চা শ্রমিকদের ৪ দফায় অস্থিতিশীল বাগান
চার দফা দাবি আদায়ে কুলাউড়ায় বিভিন্ন বাগানের চা শ্রমিকদের সম্মিলিত গণবিক্ষোভ কর্মসূচি। সাম্প্রতিক এ কর্মসূচিতে সংহতি প্রকাশ করেন ছাত্র ও যুব সংগঠনের আঞ্চলিক সদস্যরা সমকাল
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:২৫ | আপডেট: ১২ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:৫৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
দৈনিক মজুরি বাড়িয়ে ৫০০ টাকা নির্ধারণ, সম্প্রতি ঘোষিত ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্টের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ও গেজেট বাতিল, বসতভিটার ভূমি অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের (বি-৭৭) অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দ্রুত আয়োজনের দাবিতে সিলেটের চা-বাগান অধ্যুষিত বিভিন্ন জেলা-উপজেলাতে চলছে আন্দোলন, প্রতিবাদ। গত এক মাসে মৌলভীবাজার, শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, কুলাউড়া, মাধবপুর, চুনারুঘাটসহ বিভাগের বিভিন্ন এলাকার চা বাগানগুলোতে কর্মবিরতি দিয়ে আন্দোলন করেন শ্রমিকরা।
গত মাসের শেষ দিকে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলা থেকে শুরু হওয়া চা শ্রমিকদের এই আন্দোলন পর্যায়ক্রমে মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার বাগানগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। এসব বাগানে নির্ধারিত দিনে কাজ বন্ধ রেখে আয়োজিত কর্মসূচিতে যোগ দেন সাধারণ শ্রমিকরা। তবে এবারের আন্দোলনে ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় ও শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতি ও নীরবতা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ চা শ্রমিকরা। তারা জানান, তাদের ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা, সাধারণ শিক্ষার্থী, স্থানীয় চা শ্রমিক নেতা, রাজনীতিবিদ ও সচেতন সমাজের অনেকেই সরব হলেও ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বিস্ময়করভাবে নীরব। এমনকি তাদের কোনো কর্মসূচিতে সংশ নিতেও দেখা যাচ্ছে না। অথচ এই শ্রমিকদের ভোটেই তারা নেতৃত্বে বসেন, এবারের আন্দোলনের অন্যতম দাবিও চা শ্রমিক ইউনিয়নের
চলতি বছরের জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত জেলার ৯২টি চা-বাগানের মধ্যে অন্তত ৪০ থেকে ৪২টি বাগানে কাজ বন্ধ রেখে বিক্ষোভ মিছিল, অবস্থান কর্মসূচি ও মানববন্ধনের মতো কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের দাবির কথা জানাতে শুরু করেন চা শ্রমিকরা। এ সময় রাজপথে সাধারণ শ্রমিকদের পাশাপাশি সচেতন ছাত্র-যুব সমাজ ও বামপন্থি একাধিক শ্রমিক সংগঠন সক্রিয় হয়। তবে চা শ্রমিকদের সিবিএ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় মূলধারার নেতাদের মাঠে না পেয়ে সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
বিভিন্ন বাগান সূত্র ও সাধারণ শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী প্রতি দুই বছর পরপর মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের মাধ্যমে চা শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণ করা হতো। সর্বশেষ ২০২২ সালের জোরালো আন্দোলনের বিপরীতে তাদের দৈনিক মজুরি ৫০ টাকা বাড়িয়ে ১২০ টাকা থেকে ১৭০ টাকা করা হয়। পরে ২০২৩-২৪ মেয়াদে ইনক্রিমেন্ট যুক্ত হয়ে তা বর্তমানে দাঁড়ায় ১৮৭ টাকা ৫০ পয়সায়। কিন্তু চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশচুম্বী দামের কারণে এই সামান্য উপার্জন ফিকে হয়ে পড়ে।
এরই মধ্যে মজুরি চুক্তির বিকল্প হিসেবে প্রতি বছর ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার একটি গেজেট পাস করা হয়, যা ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢালে। আন্দোলনকারীদের মতে, ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট মানে দৈনিক মাত্র ৮ টাকা মজুরি বৃদ্ধি, যা বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে এক ধরনের তামাশা ও অমানবিক আচরণ। শ্রমিকদের স্পষ্ট বার্তা–এই ৫ শতাংশের গেজেট বাতিল করে জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত দৈনিক ৫০০ টাকা সর্বনিম্ন মজুরি অবিলম্বে কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে প্রায় ২০০ বছর ধরে এই অঞ্চলে বসবাস করেও শিক্ষা, চিকিৎসা ও সাংবিধানিক সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত থাকার পরিপ্রেক্ষিতে ভিটেমাটির জন্য ভূমির মালিকানা ও অধিকার নিশ্চিত করার জোরালো দাবিও জানান তারা।
সাম্প্রতিক আন্দোলনের শুরু হয় ২৪ জুলাই থেকে। কুলাউড়া উপজেলায় চা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের উদ্যোগে আয়োজিত কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ সমাবেশে সংগঠনের প্রধান সমন্বয়ক এস এম শুভ বলেন, স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়েও চা জনগোষ্ঠী আজ রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের শিকার। দেশের সবচেয়ে কম মজুরিপ্রাপ্ত এই শ্রমজীবী মানুষের বাঁচতে হলে আন্দোলনের বিকল্প নেই। এর ঠিক ছয় দিন পর, ৩০ জুলাই শ্রীমঙ্গলের টিপড়াছড়া চা-বাগানে নাটমন্দির প্রাঙ্গণে কাজ বন্ধ রেখে গণবিক্ষোভ করেন শ্রমিকেরা।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন সংস্কার কমিটির আহ্বায়ক বিশু প্রসাদ গোয়ালা ও যুগ্ম আহ্বায়ক আকাশ দোষাদ এই কর্মসূচিতে ঘোষণা দেন যে, মৌলিক নাগরিক সুবিধা না পাওয়া পর্যন্ত তাঁদের আন্দোলন থামবে না।
আগস্টের শুরুতে আন্দোলনের মাত্রা তীব্র হয়। ৩ আগস্ট কমলগঞ্জের রহিমপুর ইউনিয়নের দেওড়াছড়া চা-বাগানে এক অভাবনীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। টানা ছয় সপ্তাহ ধরে সাপ্তাহিক মজুরি (তলব) বন্ধ থাকায় ক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা কারখানার সামনে দিনব্যাপী অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। খেয়ে না-খেয়ে দিন পার করা শ্রমিকেরা জানান, বকেয়া না পাওয়ায় পরিবারের চিকিৎসা, সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধের উপক্রম হয়েছে এবং অনেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছেন।
যদিও দেওড়াছড়া বাগানের ব্যবস্থাপক আবদুল্লাহ আল নোমান চা বোর্ডের অভ্যন্তরীণ জটিলতার কথা স্বীকার করে বকেয়া দ্রুত পরিশোধের আশ্বাস দেন, তবুও ক্ষোভ প্রশমিত হয়নি। একই দিনে বড়লেখার নিউ সমনবাগ চা-বাগানের প্রধান কার্যালয়ের প্রাঙ্গণে পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি নারায়ণ কালোয়ার ও সাধারণ সম্পাদক রাঙ্গাচরণ সাঁওতালের নেতৃত্বে শত শত শ্রমিক ও নারীনেত্রীরা গণবিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।
৮ আগস্ট কুলাউড়ার দিলদারপুর চা-বাগানে পঞ্চায়েত অ্যাডহক কমিটির উদ্যোগে কর্মবিরতি পালিত হয় এবং বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সংস্কার কমিটির সদস্য সচিব জনক লাল দেশোয়ারা জনির উপস্থিতিতে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় শ্রম অধিদপ্তরের অবৈধ হস্তক্ষেপ বন্ধের দাবি ওঠে। এর পরদিন ৯ আগস্ট কমলগঞ্জ উপজেলা চৌমুহনা চত্বরে চা-বাগানের তরুণ শিক্ষার্থীদের গঠিত ‘চা ছাত্র-যুব পরিষদ’-এর উদ্যোগে এক বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। মোহন রবিদাসের সভাপতিত্বে এতে বক্তব্য দেওয়া তরুণ নেতারা বলেন, যে কোনো আশ্বাস নয়, দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত রাজপথ ছাড়বেন না তারা।
সর্বশেষ মঙ্গলবার দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা করাসহ চার দফা দাবিতে মৌলভীবাজারের দুটি চা বাগানের সাধারণ শ্রমিকেরা আন্দোলনে নামেন। তবে এসব কর্মসূচিতে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নেতাদের সক্রিয় সম্পৃক্ততা না থাকায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন শ্রমিকরা। উপস্থিত শ্রমিকদের মাঝে দেখা দেয় অসন্তোষ।
কেন্দ্রীয় অধিকাংশ নেতার এমন আচরণের বিপরীতে শ্রমিকদের এই রাজনৈতিক সমীকরণের জবাবে অবশ্য বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নিপেন পাল ও সহসভাপতি পংকজ এ কন্দ গত ৭ আগস্ট শ্রীমঙ্গলের লেবার হাউসে এক সংবাদ সম্মেলন করেন। তাঁরা দাবি করেন, বর্তমান ১৮৭ টাকা ৫০ পয়সা মজুরিতে শ্রমিকদের সংসার চালানো অসম্ভব এবং নতুন মজুরি বোর্ড গঠন জরুরি। তবে সাধারণ শ্রমিকদের মিছিলে না থাকার প্রশ্নের জবাবে নিপেন পাল সংক্ষেপে জানান, নেতাদের সম্পূর্ণ সমর্থন আন্দোলনের প্রতি রয়েছে। এর পরেই ডিসি কার্যালয়ে চলে যান তিনি।
- বিষয় :
- শ্রমিক বিক্ষোভ
- চা