ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রক্তাক্ত ৪ আগস্ট

অসহযোগ আন্দোলন দমনে নেমে বিধ্বস্ত পুলিশ-আওয়ামী লীগ

এক দিনে নিহত শতাধিক

অসহযোগ আন্দোলন দমনে নেমে বিধ্বস্ত পুলিশ-আওয়ামী লীগ
×

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৩৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

চব্বিশের ৪ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে সারাদেশে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। আগের দিন শহীদ মিনারের সমাবেশ থেকে এ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়।

অসহযোগ আন্দোলন শুরুর সকাল থেকেই ছাত্র-জনতাকে দমনে পুলিশের পাশাপাশি রাজপথে সর্বশক্তি নিয়ে নামে আওয়ামী লীগ। সেদিন ক্ষমতাসীন দলের অনেক নেতাকর্মীর আগ্নেয়াস্ত্র হাতে ছবি আসে সংবাদমাধ্যমে। হত্যাযজ্ঞ চালিয়েও রাজপথে টিকে থাকতে পারেনি আওয়ামী লীগ। 
নরসিংদী, রংপুর, লক্ষ্মীপুরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গুলি ফুরিয়ে যাওয়ার পর জনতা ঘেরাও করে তাদের মারধর করে। একই পরিণতি হয় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। তাতেই আঁচ পাওয়া যাচ্ছিল, শেখ হাসিনা আর শক্তি প্রয়োগ করে ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না। তাঁর পতন নিশ্চিত করতে গণভবন ঘেরাওয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্রআন্দোলন ঢাকামুখী লংমার্চ এক দিন এগিয়ে এনে ৫ আগস্ট করার সিদ্ধান্ত নেয়। 

শুধু আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা নন; ৪ আগস্ট জনতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো পুলিশও বিভিন্ন জায়গায় আক্রান্ত হয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেট, হবিগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, কুমিল্লা, নোয়াখালীসহ দেশের অনেক জায়গায় জনতার ওপর নির্বিচার গুলি চালায় পুলিশ। সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরে হাজার হাজার জনতা থানা ঘেরাও করে ১৩ পুলিশ সদস্যকে হত্যা করে। সেদিন ১১৮ জন নিহত হন সারাদেশে। তাদের মধ্যে ২৮ জন ছিলেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী। 
৩ আগস্ট রাত থেকে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক গুজব ছড়ান আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। পুরোনো মিছিলের ভিডিও দিয়ে তখন দাবি করা হয়, বিভিন্ন জেলা দখল করে নিয়েছেন তারা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের বাসা থেকে টাকা উদ্ধারের গুজবও ছড়ানো রাতভর। 

শক্তি প্রদর্শন করতে এসে বিধ্বস্ত
৪ আগস্টের সকালের চিত্রটা একটু ভিন্ন ছিল। সেদিন সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবস রোববার হলেও রাস্তাঘাট অনেকটা ফাঁকা ছিল। শিক্ষার্থীরা সকাল ১০টার দিকে শহীদ মিনার, টিএসসি, সায়েন্স ল্যাব এলাকায় জমায়েত হন। রাজধানীর অন্যান্য এলাকা থেকেও বহু মানুষ শাহবাগের দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। 
সাড়ে ১০টার দিকে আওয়ামী লীগ নেতাদের মিছিল আসে শাহবাগে। তারা সেখানে অস্ত্র নিয়ে অবস্থান নেন। তবে কিছু সময়ের মধ্যে টিএসসি এবং সায়েন্স ল্যাবের দিক থেকে আসা জনতার মিছিল তাদের ধাওয়া করে। কয়েক মিনিটের মধ্যে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা পিছু হটে এখনকার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে পড়ে। জনতা তাদের ধাওয়া করে ভেতরে ঢুকে পেটায়। 
ঢাকায় আওয়ামী লীগের আরেক শক্ত অবস্থান ছিল মিরপুর-১০ নম্বরে। দলটির তৎকালীন তিন এমপি কামাল আহমদ মজুমদার, ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা এবং মইনুল হোসেন খান নিখিলের সাত-আট হাজার অনুসারী সেখানে সমবেত হন। চার দিক থেকে তাদের ঘিরে ধরে ছাত্র-জনতা। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা নির্বিচার গুলি চালায়, বেলা ১১টা থেকে ৩টা পর্যন্ত। কিন্তু সাধারণ মানুষের ছোড়া ইট-পাটকেল, ছাদ থেকে ছিটানো মরিচের গুঁড়া মেশানো পানিতে আওয়ামী লীগ পিছু হটে। 

অভিন্ন চিত্র ছিল উত্তরায়। মাইলস্টোন স্কুলের সামনে শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালানো হয়। এতে একজন নিহত এবং আরেকজন আহত হন। গুলি ফুরিয়ে যাওয়ার পর ঢাকা-১৮ আসনের সাবেক এমপি হাবিব হাসানের চাচাত ভাই আনোয়ারুল ইসলামকে ধাওয়া দেন আন্দোলনকারীরা। এক পর্যায়ে তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
সেদিন দুপুরে ধানমন্ডি-৩ নম্বরে আওয়ামী লীগ কার্যালয় থেকে গুলি ছোড়া হয়। গুলিতে নিহত হন শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ সিদ্দিক। এতে শিক্ষার্থীরা পিছু হটেন। পরে তারা একজোট হয়ে ধাওয়া দিলে আওয়ামী লীগ কর্মীরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। 
যাত্রাবাড়ীতে ছাত্রলীগ-যুবলীগ ও পুলিশের সশস্ত্র হামলার মুখে খালি হাতেই প্রতিরোধ গড়ে তোলে ছাত্র-জনতা। দিনভর দফায় দফায় সংঘর্ষে জুয়েল নামে এক যুবকসহ বেশ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান। উত্তরা ও রামপুরায় ইস্ট ওয়েস্ট, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে আসেন। উত্তরায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারীদের গণমিছিলের ওপর নির্বিচার গুলি চালান।

বিকেলে ঢাকায় সবচেয়ে বড় সংঘর্ষ হয় কারওয়ানবাজার থেকে ফার্মগেট সড়কে। হাজারের বেশি পুলিশ-র‍্যাব সদস্য গুলি চালায় শাহবাগ থেকে গণভবন অভিমুখে মার্চ করা ছাত্র-জনতার ওপর। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা সার্ক ফোয়ারা থেকে প্রকাশ্যে গুলি করে। লাখো নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার প্রতিরোধ ও ধাওয়ায় আওয়ামী লীগ ও পুলিশ পিছু হটে ফার্মগেটে অবস্থান নেয়। 
সেখানে পুলিশের গুলিতে আহত হন বনানী বিদ্যানিকেতন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী গোলাম নাফিজ। তাকে রিকশার পাদানিতে তুলে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। মাথায় জাতীয় পতাকা বাঁধা রিকশাচালকের আসনের নিচের রড ধরে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করেন তিনি। দুই পাশে ঝুলছিল তার পা এবং মাথা। এই ছবি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক ছবিতে পরিণত হয়। সেদিন নাফিজসহ চারজন শহীদ হন ফার্মগেট ও কারওয়ানবাজারে। 

পতনের মুখে শেখ হাসিনা
এমন ভয়াবহ রক্তাক্ত দিনের পরও শেখ হাসিনা সন্ধ্যায় গণভবনে সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। আরও বল প্রয়োগ করতে চাপ দেন। সেনাবাহিনী এতে সাড়া না দিলে ঢাকা মহানগর পুলিশের তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর রহমান আরও শক্তি প্রয়োগের কৌশলকে সমর্থন জানান।
জনতার উত্তাল স্রোত দমনে তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকার দেশজুড়ে আবারও ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট বা ফোর-জি ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেয়। বিকেল থেকেই অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করা হয়। তবে সরকারের এই দমনপীড়ন ও কারফিউর সিদ্ধান্তকে মেন নেয়নি সাধারণ মানুষ।
পরদিন রাস্তায় নামলেই দমন করা হবে– হাবিবুর রহমানের এ ঘোষণার পরও ৪ আগস্ট রাতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ঘোষণা দেন, ঢাকামুখী লংমার্চ ৫ আগস্টেই হবে। 

আরও পড়ুন

×