ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬

শিল্পকলার অনুষ্ঠানে লালন বিকৃতির অভিযোগ, ফরহাদ মজহারের নেতৃত্বে প্রতিবাদলিপি

শিল্পকলার অনুষ্ঠানে লালন বিকৃতির অভিযোগ, ফরহাদ মজহারের নেতৃত্বে প্রতিবাদলিপি
×

ছবি: সমকাল

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৬ | ২০:৫৪

শিল্পকলা একাডেমির ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত ‘পূর্ণিমা তিথির সাধুমেলা’ এবং লালন দর্শন ও লালন সংগীত বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালায় ফকির লালন শাহের দর্শন ও নদীয়ার সাধনার ধারাকে ‘বিকৃত’ করার অভিযোগ উঠেছে। এই আয়োজনের প্রতিবাদে কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহারের নেতৃত্বে ‘সাধু-গুরু, ভক্ত-অনুরাগী ও নাগরিক সমাজ’ ব্যানারে একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দিন স্টালিনের কাছে প্রতিবাদলিপি দেওয়া হয়েছে।

গত ২৯ জুন শিল্পকলায় শুরু হওয়া এই আয়োজন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে ‘দুর্নীতি ও সাংস্কৃতিক দখলদারত্বের’ নিরপেক্ষ তদন্তসহ আট দফা দাবি তোলা হয়েছে।

স্মারকলিপিতে প্রতিবাদকারীরা অভিযোগ করেন, গত ২৯ জুন শিল্পকলা একাডেমিতে ‘সাধুমেলা’ আয়োজন করা হলেও সেখানে প্রকৃত সাধু-গুরু, নদীয়ার ঘরের গুরু, ভক্ত কিংবা আখড়াবাসীদের কোনো উপস্থিতি ছিল না। সাধুসমাজকে অনুপস্থিত রেখে এই ধরনের মেলা করা লালন ফকিরকে তার মূল ঘর থেকে বিচ্ছিন্ন করার এবং জীবন্ত গুরু-শিষ্য পরম্পরাকে আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনিক অনুষ্ঠানে রূপান্তরের শামিল। একই সঙ্গে এই আয়োজনের প্রচারপত্রে লালন ধারার পরিপন্থি ‘গেরুয়া’ রঙের প্রতীক ব্যবহার করায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে।

তারা বলেছেন, লালন ধারার সাধুরা গেরুয়া কাপড় পরেন না এবং দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে লালন দর্শনের ওপর জোরপূর্বক এই রঙ চাপিয়ে দেওয়া এক ধরনের বিপজ্জনক সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিকৃতি, যা সমাজে উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তিকে উস্কানি দিতে পারে।

সাত দিনব্যাপী চলমান লালন সংগীত ও দর্শন বিষয়ক কর্মশালায় প্রশিক্ষক নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, যাদের প্রশিক্ষক করা হয়েছে তাদের লালনের ঘর, সুর, গায়কী ও দেহতত্ত্ব সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান নেই। এমনকি তাদের একাংশ কুষ্টিয়ায় লালনের মূল সুর বিকৃত করার কারণে আগেই ভক্ত-অনুরাগীদের তীব্র আপত্তির মুখে পড়েছেন এবং লালন ধাম সংলগ্ন পরিসরে অবাঞ্ছিত ঘোষিত হয়েছেন। এ ধরনের ব্যক্তিদের দিয়ে লালন শেখানো মানে বিকৃতিকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া।

স্মারকলিপিতে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলের অনিয়ম ও দুর্নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখারও অভিযোগ আনা হয়। এতে বলা হয়, সাবেক মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর আমলে শিল্পকলা একাডেমি ঘিরে যে অনিয়ম, দলীয়করণ ও সাংস্কৃতিক দখলদারির অভিযোগ ছিল, বর্তমান আয়োজনেও সেই একই সুবিধাভোগী ও ক্ষমতাঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের পুনর্বাসন করা হচ্ছে। জনগণের টাকার অপচয় করে সাধুসমাজ ও প্রকৃত লালনসাধকদের বাইরে রেখে এই ধরনের অনুষ্ঠান কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সাংস্কৃতিক বিকৃতি রোধ এবং লালন শাহের ভাবমর্যাদা রক্ষায় স্মারকলিপিতে ৮টি সুনির্দিষ্ট দাবি উত্থাপন করা হয়েছে।

স্মারকলিপিতে তোলা দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, লালন ফকির ও সাধুমেলার নামে সুবিধাভোগীদের অপতৎপরতা অবিলম্বে বন্ধ করা; যেকোনো সাধুমেলায় নদীয়ার পাঁচ ঘরের অনুসারী ও প্রকৃত সাধকদের সমাজের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা; প্রশিক্ষণ কর্মশালার প্রশিক্ষক নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড প্রকাশ করে বিতর্কিত ব্যক্তিদের বাদ দেওয়া; এবং লালন বিষয়ক জাতীয় পর্যায়ের প্রশিক্ষণ ও গবেষণার মূল দায়িত্ব ঢাকার আমলাতান্ত্রিকতার হাত থেকে মুক্ত করে কুষ্টিয়ার ‘লালন একাডেমি’র হাতে ন্যস্ত করা।

এছাড়াও, ঢাকার সুবিধাভোগীদের পেছনে জনগণের টাকা অপচয় না করে প্রকৃত সাধু-গুরু ও আখড়াভিত্তিক সাধনক্ষেত্রের জন্য সরাসরি রাষ্ট্রীয় বরাদ্দ নিশ্চিত করা; প্রচারপত্রে লালন ধারার পরিপন্থী ও বিভ্রান্তিকর ‘গেরুয়া’ প্রতীকের ব্যবহার বন্ধে সাধুসমাজ ও গবেষকদের পরামর্শ বাধ্যতামূলক করা; সাবেক মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর আমলের দুর্নীতির নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করা; এবং লালনকে বাণিজ্যিক ‘বাউল ব্র্যান্ড’ বানানোর সংস্কৃতি থেকে সরে এসে লালন ফকির ও মুর্শিদি সাধনার মর্যাদা রক্ষায় শিল্পকলা একাডেমিকে স্পষ্ট নীতিগত অবস্থান নেওয়ার দাবি জানানো হয়।

স্মারকলিপি প্রদানের সময় কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার, কবি মোহাম্মদ রোমেল, জসিম উদ্দীন, আহসান প্রলয়, মিন্টু ঠাকুরসহ সাধু ও নাগরিক সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।

এ বিষয়ে ফরহাদ মজহার বলেন, আমরা মহাপরিচালককে স্মারকলিপি দিয়েছি। উনি আমাদের দাবিগুলো পড়েছেন এবং এগুলোর সঙ্গে একমত হয়েছেন। যারা আমাদের সঙ্গে ছিলেন, তাদের সামনেই মহাপরিচালক দাবিদাওয়ার প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন। শিল্পকলার মত একটা জাতীয় প্রতিষ্ঠানকে কিছু লোক যেন জবরদস্তি করে দখল করে রাখতে চাইছে। কোনো কর্মশালা করতে চাইলে তো আসলে কমিটির দায়িত্ব পাওয়া দরকার। যেখানে লালনের গান ও দর্শন নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা, সেখানে এমন কিছু লোক দায়িত্ব নিয়ে বসে আছে, যাদের লালনের গান সম্পর্কে কোনো ধারণাই নাই। অথচ গানের সাধনা তো একটা অত্যন্ত গভীর বিষয়, সাধুদের নিজস্ব একটা ধারা আছে।

তিনি বলেন, বাউলদের নামে শিল্পকলাকে এভাবে দখল করে জবরদস্তিমূলক ফোরাম তৈরি করার পুরো ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কবি হিসেবে মহাপরিচালকের সঙ্গে আমার সবসময় একটা বন্ধুত্ব আছে। তাকে আমি বলেছি, যেন দ্রুত এর একটি সমাধান করা হয়। শিল্পকলা একাডেমির ভেতরের পরিস্থিতি দেখে তার মনে হয়েছে, বর্তমান মহাপরিচালকও ‘এক ধরনের অসহায়ত্বের’ মধ্যে আছেন।

এসব দাবি বিষয়ে শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দিন স্টালিন বলেন, ফরহাদ মজহার দেশের একজন বড় চিন্তাবিদ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। উনাদের দেওয়া দাবিগুলো আমরা অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করব। যে পর্যবেক্ষণগুলো আছে, সেগুলো মান্য করে নীতি নির্ধারণের সর্বোচ্চ চেষ্টা আমরা করব।

আরও পড়ুন

×