নীতি উপেক্ষা করে ফেসবুকে ১৩ সংসদ সদস্যের আয়
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬ | ০৮:০০
| প্রিন্ট সংস্করণ
সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে কনটেন্ট থেকে আয় করার সুযোগ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের জন্য নিষিদ্ধ। তবে এমন স্পষ্ট নীতি থাকার পরও বাংলাদেশের অন্তত ১৩ সংসদ সদস্যের (এমপি) ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্ট মেটার ‘কনটেন্ট মনিটাইজেশন’ কর্মসূচিতে সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমান মন্ত্রিসভার তিন সদস্যও আছেন।
তথ্য যাচাইকারী (ফ্যাক্টচেক) প্রতিষ্ঠান ‘ডিসমিসল্যাব’-এর এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এসব অ্যাকাউন্টে নিয়মিত বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনও প্রদর্শন করা হচ্ছে। এতে মেটার নিজস্ব নীতি প্রয়োগের কার্যকারিতা, যাচাই প্রক্রিয়া এবং সম্ভাব্য ‘স্বার্থের সংঘাত’ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী জনপ্রতিনিধিদের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে এ তথ্য পেয়েছে ডিসমিসল্যাব। অনুসন্ধানে মেটার প্রকাশ্য ‘পার্টনার-পাবলিশার’ তালিকা এবং নেদারল্যান্ডসভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘হোয়াট টু ফিক্স’ সংরক্ষিত মনিটাইজেশন আর্কাইভের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার ডিসমিসল্যাবের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেটার ‘কনটেন্ট মনিটাইজেশন’ কর্মসূচিতে সক্রিয় থাকা ভেরিফায়েড ১৩টি ফেসবুক পেজ ও প্রোফাইলের মধ্যে সাতজন বিএনপির, পাঁচজন জামায়াতে ইসলামীর এবং একজন স্বতন্ত্র এমপি। তালিকায় থাকা মন্ত্রিসভার তিন সদস্য হলেন– বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির; বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এবং ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন।
মেটার ‘পার্টনার মনিটাইজেশন পলিসি’ বা অংশীদার মনিটাইজেশন নীতি অনুযায়ী, বর্তমান নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক প্রার্থী, সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক দল কিংবা সরকারি সংস্থা মনিটাইজেশনের জন্য যোগ্য নয়। তবে ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধান বলছে, এই নীতি সব ক্ষেত্রে কঠোরভাবে কার্যকর করা হয়নি।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, অন্তত দুটি ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পরও মনিটাইজেশন কর্মসূচিতে যুক্ত হয়েছে। লালমনিরহাট-১ আসনের সংসদ সদস্য হাসান রাজীব প্রধানের অ্যাকাউন্ট ৪ ফেব্রুয়ারি এবং চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য এস কে ফরিদ আহমেদের অ্যাকাউন্ট ১১ ফেব্রুয়ারি (ভোটের ঠিক আগের দিন) মেটার এই কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়।
তালিকায় থাকা অ্যাকাউন্টগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অনুসারী পটুয়াখালী-২ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য মো. শফিকুল ইসলামের। তাঁর ফেসবুক পেজে অনুসারীর সংখ্যা ১৭ লাখের বেশি। পেজটির পরিচিতিতে তাঁকে ‘সংসদ সদস্য’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং এটি জামায়াতে ইসলামীর নিয়ন্ত্রণাধীন বলেও ‘পেজ ট্রান্সপারেন্সি’ তথ্য থেকে জানা যায়। আর্কাইভের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সাল থেকেই তাঁর পেজটি মনিটাইজেশন কর্মসূচির আওতায় রয়েছে।
এ বিষয়ে শফিকুল ইসলাম ডিসমিসল্যাবকে বলেন, তাঁর আইটি টিম পেজটি পরিচালনা করে। তাঁর জানামতে, ফেসবুক থেকে তিনি কোনো আয় করেন না। তবে তিনি মনে করেন, রাজনীতিবিদদেরও মনিটাইজেশনের সুযোগ থাকা উচিত।
প্রতিবেদনে বিশেষভাবে কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহর বিষয়টি উঠে এসেছে। ‘হোয়াট টু ফিক্স’-এর তথ্য অনুযায়ী, তাঁর ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্টটি ৭ ফেব্রুয়ারি মেটার মনিটাইজেশন কর্মসূচিতে যুক্ত হয় এবং ৫ এপ্রিল তা তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়।
ডিসমিসল্যাব জানায়, ১৩টি ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্টের মধ্যে ১২টির ভিডিওতেই বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন প্রদর্শিত হতে দেখা গেছে। ভিডিও চলাকালে কিংবা ভিডিওর নিচে এসব বিজ্ঞাপন দেখানো হয়। দর্শকের অবস্থান ও অ্যালগরিদমভেদে বিজ্ঞাপন ভিন্ন হতে পারলেও, এসব উদাহরণ প্রমাণ করে, সংশ্লিষ্ট কনটেন্টগুলোতে মেটার বিজ্ঞাপন ব্যবস্থা সক্রিয় ছিল।
অনুসন্ধানে আরও ২২টি আনভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্ট পাওয়া গেছে, যেগুলো বিভিন্ন সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীর নামে পরিচালিত হচ্ছে এবং মেটার মনিটাইজেশন তালিকায় রয়েছে। এর মধ্যে ১০টি অ্যাকাউন্ট নির্বাচনী প্রচারে রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনও চালিয়েছে। কিছু অ্যাকাউন্ট নির্বাচনের পর মনিটাইজেশন কর্মসূচিতে যুক্ত হয়েছে।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতি সম্ভাব্য ‘স্বার্থের সংঘাত’ (কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট) তৈরি করে। কারণ, যারা প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম নিয়ন্ত্রণ বা এ-সংক্রান্ত নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারেন, তারাই যদি সেই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা পান, তবে জবাবদিহি ও সুশাসনের প্রশ্ন ওঠে।
ডিসমিসল্যাব এ বিষয়ে মেটার কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে। তবে প্রতিবেদন প্রকাশ করা
পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
- বিষয় :
- ফেসবুক
