আসলামের প্রার্থিতা বাতিল
চট্টগ্রাম-৪ আসনে কি নতুন ভোট? ইসি তাকিয়ে আদালতের দিকে
নির্বাচন কমিশন ভবন (ফাইল ফটো)
অমরেশ রায়
প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬ | ১০:৫২ | আপডেট: ০১ জুলাই ২০২৬ | ১১:১৭
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৪ আসনে প্রার্থী ছিলেন ৯ জন। তারা হলেন- বিএনপির মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরী, জামায়াতের মো. আনোয়ার সিদ্দিকী, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) মো. মছিউদদৌলা, গণঅধিকার পরিষদের এটিএম পারভেজ, গণসংহতি আন্দোলনের জাহিদুল আলম, নেজামে ইসলামী পার্টির মো. জাকারিয়া খালেদ, ইসলামী আন্দোলনের দিদারুল মাওলা, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির (বিএসপি) শহীদুল ইসলাম চৌধুরী ও ইসলামী ফ্রন্টের সিরাজুদ্দৌলা। ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটে ধানের শীষ প্রতীকে মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরী ১ লাখ ৪২ হাজার ৬৭৪ ভোট পান। বেসরকারিভাবে জয়লাভ করলেও আদালতের আদেশে তার ফলাফল স্থগিত রাখে নির্বাচন কমিশন। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে জামায়াতের প্রার্থী আনোয়ার ছিদ্দিক পান ৮৯ হাজার ২৬৮ ভোট। ভোটে জিতলেও ঋণ খেলাপি হওয়ায় আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বাতিল করেছেন সর্বোচ্চ আদালত। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন চার বিচারকের আপিল বেঞ্চ মঙ্গলবার এই রায় ঘোষণা করে। সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের এই রায়ের ফলে বিএনপি প্রার্থী আসলাম আর চট্টগ্রাম-৪ আসনের নির্বাচিত এমপি হিসেবে শপথ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না। এখন ওই আসনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হবে, নাকি সেখানে নতুন করে নির্বাচন হবে–আদালতের সংক্ষিপ্ত রায়ে তা স্পষ্ট হয়নি। নতুন নির্বাচন কিংবা নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীকে নির্বাচিত ঘোষণা- যে নির্দেশনা দেবে সেভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে ইসি।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানান, পুনঃভোটের নির্দেশনা এলেও এ আসনে উপনির্বাচন হবে না। বরং নতুন তপশিল দিয়ে নতুন করে ভোটের আয়োজন করতে হবে।
নতুন তপশিলের বিষয়ে তিনি বলেন, আদালতের আদেশে নির্বাচনের কথা বললে তাহলে আমরা নতুন করে তফসিল ঘোষণা করব। সেক্ষেত্রে নির্বাচনে যোগ্য যে কেউ অংশ নিতে পারবে। আর আসলাম চৌধুরীর নির্বাচনে প্রার্থিতার ক্ষেত্রে অযোগ্যতার বিষয়টি (ঋণখেলাপিতা) বহাল থাকলে তিনি নির্বাচন করতে পারবেন না। আর অযোগ্যতা কাটিয়ে উঠতে পারলে তিনিও অন্যদের মতো পুনঃভোটে অংশ নিতে পারবেন।
আদালতের আদেশের পূর্ণাঙ্গ কপি পর্যালোচনা করে করণীয় ঠিক করবে ইসি
আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বাতিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আদালতের নির্দেশনার দিকে তাকিয়ে আছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বেসরকারিভাবে বিজয়ী হলেও এই প্রার্থীর বিষয়ে দেওয়া আদালতের আদেশের পূর্ণাঙ্গ কপি পেলে তা পর্যালোচনা করে করণীয় ঠিক করা হবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
নির্বাচনে জিতে ২৯৮ জন সংসদ সদস্য সংসদে যোগ দিলেও দু’জন (চট্টগ্রাম-২ ও চট্টগ্রাম-৪) এখনও শপথ নিতে পারেননি। চট্টগ্রাম-২ আসনে বিএনপির সরোয়ার আলমগীর ও চট্টগ্রাম-৪ আসনে মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা চার মাস ধরে আইনি জটিলতায় আটকে থাকে। সবশেষ মঙ্গলবার চট্টগ্রাম-৪ আসনের বিষয়ে আপিল বিভাগ রায় দেন। বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম-২ আসনের বিষয়ে হাইকোর্টে শুনানির কথা রয়েছে।
ইসি সূত্র বলছে, আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বাতিলের বিষয়ে আপিল বিভাগের রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপির অপেক্ষায় রয়েছে ইসি। রায়ের কপির পেলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে কমিশন সভায় বসে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ মঙ্গলবার বলেছেন, আদালত যেভাবে নির্দেশ দেবেন আমরা সেভাবে ব্যবস্থা নেব। আদালত যদি নতুন করে তপশিল ঘোষণা করে নির্বাচন করার নির্দেশ দেন, তাহলে এ আসনে নতুন করে নির্বাচন হবে। আর যদি নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশের নির্দেশ দেন, তাহলে সে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
যা বলছেন অ্যাটর্নি জেনারেল ও জামায়াত প্রার্থীর আইনজীবী
আদালতের রায়ের পর মঙ্গলবার রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের বলেন, আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়টি না দেখে এর কনসিকোয়েন্স (পরিণতি) কী হবে, তা বলা উচিত হবে না।
এই আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে কিনা, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হতে পারে।
নতুন করে নির্বাচন হলে আসলাম চৌধুরী আবারও অংশ নিতে পারবেন কি না, এমন প্রশ্নে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, অযোগ্যতা কাটিয়ে উঠলে তার নির্বাচনে অংশ নিতে বাধা নেই। পরবর্তী নির্বাচনের ক্ষেত্রে তিনি যদি সে অযোগ্যতা কাটিয়ে উঠে যোগ্য হন, তাহলে তাঁর নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো আইনগত বাধা থাকার কথা নয়।
রায়ের পর জামায়াতের প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকীর আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, আপিল মঞ্জুর করার মানে হলো আসলাম চৌধুরী অযোগ্য হয়ে গেছেন এবং তার প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে। ঋণখেলাপি হিসেবে তার মনোনয়ন বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে।
তিনি জানান, নির্বাচন কমিশন ভুলে গিয়েছিল যে, ঋণের জামিনদারেরও ঋণগ্রহীতার মতো একই দায়দায়িত্ব থাকে, যা আপিল বিভাগ সিদ্ধান্তে নিয়েছে। ভবিষ্যতে আইন মেনে চলার ক্ষেত্রে এটি সতর্ক ভূমিকা পালন করবে।
পরবর্তী পদক্ষেপ প্রসঙ্গে শিশির মনির বলেন, প্রচলিত নিয়মে সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া ব্যক্তি অযোগ্য হলে পরের জন নির্বাচিত ঘোষিত হয়। তবে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হলে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা পাওয়া যাবে এবং নির্বাচন কমিশন তা নিষ্পত্তি করবে।
যেভাবে বাদ পড়লেন আসলাম চৌধুরী
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপির পক্ষে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে আসলাম চৌধুরী এবং দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে আনোয়ার সিদ্দিকী নির্বাচন করেছিলেন। গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর মনোনয়ন জমার শেষ দিন ছিল।
আসলাম চৌধুরীর বিরুদ্ধে ঋণখেলাপির অভিযোগ এনে প্রথমে গত ৩ জানুয়রি আনোয়ার সিদ্দিকীর পক্ষে রিটার্নিং অফিসারের কাছে বাছাইয়ে আপত্তি জানানো হলেও তার মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়। এরপর নির্বাচন কমিশনে আপিল করা হলে সেবারও কমিশন মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করে এই যুক্তিতে যে, তিনি মূল ঋণগ্রহীতা নন, বরং ঋণের জামিনদার। পরে ১৮ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশনে আপিল শুনানির জন্য আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করলেও নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ প্রার্থীর উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, মনোনয়নপত্র বৈধ করলাম। ব্যাংকের টাকাটা (ঋণটা) দিয়ে দিয়েন। টাকাটা না দিলে কিন্তু জনরোষ তৈরি হবে। মানুষ হিসেবে এটা আপনাকে বললাম।
এরপর গত ২৭ জানুয়ারি ইসির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আলাদাভাবে রিট করা হলে ২৭ জানুয়ারি উভয় রিট হাইকোর্ট খারিজ করে , ফলে আসলাম চৌধুরী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পান। হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে জামায়াতের প্রার্থী আনোয়ার সিদ্দিকী লিভ টু আপিল করেন। গত ৩ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগ ওই লিভ টু আপিল মঞ্জুর করে আদেশে জানায়, আসলাম চৌধুরী নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে সফল হলে আপিলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তার ক্ষেত্রে ফলাফল প্রকাশ স্থগিত থাকবে। এই আদেশের ফলে তিনি নির্বাচনে অংশ নিলেও তার ফলাফল স্থগিত ছিল।
লিভ টু আপিল মঞ্জুর হওয়ার পর গত ৩১ মার্চ আনোয়ার সিদ্দিকী পৃথক আপিল করেন এবং ২৮ এপ্রিল চেম্বার আদালত তা নিয়মিত বেঞ্চে শুনানির জন্য নির্ধারণ করেন।
আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বহালের বিরুদ্ধে ব্যাংক এশিয়া পিএলসি এবং যমুনা ব্যাংক পিএলসিও পৃথক আবেদন করে। গত ১০ জুন আপিল শুনানিতে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এম কামরুল হক সিদ্দিকী ও প্রবীর নিয়োগীকে অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে নিয়োগ দেয় আপিল বিভাগ।
- বিষয় :
- নির্বাচন কমিশন
- চট্টগ্রাম-৪
- উপনির্বাচন
- ভোট
- ইসি
