুল, খাসিয়া পানপুঞ্জিসহ অর্ধশতাধিক পর্যটন স্পটে ছিল পর্যটকের উপচে পড়া ভিড়। বৃহত্তর জাফলং পর্যটন কেন্দ্র ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি হোসেন মিয়া বলেন, এবার ঈদের ছুটিতে অনেকটা ভালো ব্যবসা হয়েছে। এই ধারা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে তারা বিগত সময়ের লোকসান অনেকটা পুষিয়ে নিতে পারবেন। ছুটি শুরুর আগে থেকে গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট, বিটিআরআই পরিচালিত টি রিসোর্ট, ব্যক্তিমালিকানাধীন বালিশিরা টি রিসোর্ট, লেমন গার্ডেন টি রিসোর্ট, প্যারাগন, জেলা সদরের রাঙাউটিসহ সব হোটেল-রিসোর্ট বুকিং দেওয়া ছিল। 

কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাগুরছড়া খাসিয়াপুঞ্জি, বাঘিছড়া লেক, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মৃতিসৌধ, মাধবপুর লেক, হামহামছড়া জলপ্রপাত, শ্রীমঙ্গলের লেবুবাগানের অপরূপ বনাঞ্চল, দার্জিলিংটিলা, রাধানগর মণিপুরিপল্লী, গিরিখাত, বিটিআরআই চা বাগান, বড়লেখার মাধবকুণ্ড ও পরীকুণ্ড জলপ্রপাত, মৌলভীবাজার সদরের বর্ষিজোড়া ইকোপার্ক, রাজনগরের জলের গ্রাম অন্তেহরিসহ জেলার সবকটি সবুজ গালিচাসম চা বাগান আর হাওরের দৃষ্টিনন্দন সৌন্দর্য উপভোগ করেন পর্যটক। 
লাউয়াছড়া উদ্যান কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, ঈদের তিন দিনে ৪ হাজার ৭৪২ জন পর্যটক উদ্যানে প্রবেশ করেন। আয় হয় ৫ লাখ ৩০ হাজার টাকা।
রাঙামাটির বাঘাইছড়ির সাজেক ভ্যালিতে রুম বুকিং না করে বেড়াতে গিয়ে শত শত নারী-শিশুসহ পর্যটকরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন। সারাদেশের মতো পাহাড়েও জ্বালানি তেলের সংকটে বেকায়দায় পড়ে অনেক বাইকার ও ভ্রমণদল। ফলে অনেকে গতকালও ফিরতে পারেননি গন্তব্যে। সরেজমিন দেখা গেছে, অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে রিসোর্ট-কটেজ পূর্ণ থাকায় অনেকেই বারান্দা, ক্লাবঘর, স্থানীয়দের বাড়ি, এমনকি রাস্তায় রাত কাটাচ্ছেন।

সাজেক রিসোর্ট ও কটেজ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মতিজয় ত্রিপুরা জানান, এখানে প্রায় ১১১টি রিসোর্ট-কটেজ রয়েছে। ২২ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত সব রিসোর্ট-কটেজের রুম শতভাগ বুকড রয়েছে। আজও (গতকাল) মোটরসাইকেল, জিপ, মাইক্রোবাসে করে প্রায় সাড়ে তিন হাজার পর্যটক সাজেক এসেছেন।
একটি রিসোর্টের মালিক জিয়াউল হক যুবরাজ বলেন, শুধু হোটেল-কটেজ নয়; গাড়িতে তেল না থাকায় অনেকেই সাজেক যেতে পারছেন না। তাই অনেকে খাগড়াছড়ি থেকে ফিরে যাচ্ছেন ঘরে। পণ্য পরিবহন এবং পানির সংকটও সৃষ্টি হচ্ছে। খাগড়াছড়ি আবাসিক হোটেল মালিক সমিতির সভাপতি এস অনন্ত ত্রিপুরা বলেন, এই মৌসুমে প্রত্যাশা ছিল বেশি। কিন্তু জ্বালানি সংকট ব্যাঘাত সৃষ্টি করেছে। খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক আনোয়ার সাদাত বলেন, প্রশাসনের সার্বক্ষণিক তদারকির পাশাপাশি গ্রাহকের চাহিদামতো তেল সরবরাহে ফিলিং স্টেশনগুলোতে নির্দেশ দেওয়া আছে।
পর্যটকরা রাঙামাটির ঝুলন্ত সেতু, পলওয়েল পার্ক, শিশু পার্ক, কাপ্তাই হ্রদে নৌ ভ্রমণ, রাজবন বিহার, চাকমা রাজবাড়ি, শুভলং ঝর্ণা, আরণ্যক, রাঙাদ্বীপ, বার্গী লেক ভ্যালি ও আসামবস্তি-কাপ্তাই সড়কের সৌন্দর্য উপভোগ করেছেন। রাঙামাটি ট্যুরিস্ট মালিক সমিতির সভাপতি রমজান আলী জানান, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার ভালো পর্যটক এসেছেন। আমরা সন্তুষ্ট।
নির্বাচন ও রোজা ঘিরে দীর্ঘ প্রায় দুই মাস পর্যটকশূন্য থাকার পর ঈদে প্রাণ ফিরে পেয়েছে সাগরকন্যা কুয়াকাটা। ঈদের দ্বিতীয় দিন থেকেই এই সমুদ্রসৈকত পরিণত হয় পর্যটকের মিলনমেলায়।
ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব কুয়াকাটা (টোয়াক)-এর সভাপতি রুমান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, অনেক দিন পর কুয়াকাটায় এমন পর্যটকের ভিড় দেখা যাচ্ছে। পর্যটন খাতের সঙ্গে সরাসরি জড়িত প্রায় ১৬টি পেশার মানুষ এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন। ২২০টির বেশি আবাসিক হোটেলের প্রায় ৯৫ শতাংশ বুকিংয়ের পাশাপাশি আশপাশের বাসাবাড়িও বুকড হচ্ছে। 

নতুন পর্যটন কেন্দ্র গড়ছেন পর্যটক
মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলায় পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে ঢল নেমেছিল বিনোদনপ্রত্যাশীদের। পদ্মা সেতুর মাওয়া প্রান্তে নদীতীরে হেঁটে হেঁটে সেতু দেখার পাশাপাশি পদ্মার পানি ছুঁয়ে দেখেছেন দর্শনার্থীরা। জনপ্রতি ১০০ টাকায় ট্রলার নিয়ে পদ্মা সেতুর কাছে যেতে দেখা গেছে অনেককে। শিমুলিয়া ঘাটের রেস্তোরাঁগুলোতেও ইলিশের স্বাদ নিতে ছুটে এসেছেন অনেকেই। 
ঈদের দিন বিকেল থেকে গতকাল পর্যন্ত উপজেলার মাওয়ায় পদ্মা সেতু এলাকা, শিমুলিয়া ঘাট, বেজগাঁও মৃধাবাড়ির টিনকাঠের তিনতলা ঘর, গাওদিয়া ইউনিয়নের শামুরবাড়ির পদ্মাতীর ও কলমা ইউনিয়নে সাবেক মন্ত্রী মিজানুর রহমান সিনহার সুরম্য গ্রামের বাড়িতেও উপচে পড়া দর্শনার্থীর ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। 
পটুয়াখালীর দুমকীতে পায়রা সেতু নতুন পর্যটন স্পট হিসেবে পরিচিত পেয়েছে। ঈদের ছুটিতে সেখানে ছিল দর্শনার্থীর উপচে পড়া ভিড়।
সেতুর নিচে প্রেস ক্লাব আয়োজিত মাসব্যাপী ঈদ আনন্দ মেলার চতুর্থ দিন ছিল গতকাল। দর্শকের পাশাপাশি মেলার বিভিন্ন স্টলেও ছিল জমজমাট বেচাকেনা। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে মেলার সৌন্দর্য যেন আরও বহু গুণে বেড়ে যায়। দুমকী প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান খান বলেন, দুমকীতে কোনো বিনোদন কেন্দ্র না থাকায় এবার প্রেস ক্লাব ঈদ আনন্দ মেলার আয়োজন করেছে। দর্শনার্থীদের ব্যাপক সাড়া মিলছে। 

ঈদের দিন সকাল থেকেই রাজবাড়ীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারো মানুষ ভিড় জমান পদ্মার তীরে। লা প্রশাসনের উদ্যোগে পদ্মাপুলক ও জলকাব্য নামে যে দুটি কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে, সেখানেই ভিড় সবচেয়ে বেশি। ওপারে জেগে ওঠা বিস্তীর্ণ চর যেন বাড়তি আকর্ষণ হয়ে দাঁড়ায় দর্শনার্থীর জন্য। ছোট ছোট নৌকায় দলবেঁধে মানুষ পারাপার হয় চরে। 
ফেনীর সোনাগাজীর মুহুরী প্রকল্প ও সাহেবের ঘাট সেতু এলাকা দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে মুখর ছিল। প্রকল্প এলাকায় বায়ুবিদ্যুৎসহ নদীতে জেলেদের মাছ ধরার মনোমুগ্ধকর দৃশ্য উপভোগ করতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এখানে ছুটে আসেন।
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনসহ (সোনারগাঁ জাদুঘর) পানাম নগরী, বাংলার তাজমহল ও পিরামিড, বারদী ছটাকিয়ায় মেঘনার পাড়, বৈদ্যেরবাজার ঘাট, কাইকারটেক ব্রিজ এলাকা, পিরোজপুরে নীলদিগন্ত পার্কসহ বিভিন্ন বিনোদন স্পটে দর্শনার্থীর পদচারণায় মুখর ছিল। 
(প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যুরো, অফিস ও প্রতিনিধিরা)
 

আরও পড়ুন

×