ভাওয়ালে ময়লার ভাগাড় ও গর্জনবনে সড়ক নির্মাণ বন্ধের দাবিতে সমাবেশ
মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বন অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ের সামনে নাগরিক সমাবেশ করে দেশের বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনের প্রতিনিধি, পরিবেশকর্মীরা। ছবি-সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ | ১৮:৩১
গাজীপুরের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে ময়লার ভাগাড় নির্মাণ এবং কক্সবাজারের মহেশখালী ও চকরিয়ার সংরক্ষিত গর্জনবনের ভেতর সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ বন্ধসহ দেশের বন ও বন্য প্রাণীর আবাসস্থল রক্ষার দাবিতে নাগরিক সমাবেশ করেছেন পরিবেশবাদীরা। তাঁদের অভিযোগ, উন্নয়নের নামে একের পর এক বনভূমি, বন্য প্রাণীর বিচরণক্ষেত্র ও পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকাগুলোতে প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। এতে দেশের বন ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে।
মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বন অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ‘বিক্ষুব্ধ পরিবেশবাদীগণ’-এর ব্যানারে এই নাগরিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে দেশের বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনের প্রতিনিধি, পরিবেশকর্মী ও তরুণেরা অংশ নেন।
সমাবেশে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক হুমায়ুন কবির বলেন, দেশের সংবিধান রাষ্ট্রকে পরিবেশ ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণের দায়িত্ব দিয়েছে। সরকারপ্রধানও বিভিন্ন সময় পরিবেশ রক্ষার গুরুত্বের কথা বলেন। কিন্তু বাস্তবে যখন দেখা যায়, সরকারি সংস্থাই সংরক্ষিত বনের ভেতর রাস্তা কিংবা ময়লার ভাগাড় নির্মাণের উদ্যোগ নেয়, তখন তা রাষ্ট্রের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়। তিনি বলেন, বন ধ্বংস করে কোনো উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না। তাই ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে ভাগাড় নির্মাণ এবং বনের ভেতরে সব ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ বন্ধ করতে হবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রতিনিধি রুমানা শারমিন বলেন, কক্সবাজার অঞ্চলে হাতির বিচরণপথ গত কয়েক বছরে একের পর এক উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে সংকুচিত হয়েছে। আগে রেললাইন নির্মাণের মাধ্যমে হাতির একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন আবার চকরিয়ার মধুশিয়া গর্জনবন ও মহেশখালীর সংরক্ষিত বনাঞ্চলে হাতির চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ করিডরের ওপর সড়ক নির্মাণের কাজ চলছে। এতে মানুষ-হাতির সংঘাত আরও বাড়বে এবং বন্য প্রাণীর স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হবে। তিনি অবিলম্বে এই নির্মাণকাজ বন্ধের দাবি জানান।
বেলার ক্যাম্পেইন ও পলিসি সমন্বয়ক বারিশ হাসান চৌধুরী বলেন, দেশের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন প্রয়োজন, কিন্তু সেই উন্নয়নের নামে সংরক্ষিত বন ধ্বংস কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। পরিবেশবান্ধব ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান রাজধানীর কাছাকাছি অবশিষ্ট থাকা বৃহৎ শালবনগুলোর অন্যতম। এই বন শুধু জীববৈচিত্র্যের জন্য নয়, গাজীপুর ও আশপাশের এলাকার পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সেখানে ময়লার ভাগাড় নির্মাণ হলে বনের মাটি, পানি ও বায়ুদূষণ বাড়বে। একই সঙ্গে বন্য প্রাণীর আবাসস্থল ও মানুষের স্বাস্থ্যও ঝুঁকির মুখে পড়বে।
বক্তারা আরও বলেন, মহেশখালী ও চকরিয়ার গর্জনবন দেশের গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষিত বনাঞ্চল। এসব এলাকায় এশীয় হাতিসহ নানা প্রজাতির বন্য প্রাণীর বিচরণ রয়েছে। বনের ভেতর নতুন সড়ক নির্মাণ করলে বন খণ্ডিত হবে, প্রাণীর চলাচল বাধাগ্রস্ত হবে এবং বন ধ্বংসের ঝুঁকি আরও বাড়বে।
সমাবেশ শেষে পরিবেশবাদীরা বন অধিদপ্তর এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) কাছে পৃথক স্মারকলিপি জমা দেন। স্মারকলিপিতে তাঁরা ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান ও আশপাশের এলাকায় সব ধরনের বেআইনি অবকাঠামো নির্মাণ বন্ধ, জাতীয় উদ্যানসংলগ্ন এলাকায় গাজীপুর সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ফেলার প্রকল্প অবিলম্বে বাতিল, পরিবেশসম্মত বিকল্প স্থানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা এবং আধুনিক পদ্ধতিতে উৎসমুখ থেকেই বর্জ্য আলাদা করার ব্যবস্থা চালুর দাবি জানান। একই সঙ্গে মহেশখালী ও চকরিয়ার সংরক্ষিত গর্জনবনের ভেতর চলমান সড়ক নির্মাণকাজ বন্ধ করে হাতির করিডর ও অন্যান্য বন্য প্রাণীর আবাসস্থল সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানান তাঁরা।
নাগরিক সমাবেশে প্রচেষ্টা ফাউন্ডেশন, আমরাই আগামী, মিশন গ্রীন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), সেইভ ফিউচার বাংলাদেশ, সিডার ইনিশিয়েটিভ, সিএইএএফ অ্যাওয়ারনেস অ্যালায়েন্স বাংলাদেশ এবং সিক্ত বাংলাদেশসহ বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন এবং কর্মসূচির প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন।
- বিষয় :
- পরিবেশ