ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

‘শ্রাবণের মেঘ’ বনাম মনের কালিমা

‘শ্রাবণের মেঘ’ বনাম মনের কালিমা
×

সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের স্কুলশিক্ষিকা বিউটি রানী পাল। ছবি: সংগৃহীত/ ইলাস্ট্রেশন: সমকাল

সাদিকুর রহমান

প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬ | ১৮:৩৫ | আপডেট: ২৭ জুলাই ২০২৬ | ১৯:২৮

বিউটি রানী পালকে নিয়ে বিতর্ক শুরু হওয়ার পর গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ সোহেল মোল্লা। তিনি জানিয়েছেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। তারা খতিয়ে দেখবেন, কনটেন্টটিতে সামাজিক কোনো ‘ভায়োলেন্স’ আছে কি না।

প্রশ্ন হলো, কয়েক সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে আসলেই কি কোনো ‘ভায়োলেন্স’ আছে? সোমবার সামাজিক মাধ্যমে পাওয়া ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, ‘শ্রাবণের মেঘ’ শিরোনামের একটি গানের সঙ্গে ওই শিক্ষিকা হেঁটে বেড়াচ্ছেন। ভিডিওটি একটি নির্মল মুহূর্তের প্রকাশ। তাহলে বিতর্ক উঠল কীভাবে এবং সমালোচনাকারীরা এতে কী দেখতে পেয়েছেন?

যেভাবে বিতর্কের শুরু
ফেঞ্চুগঞ্জ থানায় করা সাধারণ ডায়েরিতে (জিডি) বিউটি রানী নিজেই বিতর্কের উৎস সম্পর্কে জানিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, ‘আসিফ ইকবাল ইরন নামে এক প্রবাসী তরুণ ভিডিওটি ডাউনলোড করে নিজের পত্রিকা ফেঞ্চুগঞ্জ প্রতিদিনে নিউজ করেছেন। ওনার ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজেও আজেবাজে কথা লিখেছেন।’ ইরনের বিরুদ্ধে বিউটি রানী সাইবার বুলিং ও সামাজিকভাবে হেনস্তার অভিযোগ তুলেছেন।

ফেসবুকে আসিফ ইকবাল ইরন নামে একটি ভেরিফায়েড পেজ পাওয়া গেছে। কর্মক্ষেত্রের জায়গায় তিনি নিজেকে ফেঞ্চুগঞ্জ প্রতিদিনের প্রধান সম্পাদক (এডিটর-ইন-চিফ) হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বিউটি রানীর অভিযোগ সম্পর্কে জানতে সোমবার বিকেল সোয়া চারটার দিকে মেসেঞ্জারে ইরনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল ধরেননি। প্রায় ৬১ হাজার ফলোয়ারের ‘ফেঞ্চুগঞ্জ প্রতিদিন’ নামের এমন একটি ফেসবুক পেজে থাকা যোগাযোগের মোবাইল নম্বরে কল দিলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়।

এই পেজে পিন করে রাখা একটি ভিডিও কনটেন্ট বিউটি রানীকে নিয়ে। যেটি আপলোড করা হয়েছে গত শুক্রবার বেলা ১টা ১৭ মিনিটে। থাম্বনেইলে লেখা, ‘ফেঞ্চুগঞ্জে স্কুল প্রাঙ্গনে প্রধান শিক্ষিকার টিকটক নাচ! স্কুল শিক্ষিকার যে ভাইরাল ভিডিও এ তোলপাড় ফেঞ্চুগঞ্জ’ (বানান অপরিবর্তিত)। 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সাহায্যে দেওয়া ভয়েসওভারে (নেপথ্য কণ্ঠ) বলা হয়েছে, ‘বিউটি পাল ভিডিওটি আপলোড করেন বৃহস্পতিবার দুপুরে। এতে দেখা যায়, বিদ্যালয় প্রাঙ্গণেই শাড়ি পরে খোলা চুলে বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি করছেন এবং ব্যাকগ্রাউন্ডে আজ কেন মন উদাসী হয়ে দূর অজানায় চায় হারাতে গানটি বাজছে। প্রধান শিক্ষিকার এমন ভিডিও দেখে স্থানীয় সচেতন মহল ও শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।’

সমালোচকরা কী বলেছেন?
ফেঞ্চুগঞ্জ প্রতিদিনের পেজে সবশেষ পোস্ট দেখা গেছে ২১ ঘণ্টা আগে (সোমবার বিকেল ৪.৫০ মিনিট থেকে)। সেটি ভিডিও নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠনের উদ্যোগ সংক্রান্ত। পোস্টে মূল ভিডিওটি আপলোডের একটি অ্যাকাউন্টের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। সোমবার বিকেল ৫টায় ওই অ্যাকাউন্ট সক্রিয় পাওয়া যায়নি।

বিউটি পালের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টেও ভিডিওটি নেই। ডাউনলোড করা যে ভিডিওটি ফেঞ্চুগঞ্জ প্রতিদিন পোস্ট করেছে, সেখানে ৬ হাজারের বেশি মন্তব্য আছে। সেখানে মেহেদি হাসান নামে একজন লিখেছেন, ‘পোলাপানকে টিকটকের জন্য অনুপ্রানিত করতেছে। এটা তো শিক্ষিকার বৈশিষ্ট্য। (বানান অপরিবর্তিত)। 

মুহাম্মদ মনির নামে আরেকজন লিখেছেন, ‘টিকটকার ম্যাডাম’। তনয় সরকার নামে একজন লিখেছেন, ‘কাজ না থাকলে যা হয়।’ অন্য মন্তব্যগুলোর মধ্যে কয়েকটি- প্রাথমিকের শিক্ষকদের বেতন ভাতা, কর্মঘণ্টা, বাড়তি আয়ের উৎস এবং বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে গান ও নাচের ভিডিও বানানোর যৌক্তিকতা সংক্রান্ত।

পাশাপাশি অনেকে ইতিবাচক মন্তব্যও করেছেন। সুহানা জান্নাত চৌধুরী নামে একজন লিখেছেন, ‘ভিডিওটা ভালো করে দেখলাম। ম্যাডাম শুধু স্কুল মাঠে হাঁটছিলেন আর ব্যাকগ্রাউন্ডে গান ছিল। এখানে অশালীন কিছু নেই। একজন শিক্ষককে নিয়ে টিকটক নাচ -এ রকম শিরোনাম দেওয়া একদমই ঠিক না।’ 

পুচিং মারমা নামে আরেকজন লিখেছেন, ‘তীব্র সমালোচনার মতো কিছু হয় নাই। শিক্ষকতা করতে হলে সবদিকে দক্ষতা অর্জন করতে হয়। সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই গান, নৃত্য, অভিনয়ের সাবজেক্ট আছে।’ 

বিউটি অন্যায় কিছু করেছেন?
ফেঞ্চুগঞ্জের এই শিক্ষিকার প্রতি সংহতি জানিয়ে যারা ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন, তারা বলছেন এতে অন্যায় কিছু নেই। বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাওয়া হয়েছিল বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ শামছুদ্দীন মাসুদের কাছে। 

সমকালকে শামছুদ্দীন মাসুদ বলেন, ‘চাকরি বিধিতে লেখা আছে, চাকরিকালীন সময়ে শৃঙ্খলা পরিপন্থী কিছু করা যাবে না। কিন্তু এ রকম ভিডিও বানানো চাকরি বিধির পরিপন্থী হবে কি না তা আমার জানা নেই।’

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেছেন, ঘটনাটিকে তিনি কোনো অন্যায় বা অপরাধ হিসেবে দেখছেন না। সিলেটে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমি ভিডিওটি দেখিনি। তবে কয়েকজন আমাকে বিষয়টি সম্পর্কে বলেছেন। এটিতে কোনো অশ্লীলতা নেই।’

ববি হাজ্জাজ জানান, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে ‘কালচারাল এডুকেশন’ আনা হচ্ছে। এর ভেতরে গান-নাটক, কবিতা, কেরাতসহ সবকছিু থাকবে। 

দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে
শিক্ষকদের ভিডিও নিয়ে বিতর্কের উদাহরণ অন্যান্য দেশেও আছে। যেখানে একজন শিক্ষকের ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও নিয়ে তীব্র বিতর্ক, ট্রলিং বা প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পরে সাধারণ মানুষ বা সহকর্মীরা সংহতি জানিয়ে প্রতিবাদে নেমেছেন।

বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালে মিসরের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আয়া ইউসেফ সহকর্মীদের সঙ্গে এক নৌকা ভ্রমণে স্কার্ফ ও সাধারণ পোশাকে নেচে আনন্দ প্রকাশ করেছিলেন। সেই ভিডিও গোপনে ধারণ করে অনলাইনে ছেঁড়ে দেওয়া হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেখানকার রক্ষণশীলরা আয়ার বিরুদ্ধে ‘শিক্ষকতার পেশাকে অপমান’ ও ‘অশ্লীলতার’ অভিযোগ তোলে। চাপ সামলাতে না পেরে শিক্ষা বিভাগ তাঁকে চাকরিচ্যুত করে এবং ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে সংসারও ভেঙে যায়।

ঘটনাটি প্রকাশ্যে এলে মিসরের নারী অধিকার কর্মী, বিপুলসংখ্যক শিক্ষক ও সাধারণ মানুষ আয়ার পাশে দাঁড়ান। আইনজীবীরা বিনা পারিশ্রমিকে মামলা লড়েন এবং সহকর্মীরা নিজেদের নাচের ভিডিও ও ছবি প্রকাশ করে সংহতি জানান। তীব্র সমালোচনার মুখে সরকার বাধ্য হয়ে আয়াকে আবার দায়িত্বে পুনর্বহাল করে।

নিউইয়র্ক পোস্ট ও হাফপোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, একই রকম দুটি ঘটনার উদাহরণ ব্রাজিল ও যুক্তরাষ্ট্রেও আছে।

শিক্ষক থেকে অন্য অঙ্গনে আলো ছড়ানো ব্যক্তিদেরও উদাহরণ আছে। বিখ্যাত সিরিজ হ্যারি পটারের স্রষ্টা জে কে রাউলিং ১৯৯০ এর দশকে স্কটল্যান্ডের এডিনবার্গ লেইথ একাডেমিতে ভাষার শিক্ষক ছিলেন। ব্রিটিশ রক ব্যান্ড কুইনের গিটারিস্ট ব্রায়ান মে-ও পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলেন। ব্রিটিশ একাডেমি অব ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন আর্টস (বাফটা) জয়ী উপস্থাপক ও কৌতুকাভিনেতা রোমেশ রঙ্গনাথনও ছিলেন গণিতের শিক্ষক।

আরও পড়ুন

×