ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

৩০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে ভোটার তালিকা: ডিসমিসল্যাব

৩০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে ভোটার তালিকা: ডিসমিসল্যাব
×

ফাইল ছবি

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬ | ২১:৫২ | আপডেট: ২৩ জুন ২০২৬ | ২২:১৫

জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রকাশ করা ভোটার তালিকা এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে। মাত্র ৩০ থেকে ২৫০ টাকার বিনিময়ে ফেসবুক ও টেলিগ্রামের মাধ্যমে পাওয়া যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন এলাকার, এমনকি সারাদেশের ভোটার তালিকা। এসব তালিকায় ভোটারের নাম, পিতা-মাতার নাম, জন্মতারিখ, পেশা, স্থায়ী ঠিকানা ও ভোটার নম্বরসহ নানা ব্যক্তিগত তথ্য রয়েছে। ফলে নাগরিকদের তথ্য সুরক্ষা, পরিচয় চুরি, আর্থিক জালিয়াতি ও সাইবার অপরাধের ঝুঁকি নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনুসন্ধানী প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাবের আজ মঙ্গলবারের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে ২০২৫ সালের ১৮ নভেম্বর প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকাই এখন সামাজিক মাধ্যমে বেচাকেনা হচ্ছে। তবে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ভোটার তালিকা বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি বা বিতরণের কোনো অনুমতি তাদের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপে একাধিক অ্যাকাউন্ট থেকে ভোটার তালিকা বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে। ‘মোহাম্মদ মাজহারুল হাফিজ’ নামে একটি অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করে বলা হয়, “আসনভিত্তিক ভোটার তালিকা ৩০ টাকা, সারাদেশের ভোটার তালিকা মাত্র ৪০ টাকা।’ একই ধরনের পোস্ট করেছেন ‘মোহাম্মদ আরিফ হোসান’ ও ‘নাজিম হোসাইন’ নামে আরও কয়েকজন ব্যবহারকারী। কোথাও আসনভিত্তিক তালিকার দাম ৪০ টাকা, কোথাও আবার পুরো দেশের তালিকা ৬০ টাকায় বিক্রির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রাসঙ্গিক কী-ওয়ার্ড ব্যবহার করে ডিসমিসল্যাব ৫০০টির বেশি এমন পোস্ট খুঁজে পেয়েছে। এসব পোস্টের বেশিরভাগই বিভিন্ন গ্রুপে অন্তত ১৫টি ভিন্ন অ্যাকাউন্ট থেকে করা হয়েছে। দামের সামান্য তারতম্য থাকলেও পোস্টগুলোর ভাষা ও উপস্থাপনায় মিল রয়েছে।

শুধু গ্রুপ পোস্ট নয়, অর্থের বিনিময়ে ফেসবুকের ‘অ্যাড লাইব্রেরি’তে বিজ্ঞাপন চালিয়েও ভোটার তালিকা বিক্রি করা হচ্ছে। অনুসন্ধানে অন্তত পাঁচটি সক্রিয় বিজ্ঞাপন পাওয়া গেছে, যেখানে এলাকাভিত্তিক তালিকার জন্য ৯৯ টাকা এবং সারাদেশের তালিকার জন্য ২৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, তালিকাগুলো পিডিএফ আকারে গুগল ড্রাইভের মাধ্যমে সরবরাহ করা হবে।

বিষয়টি যাচাই করতে ডিসমিসল্যাব একটি পেজে যোগাযোগ করে বিকাশের মাধ্যমে ২৫০ টাকা পাঠালে একটি গুগল ড্রাইভ লিংক দেওয়া হয়। লিংকে দেশের আটটি বিভাগের নামে পৃথক ফোল্ডার এবং তার অধীনে সংশ্লিষ্ট সংসদীয় আসন ও এলাকার ভোটার তালিকা আলাদাভাবে সংরক্ষিত দেখা যায়। ডিসমিসল্যাব কয়েকটি এলাকার তালিকা পর্যালোচনা করে এবং পরিচিত ভোটারদের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে হুবহু মিল পায়, যা তালিকাগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করে। কেবল ফেসবুকেই নয়, টেলিগ্রামের বিভিন্ন গ্রুপেও এসব তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি ভবিষ্যতে ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রকাশেরও ঘোষণা দিয়েছে একটি গ্রুপ।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের জনসংযোগ বিভাগের পরিচালক মো. রুহুল আমিন মল্লিক বলেন, ‘আমরা ভোটার তালিকা জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রত্যেক প্রার্থীকে পিডিএফ আকারে প্রদান করেছিলাম, যেখানে ভোটারদের ছবি নেই। কোনো প্রার্থী এটা কোনো গ্রুপকে বা কাউকে দিয়ে বা বিক্রি করে থাকতে পারে। আমাদের এখান থেকে এরকম বিক্রি করার কোনো অনুমতি নেই।’

তথ্য ফাঁসের সম্ভাব্য উৎস সম্পর্কে তিনি অনুমান করেন, ভোটার তালিকা ছাপানোর জন্য প্রার্থীরা কোনো কম্পিউটারের দোকানে যাওয়ার পর দোকানদাররা হয়তো তা কপি করে রেখে দিয়েছে।

ডিসমিসল্যাব যে বিক্রেতার কাছ থেকে তালিকা সংগ্রহ করেছে, তিনি দাবি করেন যে তিনিও সামাজিক মাধ্যম থেকেই এটি পেয়েছেন এবং প্রমাণ হিসেবে কিছু স্ক্রিনশট ও স্ক্রিনরেকর্ড সরবরাহ করেন। তবে মূল উৎস হিসেবে ব্যবহৃত ফোন নম্বর ও হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্টটি বর্তমানে বন্ধ পাওয়া গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের তথ্য ফাঁস নাগরিকদের জন্য বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. বি এম মইনুল হোসেন বলেন, ‘ফাঁস হওয়া তথ্যের সাহায্যে অপরাধীরা ভুয়া আইডি কার্ড তৈরি করে বিভিন্ন পরিষেবা নেওয়ার চেষ্টা চালাতে পারে। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জালিয়াতি করা থেকে শুরু করে কারো অনলাইন অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণও নিয়ে নিতে পারে। এমনকি অন্যের নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খুলে বিভিন্ন সাইবার অপরাধ করাও সম্ভব।’

তিনি বলেন, এতে নাগরিকরা গুরুতর আর্থিক, মানসিক ও আইনি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় তথ্য সুরক্ষাকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠানগুলোর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে তথ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার তাগিদ দেন। একই সঙ্গে নির্বাচনকালীন সময়ে প্রার্থীদের হাতে দেওয়া তথ্যের পরিমাণ সীমিত রাখার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘যতটুকু তথ্য না হলেই নয়, ততটুকুই দেওয়া উচিত। আর কেউ যদি এসব তথ্য বিক্রি বা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবার বিস্তারের এই সময়ে নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা শুধু গোপনীয়তার প্রশ্ন নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তা ও ডিজিটাল আস্থার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ভোটার তালিকা অবাধে বেচাকেনার ঘটনা সেই সুরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই নতুন করে সামনে এনেছে।

আরও পড়ুন

×