ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

প্রকৃতি

ছদ্মবেশী ফল বুনো স্ট্রবেরি

ছদ্মবেশী ফল বুনো স্ট্রবেরি
×

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাগানে বুনো স্ট্রবেরি। ছবি: লেখক

চয়ন বিকাশ ভদ্র

প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬ | ১০:১৬

বাগানে বা ঝোপঝাড়ের ধারে অনেক সময় আমরা ছোট ছোট, লাল টুকটুকে স্ট্রবেরির মতো ফল দেখতে পাই। দেখতে হুবহু স্ট্রবেরির মতো হলেও এগুলো আসলে বুনো স্ট্রবেরি বা Mock Strawberry। এর  বৈজ্ঞানিক নাম Potentilla indica, এটি Rosaceae পরিবারের লতানো বিরুত জাতীয় উদ্ভিদ। 

দেখতে লোভনীয়। তবে স্বাদ ও গুণের দিক থেকে এটি সাধারণ স্ট্রবেরির চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এর আদি নিবাস ভারত, চীন ও জাপান। তবে এখন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। 

বুনো স্ট্রবেরি একটি বহুবর্ষজীবী ভেষজ উদ্ভিদ; যা মাটির সমান্তরালে লতিয়ে চলে। সাধারণ স্ট্রবেরির ফুল সাদা হলেও বুনো স্ট্রবেরির ফুল হয় উজ্জ্বল হলুদ। এটি এই উদ্ভিদকে চেনার সবচেয়ে সহজ উপায়। এর ফলগুলো ছোট, গোল এবং লাল রঙের। সাধারণ স্ট্রবেরির বীজ ফলের গায়ে দেবে থাকে, কিন্তু বুনো স্ট্রবেরির বীজগুলো ফলের উপরিভাগে গুটি গুটি হয়ে জেগে থাকে।

বুনো স্ট্রবেরির পাতা তিন পত্রকবিশিষ্ট (Trifoliate) এবং ধারগুলো করাতের মতো খাঁজকাটা। বুনো স্ট্রবেরি বিষাক্ত নয়, কিন্তু এটি খাওয়ার যোগ্য কিনা, তা নিয়ে দ্বিধা থাকে। সাধারণ স্ট্রবেরি যেমন মিষ্টি ও সুগন্ধযুক্ত হয়, বুনো স্ট্রবেরি ঠিক তার উল্টো। এটি অত্যন্ত পানসে। অনেক সময় এর কোনো স্বাদই পাওয়া যায় না। তাই এটি খেলে কোনো শারীরিক ক্ষতি না হলেও খাওয়ার জন্য এটি খুব একটা জনপ্রিয় নয়।

বুনো স্ট্রবেরির কিছু ভেষজ গুণাগুণ রয়েছে। আয়ুর্বেদ ও প্রাচীন চীনা চিকিৎসায় এই উদ্ভিদের রয়েছ বিশেষ গুরুত্ব। এর পাতা ও ফলের নির্যাস বিভিন্ন চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। চর্মরোগ, ফোড়া বা পোকামাকড়ের কামড়ে এর পাতার রস উপশমকারী হিসেবে কাজ করে। এটি প্রদাহনাশক, অ্যান্টি-সেপটিক হিসেবে কাজ করে এবং শরীরের বাহ্যিক ক্ষত সারাতে সাহায্য করে। প্রাচীনকালে এর পাতার ক্বাথ দিয়ে কুলকুচি করে গলা ব্যথা বা মুখগহ্বরের ঘা কমানোর প্রচলন ছিল।

পরিবেশের বাস্তুতন্ত্রেও এই উদ্ভিদের ভূমিকা রয়েছে। বুনো স্ট্রবেরি খুব দ্রুত বংশবিস্তার করতে পারে, তাই অনেকে একে ‘আগাছা’ হিসেবে গণ্য করেন। তবে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় এর ভূমিকা রয়েছে। ছোট পাখি, কচ্ছপ এবং কাঠবিড়ালি এই ফল পছন্দ করে খায়। এটি মাটির উপরিভাগে ঘন আস্তরণ তৈরি করে, যা মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে এবং ক্ষয় রোধ করতে সাহায্য করে।

একে ছদ্মবেশী বলার মূল কারণ হলো এর বিভ্রান্তিকর চেহারা। সাধারণ মানুষের চোখে স্ট্রবেরি মনে হলেও এটি আসলে Potentilla গণের অন্তর্ভুক্ত। আর সত্যিকারের স্ট্রবেরি Fragaria গণের অন্তর্ভুক্ত। যারা না বুঝে স্ট্রবেরি মনে করে এটি মুখে দেন, তারা সাধারণত হতাশ হন। তবে বাগানের শোভাবর্ধক হিসেবে এটি বেশ সুন্দর। এর হলুদ ফুল ও খাঁজকাটা পাতা খুব সুন্দর।

যদিও এটি বিষাক্ত নয়, তবুও ঝোপঝাড় থেকে অচেনা কোনো ফল না ধুয়ে বা নিশ্চিত না হয়ে খাওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করা জরুরি, কারণ তারা আকর্ষণীয় লাল রঙের জন্য এটি মুখে দিয়ে ফেলতে পারে। সব লাল ফলই মিষ্টি হয় না বুনো স্ট্রবেরি তার একটি প্রমাণ। 

লেখক: উদ্ভিদবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও প্রকৃতিবিষয়ক লেখক।

আরও পড়ুন

×