মায়ের আহাজারি
‘রাফি ছিল অন্ধের যষ্টি, তাকে ঘিরেই আমার দুনিয়া’
ইটের আঘাতে আহত সেই তরুণের মৃত্যু
রাফিকে ইট দিয়ে আঘাত করে মোটরসাইকেল থেকে ফেলে দেয় দুর্বৃত্তরা -ভিডিও থেকে
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬ | ০৮:৩২ | আপডেট: ২৩ জুন ২০২৬ | ০৮:৫৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘রাফি ছিল অন্ধের যষ্টি, তাকে ঘিরেই আমার দুনিয়া। ১৩ দিন তার মুখে আম্মু ডাক শুনিনি। খুব চেয়েছিলাম, আল্লাহ একমাত্র সন্তানকে আমার কাছে ফিরিয়ে দেবে, সে সুস্থ হয়ে উঠবে। বাঁচাতে পারলাম না। চোখের সামনেই ছেলেকে চলে যেতে দেখলাম।’ কাঁদতে কাঁদতে এভাবেই বলছিলেন সাজিদ চৌধুরী রাফির মা তানিয়া শিকদার।
রাফি সেই হতভাগা, যে কিনা গত ৯ জুন মোটরসাইকেলে চেপে বাসায় ফেরার পথে রাজধানীর কাফরুলের পূর্ব শেওড়াপাড়ায় দুর্বৃত্তের ছোড়া ইটের আঘাতে আহত হয়েছিলেন। ১৩ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে গতকাল সোমবার সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনি মারা যান।
স্বজনরা জানান, রাফি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি ছিলেন। ১০ জুন থেকে রাফির মা তানিয়া শিকদার ছেলের সঙ্গে হাসপাতালে। রাফি আইসিইউতে আর তিনি থাকতেন হাসপাতাল ভবনের তৃতীয় তলায় সিঁড়ির পাশের ফাঁকা স্থানে। চিকিৎসকের ডাকে প্রায়ই ছুটে যেতেন ছেলের শয্যাপাশে। কখনও কিছু সময়ের জন্য রাতে থেকেছেন ছেলের পাশে। ডুকরে কেঁদেছেন। রাফির শারীরিক প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানোর জন্য রক্ত নিয়ে ছুটেছেন এক ভবন থেকে আরেক ভবনে। কখনও ছুটেছেন ফার্মেসিতে। তবু ক্লান্ত হননি তিনি। আশা ছিল, ছেলেকে সুস্থ করে একসঙ্গে বাসায় ফিরবেন। তা আর হলো না।

তানিয়া শিকদার বলেন, ‘গত রোববার সন্ধ্যায় ছেলের অবস্থা হঠাৎ খারাপ হয়ে যায়। সারারাত আমি তার পাশে ছিলাম। এক মুহূর্তও ঘুমোইনি। ওর মুখের দিকে চেয়ে থেকেছি। বুকটা ফেটে যাচ্ছিল আমার। সোমবার সকাল ৭টায় আমার সামনেই সে চলে গেল!’
রাফির মা তানিয়া সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রবাসী। গত ১৮ মে তিনি দেশে আসেন। রাফিকে দুবাইয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাঁর।
তানিয়া বলেন, ‘ঝালকাঠিতে আমার বাবার বাড়ির কবরস্থানে ছেলের লাশ দাফন করব। কারণ, বছরে একবার হলেও গ্রামে গিয়ে ছেলের কবরটা দেখতে পাব। আমি আত্মীয়দের বলে রেখেছি, আমি মারা গেলে আমার কবর যেন ছেলের পাশেই দেওয়া হয়।’
কাফরুল থানার ওসি সাজ্জাদ হোসেন জানান, গত ৯ জুন রাত সাড়ে ১২টার দিকে মোটরসাইকেলে নিজ বাসায় ফিরছিলেন রাফি। কাফরুল থানার পূর্ব শেওড়াপাড়ার আশরাফ আলী গলিতে চলন্ত মোটরসাইকেলে তাঁর ওপর ইট নিক্ষেপ করা হয়। ওই রাত থেকেই তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
এ ঘটনায় রাফির চাচা নূর হোসেন বাদী হয়ে হত্যাচেষ্টা মামলা করেন। মামলায় ইট নিক্ষেপকারী পারভেজসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলাটি এখন হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হবে। পূর্বশত্রুতার জেরে রাফির ওপর হামলা চালানো হয়। রাফিকে ইট নিক্ষেপের একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তাতে দেখা যায়, মোটরসাইকেলে যাওয়ার সময় এক তরুণ (পারভেজ) রাফিকে লক্ষ্য করে ইট ছুড়ে মারেন। ইটের আঘাতে তিনি মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তায় পড়ে অচেতন হয়ে যান। এ সময় মোটরসাইকেলটি তাঁর শরীরের ওপর পড়ে ছিল। ইট নিক্ষেপকারী তরুণই পরে আহত রাফিকে মোটরসাইকেলের নিচ থেকে বের করার চেষ্টা করেন। পরে আরও একজন সেখানে গিয়ে মোটরসাইকেলটি সরিয়ে নেন। এক পর্যায়ে আহত রাফিকে একটি অটোরিকশায় তুলে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
রাফির ফুপু সানজিদা আক্তার ইতি বলেন, ময়নাতদন্ত শেষে দুপুরে কাফরুলের ইব্রাহিমপুরের বাসায় লাশ নেওয়া হয়। পরে বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে তাঁর নানাবাড়ি ঝালকাঠির উদ্দেশে রওনা দেন স্বজনরা।
