কারফিউ ভেঙে রাজপথে জনতা
ছবি: ফাইল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬ | ০৯:০৫
তীব্র আন্দোলন ঠেকাতে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই মধ্যরাতে জারি করা হয় কারফিউ। তবে ছাত্র-জনতা ২০ জুলাই সকাল থেকে কারফিউ ভেঙে নামে আসে রাজপথে।আগের দিন ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর’ গুলিতে অন্তত ৪০ জন শহীদ হওয়ার প্রতিবাদে তারা বিক্ষোভ করেন এবং সংঘর্ষে জড়ান।
সেদিন সকাল থেকে রাজপথে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি দেখা যায়। মোড়গুলোতে বালুর বস্তা দিয়ে বাঙ্কার ও ব্যারিকেড তৈরি করে নিরাপত্তা জোরদার করে সেনাবাহিনী। তবে কারফিউ ভেঙে আন্দোলনকারীরা রাজপথে নেমে আসেন।
সেনাবাহিনী মোহাম্মদপুর ছাড়া আর কোথাও আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালায়নি। উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, মিরপুর, বাড্ডায় সংঘর্ষে জড়ায় পুলিশ এবং তাদের সহযোগী হিসেবে অস্ত্র হাতে রাজপথে থাকা আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা। ধানমন্ডি ও মালিবাগে আন্দোলনকারীদের ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানো হয়।
২০ জুলাই বিকেলে যাত্রাবাড়ীর লাগোয়া সিদ্ধিরগঞ্জের পাইনাদিতে র্যাবের হেলিকপ্টার চক্কর দিচ্ছিল। ছয়তলায় বাসার বারান্দায় হেলিকপ্টার দেখতে গিয়েছিলেন সুমাইয়া আক্তার (২০) নামে এক গৃহবধূ। গুলিবিদ্ধ হয়ে সেখানেই মৃত্যু হয় তাঁর।
এর আগে ১৭ জুলাই রাত থেকেই যাত্রাবাড়ীতে মহাসড়ক দখল নেন আন্দোলনকারীরা। এতে ঢাকার সঙ্গে পুরো চট্টগ্রাম বিভাগের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তিন দিনের চেষ্টায়ও পুলিশ এই মহাসড়ক থেকে আন্দোলনকারীদের সরাতে পারেনি। সেনাবাহিনী গিয়ে চেষ্টা করেও সফল হয়নি। এতে ব্যবহার করা জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীর বাহিনীর সরঞ্জাম। এই ছবি ছড়িয়ে পড়লে আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপে বাড়ে।
২০ জুলাই সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘর্ষ হয় হানিফ ফ্লাইওভারের টোল প্লাজা ও শনির আখড়া এলাকায়। আন্দোলনে নামা মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা সেদিন পুলিশের গুলি ও হেলিকপ্টার থেকে ছোড়া সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেটেও অনড় থাকেন। উত্তরার বিভিন্ন সেক্টর, রামপুরা-বাড্ডা এবং মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকায় ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। মিরপুর-১০ ও কাজীপাড়া মেট্রোরেল স্টেশনে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়। তছনছ করে দেওয়া হয় সেতু ভবন। বিআরটিএ ভবনেও আক্রমণ করা হয়।
কেরানীগঞ্জ, বছিলা থেকে আন্দোলনকারীরা গণভবনের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তাদের আটকাতে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি ও আনসার।
রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন জেলায় ২০ জুলাই আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে। সেদিন আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষে একজন পুলিশ সদস্য নিহত হন। এদিকে কয়েক হাজার আন্দোলনকারী আহত হন। রামপুরার বেটার লাইফ হাসপাতালে ওই দিন অন্তত এক হাজার ৮০০ জন সেবা নিতে যান। তারা গুলি বা রাবার বুলেট বিদ্ধ ছিলেন।
ময়মনসিংহের গৌরীপুরে, নরসিংদী, সিলেট ও গাজীপুরে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। নরসিংদীতে মহাসড়কে পুলিশ ফাঁড়ি ও মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। গাজীপুরে শহীদ হন অন্তত চার শ্রমিক।
১৮ জুলাই রাত থেকে শুরু হওয়া ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ২০ জুলাইও অব্যাহত থাকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ২১ ও ২২ জুলাই দেশজুড়ে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সরকার। পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠনগুলোও গার্মেন্ট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। এদিকে প্রবাসীরা রেমিট্যান্স শাটডাউনের ঘোষণা দিয়ে দেশে টাকা পাঠানো বন্ধ করেন।
এই প্রেক্ষাপটে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিচয়ে খিলগাঁও থেকে তুলে নেওয়া হয়। গ্রেপ্তার করা হয় বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, গণঅধিকার পরিষদ, এবি পার্টি, বিজেপির অনেক জ্যেষ্ঠ নেতাকে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক আন্দোলনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বিএনপি-জামায়াত এবং তাদের সমর্থক সন্ত্রাসীরা জ্বালাও-পোড়াওসহ সহিংসতা চালাচ্ছে।’
- বিষয় :
- কারফিউ