ঢাকা শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২৬

জুলাই জাদুঘর

সীমান্ত হত্যা ও মোদিবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতি না থাকায় নাহিদের ক্ষোভ

সীমান্ত হত্যা ও মোদিবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতি না থাকায় নাহিদের ক্ষোভ
×

এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। ছবি: সংগৃহীত

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬ | ১২:৩৮ | আপডেট: ০৮ আগস্ট ২০২৬ | ১২:৫৭

জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে সীমান্ত হত্যা, ফেলানী হত্যাকাণ্ড ও মোদিবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতি না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তার অভিযোগ, জাদুঘরের বর্তমান উপস্থাপনায় গত ১৬ বছরে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক এবং এসব ঘটনার ইতিহাস যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি।

শনিবার সকালে রাজধানীর জুলাই স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে নাহিদ ইসলাম এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, জাদুঘরে সীমান্তে বিএসএফের হাতে নিহত বাংলাদেশিদের একটি তালিকা এবং ফেলানী হত্যাকাণ্ডের স্মরণে একটি ভাস্কর্য ছিল। এসব উপাদান এখন আর সেখানে নেই। মোদিবিরোধী আন্দোলনের কিছু স্মৃতিচিত্রও সরিয়ে ফেলা হয়েছে। নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘এটা ভয় থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে কি না, জানা নেই। সরিয়ে দিয়ে তারা ভারতের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বোঝাচ্ছে। কিন্তু এখানে আপসের কিছু নেই। আপস করে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখা যাবে না।’

জুলাই স্মৃতি জাদুঘরকে কোনো রাজনৈতিক দলের ইতিহাস হিসেবে নয়, জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, গত ১৬ বছরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে ভারতের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্কও ইতিহাসের অংশ। সীমান্ত হত্যা, ফেলানী হত্যাকাণ্ড, বিডিআর হত্যাকাণ্ড ও মোদিবিরোধী আন্দোলনের মতো বিষয়গুলো জাদুঘরে তুলে ধরা প্রয়োজন।

নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক দলের ইতিহাসে পরিণত হওয়া উচিত নয়। জাদুঘরকে প্রকৃত ইতিহাসচর্চার জায়গা এবং জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসও বিভিন্ন সময়ে দলীয়করণ করা হয়েছে। একেকটি সরকার ক্ষমতায় এসে পাঠ্যপুস্তক ও ইতিহাসের উপস্থাপনা পরিবর্তন করেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসের ক্ষেত্রেও যেন এমন পরিস্থিতি তৈরি না হয়।

জাদুঘরের বর্তমান প্রদর্শনী নিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের বিভিন্ন সেগমেন্ট আরও জোরালো করা প্রয়োজন। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসা এবং ঢাকার বাইরের আন্দোলনের ভূমিকা যথেষ্টভাবে তুলে ধরা হয়নি। পরিচিত কিছু মুখকে বারবার তুলে ধরা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, পুরো জাদুঘর ঘুরে দেখলে এমন ধারণা হতে পারে যে গত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদ ছিল শুধু একটি দেশীয় বিষয়। অথচ এর সঙ্গে বিভিন্ন বৈদেশিক শক্তিরও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক ছিল। একই সঙ্গে জাদুঘরে বিএনপির নেতা-কর্মীদের ওপর গত ১৬ বছরে হওয়া নির্যাতনের বিষয়বস্তু বাড়ানো হয়েছে বলেও জানান নাহিদ ইসলাম। তার মতে, এর সঙ্গে কিছুটা দলীয় বক্তব্য ও বয়ানও যুক্ত হয়েছে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ আবু সাঈদের ছবি জাদুঘরের একটি গ্যালারিতে না থাকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন নাহিদ ইসলাম। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আবু সাঈদের হত্যাকাণ্ড জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে স্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। অথচ জাদুঘরের সংশ্লিষ্ট গ্যালারিতে তার ছবি নেই। নাহিদ ইসলাম জানান, বিষয়টি নিয়ে তিনি জাদুঘরের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আবু সাঈদকে নিয়ে আলাদা পরিকল্পনা রয়েছে। তাকে নিয়ে একটি চলচ্চিত্রও তৈরি করা হচ্ছে, যা জাদুঘরে প্রদর্শন করা হবে।

শুধু আবু সাঈদ নন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্য শহীদদের স্মৃতিও আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। শহীদদের পরিবারের পক্ষ থেকে জাদুঘরে বর্তমানে প্রদর্শিত স্মৃতিচিহ্নের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি স্মৃতিচিহ্ন দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। এসব স্মৃতিচিহ্ন আরও শৈল্পিক ও অর্থবহভাবে কীভাবে প্রদর্শন করা যায়, তা নিয়ে কাজ করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন নাহিদ ইসলাম।

জুলাই স্মৃতি জাদুঘর পরিচালনায় স্বায়ত্তশাসিত কাঠামোর দাবি জানিয়েছেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, কোনো আমলাতান্ত্রিক কাঠামো বা সাধারণ শাখার জাদুঘরের মতো করে এটি পরিচালনা করা সম্ভব নয়। জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করেন এবং আন্দোলনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন-এমন ব্যক্তি, গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের জাদুঘরের পরিচালনায় যুক্ত করার পরামর্শ দেন তিনি। এ জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন বা সংশোধনের কথাও বলেন।

জাদুঘর প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে যেসব শিক্ষার্থী, গবেষক এবং বিভিন্ন দল ও মতের মানুষ কাজ করেছেন, তাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার পক্ষেও মত দেন নাহিদ ইসলাম। তার মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া এবং এর চেতনা ধারণ করা ব্যক্তিদের মাধ্যমে জাদুঘরের পরিচালনা ও উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া উচিত।

জাদুঘরের জনবল নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। বর্তমানে প্রায় ১৫ থেকে ২০ জন জনবল রয়েছে জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, তাদের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবীদের দিয়েও জাদুঘরের কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য প্রায় ২০০ জন জনবল প্রয়োজন। তিনি বলেন, পর্যাপ্ত জনবল না থাকলে দর্শনার্থী ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হবে। বিশেষ করে এই জাদুঘরের নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় যেকোনো ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া উচিত নয়।

দর্শনার্থীদের জন্য আধুনিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার ওপরও জোর দেন নাহিদ ইসলাম। তার মতে, জাদুঘরে প্রশিক্ষিত এক্সপ্লেইনার থাকা প্রয়োজন, যারা দর্শনার্থীদের প্রদর্শনীগুলোর বিষয়বস্তু ব্যাখ্যা করবেন। অডিও গাইডসহ আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাও চালু করা প্রয়োজন। বিদেশের বিভিন্ন জাদুঘরের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, বিশেষ করে চীনের জাদুঘরগুলোতে দর্শনার্থীদের প্রদর্শনীর বিষয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। কোথাও অডিওর মাধ্যমে তথ্য শোনানো হয়, আবার কোথাও প্রশিক্ষিত ব্যক্তি বিভিন্ন বিষয় ব্যাখ্যা করেন। জুলাই স্মৃতি জাদুঘরেও এ ধরনের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

জাদুঘরের মূল ভবনের বাইরেও আরও কাজ করার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন নাহিদ ইসলাম। পুরো ১৭ একর জায়গাকে ঘিরে বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ রয়েছে। তবে আগের পরিকল্পনাগুলো বর্তমানে কোন পর্যায়ে রয়েছে, সে বিষয়ে জাদুঘরের দায়িত্বশীলরা তাকে স্পষ্টভাবে জানাতে পারেননি বলে জানান তিনি।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের বিষয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, বিষয়টিকে ভালো বা খারাপ-এভাবে দেখার সুযোগ নেই। দুই দেশের সম্পর্ক হওয়া উচিত মর্যাদা ও সমতার ভিত্তিতে। তিনি অভিযোগ করেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখার জন্য সরকার কিছু বিষয়ে আপস করছে। তার মতে, সরকারের এমন আপসকামী অবস্থানের কারণে দিল্লিতে সম্মেলন করে অতীতের স্বৈরাচারী শক্তিগুলো হুংকার দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

এ ক্ষেত্রে সরকার শুধু একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দায়িত্ব শেষ করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আপসের কোনো সুযোগ নেই। আপস করে আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষা করতে পারব না।’
 

আরও পড়ুন

×