কিনোকুনিয়ার বইয়ের দুনিয়া এখন ঢাকায়
রাজধানীর উত্তরায় বৃহস্পতিবার বিশ্বখ্যাত বুকস্টোর কিনোকুনিয়ার উদ্বোধন করেন অতিথিরা। বিশ্বমানের প্রিমিয়াম বইয়ের জন্য সমাদৃত শতবর্ষী জাপানি এ চেইনশপ
দ্রোহী তারা
প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬ | ০১:২৩
সাহিত্য, ইতিহাস, শিল্পকলা, শিক্ষা, প্রযুক্তি, আত্মজীবনী, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিশুসংগ্রহ– এমন নানা বিভাগে সাজানো ৪০ হাজার বই। আন্তর্জাতিক বেস্টসেলার থেকে শুরু করে বাংলা সাহিত্যও রয়েছে সমান গুরুত্বে।
বিশেষভাবে নজর কাড়ে শিশুদের জন্য নির্ধারিত কর্নার। সেখানে রঙিন চিত্রগ্রন্থ, শিক্ষামূলক বই এবং সৃজনশীল নানা উপকরণ রাখা। সঙ্গে নান্দনিক স্টেশনারি, অরিগামি সেট, বনসাই গাছ তৈরির কিট, যোগব্যায়াম অনুশীলনের সরঞ্জামসহ শিশু-কিশোরদের মানসিক বিকাশে সহায়ক বিভিন্ন উপকরণ।
উত্তরার সেন্টারপয়েন্টে বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে বিশ্বের অন্যতম সুপরিচিত বইয়ের প্রতিষ্ঠান কিনোকুনিয়া বাংলাদেশ। একে দোকান না বলে আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বইয়ের এক সমৃদ্ধ সংগ্রহ বলা যায়। এটি সাধারণ পুস্তক বিপণি নয়। এই স্থানটি এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যা পাঠকদের বৈশ্বিক চিন্তা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হতে অনুপ্রাণিত করবে।
কিনোকুনিয়া বাংলাদেশের উদ্বোধন করেন কিনোকুনিয়ার পরিচালক হিরোয়োশি কাগেয়ামা, আইপিসিও ডেভেলপমেন্টস (বাংলাদেশ) লিমিটেড এবং আইপিসিও হোটেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খন্দকার জায়েদ আহসান, ঔপন্যাসিক ও সিটি ব্যাংক পিএলসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসরুর আরেফিন, স্যার জন উইলসন স্কুলের অধ্যক্ষ সাবরিনা শহীদ প্রমুখ।

হিরোয়োশি কাগেয়ামা বলেন, ‘বাংলাদেশে কিনোকুনিয়ার আগমন এ দেশের ক্রমবর্ধমান পঠন সংস্কৃতি, শিক্ষা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার প্রতি আমাদের আস্থার প্রতিফলন। আমরা এমন একটি জায়গা তৈরি করতে চাই যেখানে মানুষ নতুন নতুন ধারণার সঙ্গে পরিচিত হবে, বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে জানবে এবং বইয়ের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারবে।’
কিনোকুনিয়ায় ঢুকে তা-ই মনে হলো। বইয়ের দোকান হলেও এটি কেবল কেনাবেচার স্থান নয়; যেন নতুন চিন্তার জন্মভূমি, কল্পনার বিস্তার এবং নানা দেশের সাহিত্যের মিলনমেলা।
জাপানে প্রতিষ্ঠিত কিনোকুনিয়া বিশ্বজুড়ে বইপ্রেমীদের কাছে সুপরিচিত নাম। এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া ও উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন দেশে এর শাখা রয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রকাশনার বিশাল সংগ্রহ, পাঠকবান্ধব পরিবেশ এবং জ্ঞানভিত্তিক সংস্কৃতিচর্চার জন্য প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে সমাদৃত। বাংলাদেশে কিনোকুনিয়ার আগমনকে যেন জ্ঞানচর্চার প্রতি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
কিনোকুনিয়া বাংলাদেশের উদ্বোধন উপলক্ষে দ্য প্রিলিউড শীর্ষক একটি সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিক্ষাসহ বিভিন্ন অঙ্গনের আমন্ত্রিত অতিথিরা অংশ নেন। অতিথিরা বইয়ের চমৎকার সংগ্রহ নিয়ে ছিলেন উচ্ছ্বসিত।
দোকান ঘুরে দেখার সময় গানচিল মিউজিকের প্রতিষ্ঠাতা আসিফ ইকবাল সমকালকে বলেন, ‘আমাদের চিন্তার জগৎকে আরও বিস্তৃত করার জন্য প্রয়োজন নানা ধরনের বই। কিনোকুনিয়া সেই উপাদানগুলোকে এক জায়গায় নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে শিশু ও তরুণদের কল্পনাশক্তি এবং ভাবনার পরিসর বাড়াতে এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’

কিনোকুনিয়ায় বিশেষভাবে নজর কাড়ে শিশুদের জন্য নির্ধারিত কর্নার। এখানে দাঁড়িয়ে সাবরিনা শহীদ বলেন, শিশুদের অনলাইনভিত্তিক বিনোদন ও গেমের ব্যবহার কতটা বয়সোপযোগী, সে বিষয়ে সমাজে এখনও সচেতনতা তৈরি হয়নি। তিনি মনে করেন, অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমের সম্মিলিত উদ্যোগে শিশুদের বইমুখী করে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানের বইকে আরও সহজলভ্য করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
সত্যজিৎ রায়ের বইয়ের ইংরেজি অনুবাদ হাতে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণ আরিয়ান রহমান বলেন, ‘আমরা সত্যজিৎ রায়ের গল্প পড়ে বড় হয়েছি। কিন্তু তাঁর বইয়ের ইংরেজি সংস্করণ এখানে একসঙ্গে এত সুন্দরভাবে সাজানো দেখে অভিভূত। কারণ বিদেশি পাঠকদের কাছে বাংলা সাহিত্য পৌঁছানোর ক্ষেত্রে অনুবাদ খুব গুরুত্বপূর্ণ।’
শার্লক হোমসের একটি বিশেষ সংস্করণ দেখছিলেন তরুণ পাঠক নাফিসা। তিনি বলেন, ‘অনলাইনে অনেক বই দেখা যায়। কিন্তু বই হাতে নিয়ে পাতা উল্টানোর অনুভূতি ভিন্ন। এখানে এসে মনে হচ্ছে, একটি বিশ্বমানের বইয়ের জগতে প্রবেশ করেছি। শার্লক হোমসের এমন কিছু সংস্করণ দেখলাম, যা আগে দেশে খুব একটা পাওয়া যেত না।’
কিনোকুনিয়ার এই নতুন শাখাকে শুধু একটি বইয়ের দোকান হিসেবে ভাবতে নারাজ কর্তৃপক্ষ। তাদের লক্ষ্য এমন একটি সাংস্কৃতিক পরিসর গড়ে তোলা যেখানে পাঠক, শিক্ষার্থী, গবেষক, শিল্পী ও কৌতূহলী মানুষ একত্রিত হতে পারবেন। বইকে কেন্দ্র করে আলোচনা, পাঠচক্র, সাংস্কৃতিক আয়োজন এবং জ্ঞান বিনিময়ের সুযোগও ভবিষ্যতে তৈরি করার পরিকল্পনা আছে তাদের। বাংলাদেশে এই যাত্রা শুরুর মাধ্যমে কিনোকুনিয়া কেবল একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়; পাঠক, চিন্তাবিদ, শিক্ষার্থী এবং কৌতূহলী মননের মিলনস্থল হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে চায়।
দেশে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ইংরেজি ভাষার বই, গ্রাফিক নভেল, মাঙ্গা এবং গবেষণাধর্মী প্রকাশনার প্রতি আগ্রহও বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিনোকুনিয়ার আগমন সেই চাহিদাকে পূরণ করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এই উদ্যোগ একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক প্রকাশনাগুলোকে হাতের নাগালে নিয়ে আসবে, অন্যদিকে সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার নতুন সুযোগ তৈরি করবে।
