ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

পরীক্ষা এগিয়ে আনতে চায় সরকার, অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন

পরীক্ষা এগিয়ে আনতে চায় সরকার, অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন
×

 বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:৩৮ | আপডেট: ২১ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:৫০

| প্রিন্ট সংস্করণ

শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন থেকে দীর্ঘ সময় অপচয় কমাতে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের দুটি বড় পাবলিক পরীক্ষা এসএসসি ও এইচএসসি প্রতিবছর ডিসেম্বরের মধ্যেই শেষ করার পরিকল্পনা করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ লক্ষ্যে শিক্ষাবর্ষকে জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে কার্যকর করার পাশাপাশি পরীক্ষা পদ্ধতি, বিষয় সংখ্যা এবং মূল্যায়ন কাঠামোয় বড় ধরনের সংস্কারের ইঙ্গিত দিয়েছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। 

তবে শিক্ষামন্ত্রীর এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন সাধারণ অভিভাবকরা। তাদের আশঙ্কা, এতে শিখন ঘাটতি তৈরি হবে। ছাত্রছাত্রীদের বড় ধরনের ক্ষতি হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষকরা সিলেবাস পুরোপুরি শেষ না করেই তাড়াহুড়ো করে পরীক্ষার দিকে চলে যাবেন। পরীক্ষা নেওয়া নয়, বরং সরকারের ফোকাস হওয়া উচিত শিক্ষার্থীরা যেন সংশ্লিষ্ট সিলেবাস শেষ করতে পারে এবং সংশ্লিষ্ট শ্রেণির শিখন ফল পুরোপুরি অর্জন করতে পারে। 

গতকাল সোমবার চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা উপলক্ষে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, প্রতিটি পরীক্ষার কোর্স শেষ হবে ডিসেম্বরের মধ্যে; পরীক্ষা হতে হবে ডিসেম্বরের মধ্যে– এটা পরিষ্কার। পরীক্ষা তো পরীক্ষাই। পাবলিক পরীক্ষা আবার আলাদা কী? একটা সার্টিফিকেট দিচ্ছে বোর্ড। এ 

জন্য আমি জাতির জীবন থেকে ২০ লাখ বছর নষ্ট করে দেব?
তিনি বলেন, বর্তমানে একজন শিক্ষার্থী দশম শ্রেণির পাঠ শেষ করার পর পরের বছর এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। একইভাবে একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির পাঠ শেষে এইচএসসি পরীক্ষাও পরের বছরে অনুষ্ঠিত হয়। এর ফলে একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন থেকে প্রায় দুই বছর সময় হারিয়ে যাচ্ছে, যা ব্যক্তি ও জাতীয়; উভয় পর্যায়েই বড় ক্ষতি।

শিক্ষাবর্ষে ফিরতে চায় সরকার
নতুন পরিকল্পনার যুক্তি হিসেবে শিক্ষামন্ত্রী জানান, সরকার দীর্ঘদিন ধরে ব্যাহত হওয়া জানুয়ারি-ডিসেম্বর শিক্ষাবর্ষ পুরোপুরি পুনর্বহালের চেষ্টা করছে। করোনা মহামারির পর থেকে শিক্ষাপঞ্জি একাধিকবার পরিবর্তিত হওয়ায় পরীক্ষার সময়সূচি পিছিয়ে যায়। আগে এসএসসি ফেব্রুয়ারিতে এবং এইচএসসি এপ্রিল মাসে শুরু হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই ধারাবাহিকতা ভেঙে যায়।
চলতি বছর এসএসসি পরীক্ষা আজ মঙ্গলবার শুরু হচ্ছে এবং এইচএসসি ২ জুলাইয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। তবে আগামী বছর থেকে ধাপে ধাপে এই সময়সূচি এগিয়ে এনে ডিসেম্বরের মধ্যেই পরীক্ষাগুলো শেষ করার রূপরেখা তৈরি করা হচ্ছে।

মন্ত্রী বলেন, যদি সেশন জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর হয়, তাহলে ডিসেম্বরের মধ্যে পরীক্ষা শেষ করতেই হবে। শিক্ষার্থীদের এক বছর করে অপেক্ষা করিয়ে রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই। আমরা চাই তারা দ্রুত পরবর্তী ধাপে যেতে পারুক।

শিক্ষা বোর্ডগুলোর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন
ডিসেম্বরের মধ্যে পরীক্ষার আয়োজন করতে শিক্ষা বোর্ডগুলো প্রস্তুত কিনা– এমন প্রশ্নে এহছানুল হক মিলন বলেন, সক্ষমতা তৈরি করা সরকারের দায়িত্ব এবং সে দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রস্তুত কিনা– সেটাই আসল বিষয়। প্রয়োজন হলে বোর্ডগুলোকেও প্রস্তুত হতে হবে। ডিসেম্বরে পরীক্ষা না হলে জবাবদিহি করতে হবে। এ সময় শিক্ষা বোর্ড কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত ভাতা ও প্রশাসনিক জটিলতার বিষয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। 
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, পরীক্ষা ব্যবস্থাকে সময়োপযোগী করতে বোর্ডগুলোর কাঠামোগত সংস্কারের বিষয়ও সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।

উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা
সরকারের সময় বাঁচানোর পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অনেক অভিভাবক। তাদের আশঙ্কা, সময় কমিয়ে দিলে পাঠ্যসূচি শেষ না করেই শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় বসতে হতে পারে।
ফারিয়া হক চৈতি নামে এক অভিভাবক সমকালকে বলেন, পুরো সিলেবাস শেষ না করে তড়িঘড়ি করে পরীক্ষা নিলে শিখন ঘাটতি থেকে যাবে। এতে ভালো ফল হলেও প্রকৃত শিক্ষা হবে না।
ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক নজরুল ইসলাম বলেন, এসএসসির তুলনায় এইচএসসির সিলেবাস অনেক বড়। সময় কমালে শিক্ষার্থীরা বিষয়বস্তু না বুঝেই পরীক্ষার মুখোমুখি হবে।

ধানমন্ডি গভর্নমেন্ট বয়েজ হাই স্কুলের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী জীবন বলেন, সরকারের আগে ফোকাস হওয়া উচিত শিক্ষার্থীদের সংশ্লিষ্ট শ্রেণির শিখন ফল অর্জিত হয়েছে কিনা। সেটা গুরুত্ব না দিয়ে আগে পরীক্ষার সময় ঠিক করা মোটেও যুক্তিযুক্ত হচ্ছে না। কারণ শিক্ষার উদ্দেশ্য পরীক্ষা দেওয়া নয়, জ্ঞান অর্জন করা।

বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী সমকালকে বলেন, শিক্ষাবর্ষ ও পরীক্ষা সময়মতো শেষ করার পরিকল্পনা ইতিবাচক হলেও এর সফল বাস্তবায়নে প্রয়োজন সমন্বিত প্রস্তুতি। শিক্ষক সংকট, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের সময়, পাঠ্যসূচির ভারসাম্য, মূল্যায়ন পদ্ধতির আধুনিকীকরণ, শিক্ষা বোর্ডগুলোর প্রশাসনিক সক্ষমতা– সবকিছু একসঙ্গে উন্নত না হলে শুধু সময় এগিয়ে এনে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে।

অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউল কবির দুলু বলেন, বছরের পরীক্ষা বছরের মধ্যেই হবে– এটা খুব আদর্শ কথা। বাস্তবে শিখন ঘাটতি রেখে পাবলিক পরীক্ষায় সন্তানদের বসিয়ে দেওয়া হলে ভবিষ্যতে শিক্ষার জন্য বিকলাঙ্গ প্রজন্ম তৈরি করা হবে। 

তিনি আরও বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যেই পরীক্ষা শেষ করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে লেখাপড়া পহেলা জানুয়ারি থেকেই শুরু করতে হবে। দুই-তিন মাস ধরে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করা যাবে না; শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনেই তা দিতে হবে। একাদশ শ্রেণির ক্লাস জুলাইয়ের পরিবর্তে জানুয়ারি থেকে শুরু করতে হবে। পুরো দুই বছর সময় যেন উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার্থীরা পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।  
তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের মাধ্যমেই শিক্ষার্থীদের সময় বাঁচানো এবং শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার পথে এগোতে চায় সরকার।

বিষয় কমানোর ভাবনা
শুধু পরীক্ষার সময় নয়; ভবিষ্যতে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় বিষয় সংখ্যা কমানোর সম্ভাবনাও সরকারের পক্ষ থেকে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ জন্য একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। কমিটি পরীক্ষা কাঠামো সহজ করে শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ কমানোর সুপারিশ করবে বলে জানা গেছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে অনেক দেশে কম বিষয় নিয়ে গভীরতর শিখন পদ্ধতি চালু রয়েছে। বাংলাদেশেও সে ধরনের বাস্তবসম্মত পরিবর্তনের পথ খোঁজা হচ্ছে। 

 

আরও পড়ুন

×