ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ফিরে দেখা জুলাই

সবার গন্তব্য শহীদ মিনার, এক দফার ডাক

সবার গন্তব্য শহীদ মিনার, এক দফার ডাক
×

ছবি: ফাইল

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০২৬ | ১১:৩৫ | আপডেট: ০৩ আগস্ট ২০২৬ | ১১:৫৯

রাজনৈতিক সমাবেশে জনসমাগম বাড়াতে যে প্রস্তুতি ও প্রচার থাকে, তার কিছুই ছিল না। আগের দিন ফেসবুকে ঘোষণা আসে, ‘আগামীকাল শহীদ মিনারে ছাত্র-জনতার সমাবেশ’। এই একটি বাক্যে ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট দুপুর থেকে কোমল শিশু, হত্যাযজ্ঞের ক্ষোভে ফুঁসতে শিক্ষার্থীদের পাশে তাদের মা-বাবা, শ্রমিক, ডাক্তার, উকিল, নেতা, অভিনেতা– সবার গন্তব্য সেদিন ছিল রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। বৃষ্টিভেজা বিকেলে সেই ভিড় টিএসসি ছাড়িয়ে শাহবাগ পৌঁছায়। ঘোষণা আসে এক দফার। শেখ হাসিনার পতনের এক দফা দাবি অসহযোগ আন্দোলনের। 

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম সেদিন ঘোষণা করেন, কেউ অফিসে যাবে না, ট্যাক্স-খাজনা দেবে না, সরকারের কোনো আয়োজনে সহযোগিতা করা হবে না। সপ্তাহে শুধু এক দিন ব্যাংক খোলা থাকবে। বন্ধ থাকবে রেমিট্যান্স। অবরুদ্ধ শহরে দূরদূরান্ত থেকে হেঁটে আসা লাখো মানুষ মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে এক দফায় সমর্থন জানান। সেদিন আরও স্পষ্ট হয়, আওয়ামী লীগ সরকার আর টিকতে পারবে না। 

সেদিন রাজধানীর বিভিন্ন মোড়ে যেমন– বাড্ডা, রামপুরা এবং বনশ্রীতে অবস্থান নেয় ছাত্র-জনতা। জুলাই গণহত্যার বিচারের দাবিতে সড়ক অবরোধ করে। সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় এবং মিরপুর রোড অবরোধ করা হয়। উত্তরা, মিরপুর-১০ গোলচত্বরে হাজার হাজার শিক্ষার্থী বিক্ষোভ করে। যাত্রাবাড়ী এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কও অবরোধ করা হয়। শিক্ষার্থীরা সাভারে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে। এর মাধ্যমে রাজধানী কার্যত ছাত্র-জনতার দখলে চলে যায়। 

৩ আগস্ট ঢাকার বাইরে ১১ জেলায় ছাত্র-জনতার সঙ্গে সংঘর্ষ হয় পুলিশ এবং আওয়ামী লীগের। গাজীপুরের মাওনায় পুলিশের গুলিতে নিহত হন একজন। চট্টগ্রামে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় গুলিতে নিহত হন আরেকজন। কুমিল্লা শহরের বাগিচাগাঁও এলাকায় শিক্ষার্থীদের মিছিলে গুলি করে আওয়ামী লীগের অস্ত্রধারীরা। তবে কোথাও টিকতে পারেনি আওয়ামী লীগ। চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের  মন্ত্রী, মেয়র, এমপির বাসা, কার্যালয় আক্রান্ত হয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়ি ঘেরাও করা হয়। সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে ৩ আগস্ট প্রথম এই পরিস্থিতিতে পড়ে ক্ষমতায় থাকা দলটি।

গুলি চালাবে না সেনা

৩ আগস্ট সেনাসদরে সর্বস্তরের কর্মকর্তার সঙ্গে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বৈঠক করেন। কর্মকর্তারা জানিয়ে দেন, জনগণের বিপক্ষে অবস্থান নিতে পারবেন না। সেনাবাহিনী গুলি চালাবে না ছাত্র-জনতার ওপর। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সেনাপ্রধান অফিসারদের জনগণের পাশে থাকার ও জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার তাগিদ দেন। তিনি বলেন, সেনাবাহিনী দেশের জনগণের বিশ্বাসের প্রতীক এবং তারা দেশ ও জনগণের স্বার্থে সবসময় জনগণের পাশে থাকবে।

এই বার্তাতে অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে যায়, আওয়ামী লীগ সরকার ছাত্র-জনতাকে দমনে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, আনসারকে দিয়ে গুলি করাতে পারলেও সশস্ত্র বাহিনী নৃশংসতা চালাবে না। 

অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা এবং তাদের পরিবারের সদস্যরাও মিরপুরের ডিওএইচএস এলাকায় সমাবেশ করে আন্দোলন চলাকালে হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেন।

শেখ হাসিনা প্রত্যাখ্যাত

৩ আগস্ট সকালে তৎকালীন শেখ হাসিনা গণভবনে পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠকে বলেন, ‘গণভবনের দরজা খোলা। আমি আন্দোলনরত ছাত্রদের সঙ্গে বসতে চাই এবং তাদের কথা শুনতে চাই। আমি কোনো সংঘাত চাই না।’

শিক্ষার্থীরা এই বক্তব্য সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দেয় সামাজিক মাধ্যমে। এরপরও সারাদিন শেখ হাসিনা চেষ্টা চালান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের। কিন্তু দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা এবং গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা চেষ্টা করেও নাগাল পাননি সমন্বয়কদের। তারা তখন ছাত্র-জনতার নিরাপত্তা বলয়ে ছিলেন। ব্যর্থ হয়ে আওয়ামী লীগ সিদ্ধান্ত নেয়, এক দফার অসহযোগ আন্দোলন দমনে দলীয় নেতাকর্মীদের দিয়ে রাজপথে আরও শক্তি প্রদর্শন করবে। 

এক দফার ডাক 

শহীদ মিনারের লাখ লাখ ছাত্র-জনতার প্রধান স্লোগানই ছিল ‘৯ দফা বাদ দে, ১ দফার ডাক দে’। বিকেল ৫টার দিকে সমবেত জনতার উদ্দেশে প্রধান সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম চূড়ান্ত ঘোষণাটি পাঠ করেন। তিনি বলেন, স্বৈরাচারী সরকারের বুলেট ও দমন-পীড়নে আমাদের শত শত ভাইবোন শহীদ হয়েছেন। এই খুনি সরকারের কাছে কোনো বিচার চাওয়া বা সংলাপের প্রশ্নই আসে না। আমাদের দাবি এখন আর সংস্কারে সীমাবদ্ধ নয়; দাবি একটাই– শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকারের অবিলম্বে পদত্যাগ। আন্দোলনকারীরা শেখ হাসিনার দেওয়া আলোচনার প্রস্তাবকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন।

আন্তর্জাতিক উদ্বেগ 

বাংলাদেশের নজিরবিহীন পরিস্থিতিতে ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক অনতিবিলম্বে বলপ্রয়োগ বন্ধের আহ্বান জানান। 

২২ জন মার্কিন সিনেটর ও কংগ্রেস সদস্য তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেনকে চিঠি লেখেন এবং বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতির আরও অবনতি ঠেকাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান। ওই চিঠিতে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলা হয়। 

৩ আগস্টের এই ‘এক দফা’ ঘোষণা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মোড়। ছাত্র-জনতার এই অনড় অবস্থানের মুখে আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণ ক্রমেই শিথিল হয়ে পড়ছে, যা দেশকে এক নতুন রাজনৈতিক পরিবর্তনের দিকে ধাবিত করছে।

আরও পড়ুন

×