প্রকৃতি
বিলুপ্তপ্রায় বউলা গোটা
ময়মনসিংহের তারাকান্দার রাংসা নদীর ধারে বউলা গাছ লেখক
চয়ন বিকাশ ভদ্র
প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:৫০ | আপডেট: ২৮ এপ্রিল ২০২৬ | ১০:০৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
গত বছরের জুন মাসের শেষ সপ্তাহের একদিন বিকেলবেলা। ঢাকা-হালুয়াঘাট সড়কের তারাকান্দা বাজারের দক্ষিণ দিকে রাংসা নদীর ওপরে একটি সেতু। তার ওপর দাঁড়িয়ে পাখিদের নীড়ে ফেরা, আকাশকে লাল রঙে রাঙিয়ে সূর্যের অস্ত যাওয়ার প্রস্তুতি দেখলাম কিছুক্ষণ। তারপর সেই সেতু পেরিয়ে রাংসা নদীর দক্ষিণ তীর ধরে পূর্বদিকে হাঁটছিলাম আর নদীর ধারের গাছপালা দেখছিলাম। হঠাৎ মাঝারি আকারের একটি বৃক্ষের দিকে চোখ পড়ে গেল। নদীর দিকে ঝুলে আছে তার ডালপালা। ডালপালার আগায় সবুজ সুপারির মতো ছোট ছোট ফল। কাছে গিয়ে দেখলাম, আরে এ যে বউলা গোটা!
এই প্রথম বউলা গোটার দেখা পেলাম। নাম শুনেছি, কিন্তু এর আগে দেখা পাইনি। বউলা ছাড়াও উদ্ভিদটি বওলা, বহনারি, বোহারি, বহুল, বোয়ারা, লাশকারা, লাগোরা, আসলিয়া, বনারি, বাহুবারা, বাহুদুরি ইত্যাদি নামে এলাকাভেদে পরিচিত। বউলাই হয়তো লোকমুখে পরিবর্তিত হয়ে হয়েছে বওলা।
মাঝারি আকারের এই বৃক্ষের বৈজ্ঞানিক নাম Cordia dichotoma, এটি Boraginaceae পরিবারের উদ্ভিদ। ইংরেজিতে এই উদ্ভিদ সোপ বেরি, গ্লুবেরি বা ইন্ডিয়ান চেরি নামে পরিচিত। এ উদ্ভিদের আদিনিবাস ভারতীয় উপমহাদেশ, ইন্দো-মালয়েশিয়া ও উত্তর অস্ট্রেলিয়া। আমাদের দেশে এই উদ্ভিদ এখন বিলুপ্তির পথে।
চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলায় বউলা গাছ পাওয়া যেত প্রচুর। উদ্ভিদ ১০-১২ মিটার উঁচু হতে পারে। গাছ বেশি বুড়ো হলে পাতাঝরা গাছের মতো মনে হয়। শরৎকাল সংক্ষিপ্ত পাতা ঝরার সময়। পাতা সরল, উপবৃত্তাকার। উদ্ভিদের কাণ্ডের গায়ে লম্বভাবে কাটা দাগ আছে। ফুল ছোট, উভলিঙ্গিক, সাদা বর্ণের।
পাকা ফল দেখে খেতে ইচ্ছে করতে পারে। তবে খাওয়া ঠিক হবে না। স্বাদ পানসে মিঠা হলেও আঠায় মুখ ভরে যাবে। আঠা যেখানে যেখানে লাগবে, সেখানেই আটকে ধরবে। তারপরও অনেক এলাকায় এ ফল পাকার সময়, কোথাও কোথাও ফল ও বীজের শাঁস খাদ্য হিসেবে ও গ্রহণ করা হয়। শাঁস চর্মরোগে উপকারী।
বউলা গাছের বাকল ধূসর বাদামি বর্ণের। এর বাকল থেকে শতকরা ২০ ভাগ টেনিন পাওয়া যায়। বাকলের ক্বাথ টনিক হিসেবে অজীর্ণ, উদরাময়, জ্বর ও পেটের অসুখে কার্যকর। বউলার কাঠ তেমন শক্ত নয়। কাঠ দিয়ে নৌকা, বন্দুকের কুঁদা, কৃষি যন্ত্রপাতি ও ছোটখাটো আসবাব তৈরি হয়। তাজা পাতা গবাদি পশুর খাদ্য। তবে আগের মতো এই গাছ পাওয়া যায় না।
মার্চ-এপ্রিল মাসে বউলার ফুল ফোটে। মে-জুন মাসের দিকে ফল দেখা যায়। ফল পাকে জুলাই-আগস্ট মাসে। হালকা সবুজ বর্ণের ছোট ছোট ফল পেকে বাদামি-গোলাপি বর্ণের হয়। এই ফল হরিয়াল, বুলবুলি ও শালিকের প্রিয়। ফল পাকলে পুরো ফল আঠা দিয়ে ভর্তি থাকে। ফল থেকে আঠা পাওয়া যায় বলে এর আরেক নাম গামফল। এই ফলের আঠা দিয়ে একসময় বই-খাতার মলাট বাঁধা, চিঠির খাম আটকানো, ঘুড়ি বানানো ইত্যাদি কাজ হতো। আমরা অবশ্য ছোটবেলায় জিকা গাছের আঠা ব্যবহার করতাম। বউলা ফলের রস থেকে রং প্রস্তুত করা যায়।
লেখক : উদ্ভিদবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও প্রকৃতিবিষয়ক লেখক
