ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

টিকা আমদানি কমাতে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যাগ

টিকা আমদানি কমাতে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যাগ
×

প্রতীকী ছবি

তবিবুর রহমান

প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬ | ১০:২৮

দেশে টিকার আমদানি-নির্ভরতা কমাতে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। রাষ্ট্রায়ত্ত ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডের মাধ্যমে ডেঙ্গু, জলাতঙ্ক, হাম ও সাপের কামড়-প্রতিরোধী টিকা উৎপাদনের প্রস্তুতি চলছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ম্যাচিউরিটি সনদ অর্জনে সক্ষমতা বাড়ানোর কাজও জোরদার করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে বর্তমানে বিদেশ থেকে যে দামে টিকা আমদানি করা হয়, তার প্রায় অর্ধেক ব্যয়ে স্থানীয়ভাবে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এতে সরকারের ব্যয় কমবে, টিকার সহজলভ্যতা বাড়বে এবং ভবিষ্যতে রপ্তানির নতুন সুযোগ তৈরি হবে।

স্বাস্থ্য খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে ওষুধ শিল্প উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও টিকা উৎপাদন ও রপ্তানিতে এখনও বড় বাধা হয়ে আছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অভাব। বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে হওয়ার পর বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে লেভেল-৩ (এমএল-৩) সনদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশে প্রধান বাধা

বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে টিকা উৎপাদন শুরু হয় ২০১১ সালে। বর্তমানে ইনসেপ্‌টা, পপুলার ও হেলথকেয়ার এই তিন ওষুধ কোম্পানি মানব ও পশুচিকিৎসায় ব্যবহৃত ১৫ থেকে ১৬ ধরনের টিকা উৎপাদন করছে। এর মধ্যে ইনসেপ্‌টা সীমিত পরিসরে কয়েকটি আফ্রিকান দেশে টিকা রপ্তানি করছে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এমএল-৩ সনদ না থাকায় বাংলাদেশি কোম্পানিগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে বড় পরিসরে প্রবেশ করতে পারছে না। এই সনদ কোনো দেশের ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থার বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা, মান নিয়ন্ত্রণ ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হয়।

বর্তমানে দেশের ওষুধ ও টিকা খাতের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর এখনও এই সনদ অর্জন করতে পারেনি। ফলে বাংলাদেশে উৎপাদিত টিকার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রি-কোয়ালিফিকেশন আবেদনও গ্রহণ করা হয় না। এতে আন্তর্জাতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত বাজারে টিকা রপ্তানির সুযোগ সীমিত হয়ে আছে।

সম্প্রতি দ্রুত এমএল-৩ সনদ অর্জনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে এলডিসি উত্তরণের পর ওষুধ রপ্তানিতে বিকল্প সহায়তা দেওয়ার বিষয়টিও খতিয়ে দেখতে বলা হয়।

৯টি ক্ষেত্রে সক্ষমতা যাচাই

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এমএল-৩ মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ৯টি গুরুত্বপূর্ণ সূচক বিবেচনা করে। এর মধ্যে রয়েছে ভ্যাকসিন নিবন্ধন, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল তদারকি, বাজার মনিটরিং, মান নিয়ন্ত্রণ, পরীক্ষাগার সক্ষমতা, আইনি কাঠামো, লজিস্টিক সহায়তা, জ্ঞান ব্যবস্থাপনা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলেও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো, বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন, গুণগত নিশ্চায়ন ও সমন্বিত তদারকিতে এখনও ঘাটতি রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সাবেক এক কর্মকর্তা বলেন, এমএল-৩ অর্জন শুধু একটি সনদ নয়, এটি একটি দেশের বৈজ্ঞানিক ও নিয়ন্ত্রক সক্ষমতার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। এটি অর্জিত হলে বাংলাদেশের ওষুধ ও ভ্যাকসিন শিল্প বৈশ্বিক আস্থার নতুন স্তরে পৌঁছবে। 

তিনি বলেন, উন্নত দেশগুলোর মতো বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন ও মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সক্ষমতা তৈরি না হলে এই সনদ পাওয়া সম্ভব নয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে চাপ এলে এটা নিয়ে কাজ করে ঔষধ প্রশাসন। কিছুদিন পর তারা আবার থেমে যায়। এমএল-৩ অর্জন করতে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরে তদারকি বাড়াতে হবে। তদারকি রাখতে হবে সারাবছর।

সরকারের নতুন পরিকল্পনা

এসেনসিয়াল ড্রাগসের (ইডিসিএল) সূত্রে জানা যায়, স্থানীয়ভাবে টিকা উৎপাদনে নতুন একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করেই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকা। প্রকল্পটি চালু হলে বছরে ৯০ লাখ থেকে এক কোটি ভায়াল টিকা উৎপাদন সম্ভব হবে।

দেশে ডেঙ্গু, জলাতঙ্ক, হাম ও সাপের কামড়ের প্রতিষেধকের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৫০ লাখ ডোজ। স্থানীয় চাহিদা পূরণের পর অতিরিক্ত টিকা রপ্তানির সুযোগ তৈরি হবে জানিয়ে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. এ সামাদ মৃধা বলেন, সরকার বিদেশ থেকে যে দামে এসব টিকা আমদানি করে, স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা গেলে প্রায় অর্ধেক দামে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। 

তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে জরুরি ভিত্তিতে নতুন টিকা উৎপাদন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। ডেঙ্গু, জলাতঙ্ক, হাম ও সাপের কামড় বর্তমানে জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগ। আগামী এক বছরের মধ্যে এই চার ধরনের টিকার উৎপাদন শুরু করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। আগামী বছরের জুনের মধ্যে সরকারকে টিকা সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে আশা করেন সামাদ মৃধা। 

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এমএল-৩ সনদ অর্জন করতে পারলে আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের টিকা রপ্তানি পাঁচ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে। একই সঙ্গে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে।

টিকাদানবিষয়ক কারিগরি কমিটি ন্যাশনাল ইমিউনাইজেশন টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি গ্রুপের চেয়ারপারসন ও আইসিডিডিআর,বির বিজ্ঞানী ফিরদৌসী কাদরী বলেন, টিকার আমদানি নির্ভরতা কমাতে দেশে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। তিনি ঔষধ প্রশাসনকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ডে উন্নীত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী সমকালকে বলেন, সরকার আন্তর্জাতিক মানের টিকা উৎপাদনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এমএল-৩ সনদ অর্জনের প্রচেষ্টাও চলমান রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধিরা শিগগিরই ঢাকায় আসবেন। তাদের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে। 

তিনি আরও জানান, মুন্সীগঞ্জে একটি ভ্যাকসিন উৎপাদন প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। বর্তমানে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ হলে কাজ আরও দ্রুত এগোবে।

আরও পড়ুন

×