ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সরকারি কর্মচারীদের আন্দোলন

বরখাস্তসহ শাস্তি বাড়িয়ে সংসদে বিল পাস

বরখাস্তসহ শাস্তি বাড়িয়ে সংসদে বিল পাস
×

ছবি: ফাইল

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২৬ | ১২:১৮

সরকারি কর্মচারীদের আন্দোলনে বরখাস্তসহ শাস্তির আওতা বাড়িয়ে ‘সরকারি চাকরি (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ সংসদে পাস হয়েছে। এতে সরকারি কর্মচারীদের তিনটি বিষয় অপরাধের আওতাভুক্ত করা হয়েছে। গতকাল রোববার সংসদের বৈঠকে বিলটি পাসের জন্য উত্থাপন করেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী। পরে বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়।

তবে বিলের ওপরে কোনো আলোচনা হয়নি। এমনকি বিরোধী দলের সদস্যরা কণ্ঠভোটে পক্ষে বা বিপক্ষে অংশ নেননি। চলতি ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে এই বিল পাসে সময় লেগেছে মোট ৩ মিনিট ৩৫ সেকেন্ড। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩ অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি হুবহু পাসের সুপারিশ করেছিল সংসদীয় বিশেষ কমিটি। এই আইন ২০২৫ সালের মে ও জুলাইয়ে দুদফায় সংশোধন করে দুই অধ্যাদেশ জারি করেছিল ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার। এই বিলের মাধ্যমে দুটি অধ্যাদেশ এক আইনে রূপ পেতে যাচ্ছে। রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পেলেই বিলটি আইনে পরিণত হবে।

বিলে ২০১৮ সালের সরকারি চাকরি আইনে একটি নতুন ধারা [৩৭(ক)] যুক্ত করে বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারী ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বৈধ আদেশ অমান্য করলে, আইনসংগত কারণ ছাড়া সরকারের কোনো আদেশ, পরিপত্র ও নির্দেশ অমান্য করলে, তার বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত করলে বা এসব কাজে অন্য কোনো সরকারি কর্মচারীকে প্ররোচিত করলে তা শাস্তিযোগ্য হবে। একই সঙ্গে ছুটি বা যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া অন্যান্য কর্মচারীর সঙ্গে সমবেতভাবে নিজ কর্ম থেকে অনুপস্থিত থাকা বা বিরত থাকা এবং কোনো সরকারি কর্মচারীকে কর্মে উপস্থিত হতে বা কর্তব্য সম্পাদনে বাধাগ্রস্ত করাকেও ‘সরকারি কর্মে বিঘ্ন সৃষ্টিকারী অসদাচরণ’ হিসেবে গণ্য করা হবে। এসব অসদাচরণের জন্য তিন ধরনের দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। সেগুলো হলো নিম্নপদ বা নিম্ন বেতন গ্রেডে অবনমন, বাধ্যতামূলক অবসর এবং চাকরি থেকে বরখাস্ত।

বিল অনুযায়ী, অভিযোগ গঠনের পর সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিতে হবে। কারণ দর্শানো ও শুনানির পর অভিযোগের ভিত্তি পাওয়া গেলে তিন কার্যদিবসের মধ্যে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে।

তদন্ত কমিটির সদস্যদের অভিযুক্ত ব্যক্তির চেয়ে পদে জ্যেষ্ঠ হতে হবে। অভিযুক্ত ব্যক্তি নারী হলে কমিটিতে অন্তত একজন নারী সদস্য রাখতে হবে। কমিটিকে ১৪ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে হবে। যুক্তিসংগত কারণে এ সময় একবারের জন্য সর্বোচ্চ সাত কার্যদিবস বাড়ানো যাবে। নির্ধারিত সময়ে তদন্ত শেষ না হলে নতুন তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। আর যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া তদন্ত প্রতিবেদন দিতে ব্যর্থ হলে তা কমিটির সদস্যদের অদক্ষতা হিসেবে বিবেচিত হবে এবং সরকারি কর্মচারী বাতায়ন ও ডোসিয়ারে তা লিপিবদ্ধ থাকবে।

কোনো কর্মচারীকে দণ্ড দেওয়া হলে তিনি ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে আপিল করতে পারবেন। রাষ্ট্রপতির আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করা না গেলেও ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে তাঁর কাছে রিভিউ চাওয়া যাবে।

বিলের উদ্দেশ্য ও কারণসংবলিত বিবৃতিতে জনপ্রশাসনমন্ত্রী বলেন, বিলটি পাস হলে সরকারি কর্মচারীদের শৃঙ্খলা, জবাবদিহি প্রতিষ্ঠাসহ এ-সংক্রান্ত আইনি ব্যবস্থা নিতে সহায়ক হবে। 

অন্তর্বর্তী সরকার এই অধ্যাদেশ জারির পর সচিবালয়সহ বিভিন্ন জায়গায় দিনভর বিক্ষোভ করেছিলেন সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মচারীরা। পরে গত ২৩ জুলাই দ্বিতীয় সংশোধনী অধ্যাদেশ জারি করা হয়।

আইনের মৌলিক ত্রুটি সংশোধন হয়নি

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া সমকালকে বলেন, সরকারি চাকরি আইনের মৌলিক ত্রুটি সংশোধন হয়নি। কারণ, এই আইন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও বিধিবদ্ধ সংস্থার কর্মচারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। ফলে তারা এই আইনের ৩৭(ক) ধারা লঙ্ঘন করলে শাস্তি দেবেন কীভাবে? এ জন্য সব সরকারি চাকরিজীবীকে অন্তর্ভুক্ত করে এই আইন সংশোধন করা প্রয়োজন ছিল। 

তিনি বলেন, মেট্রোরেল, ব্যাংক ও বিদ্যুৎ বিভাগের বিভিন্ন কোম্পানিসহ অনেক সরকারি কর্মকর্তা আন্দোলন করলে সরকার শাস্তি দিতে পারবে না। ফিরোজ মিয়া বলেন, সরকারি কর্মচারীরা জনগণকে জিম্মি করে যেভাবে আন্দোলন করে, এটি কোনোভাবেই হওয়া উচিত নয়। তারা শুধু নিজেদের স্বার্থে জনগণকে জিম্মি করে। 

বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী ঐক্য ফোরামের কো-মহাসচিব নজরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, আমাদের আন্দোলনটি ছিল মূলত সামরিক শাসনামলের বিতর্কিত ও কালাকানুন বাতিলের। সরকার কর্মচারীদের আপত্তি ও আশঙ্কাগুলো বিবেচনায় এনে অন্তর্বর্তী সরকার তা সংশোধন করে অধ্যাদেশ জারি করেছিল। এখন এটি সংসদে বিল হিসেবে পাস হওয়ায় মন্দের ভালো হলো।

আরও পড়ুন

×