কুড়িগ্রাম সীমান্ত
রাতের আঁধারে নদীপথে ভারতে পাচার হচ্ছে সোনালি আঁশ
ফাইল ছবি
সুজন মোহন্ত, কুড়িগ্রাম
প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৩:১৬
কুড়িগ্রামে রাতের আঁধারে নদীপথে ভারতে পাচার হচ্ছে দেশের অন্যতম অর্থকরী ফসল সোনালি আঁশ পাট। দিনের বেলায় স্বাভাবিক বেচাকেনা চললেও রাত নামলেই সক্রিয় হয়ে ওঠে পাচারকারী চক্র। ইঞ্জিনচালিত নৌযানে করে পাট ভারতে পাচার হয়।
সমকালের অনুসন্ধানে জানা গেছে, কুড়িগ্রাম জেলার জাহাজের আলগা, সাহেবের আলগা, নারায়ণপুর, পাখিউড়া, শৌলমারী, বেরুবাড়ী, নুনখাওয়া, কাপনা, পদ্মারচর, যাত্রাপুর, কচাকাটা, মাদারগঞ্জ ইত্যাদি চর থেকে দিনে কৃষকদের কাছ থেকে পাট সংগ্রহ করা হয়। রাত ২টার পর সক্রিয় হয়ে ওঠে পাচারকারী চক্র। চক্রটি ধরলা, দুধকুমার, ব্রহ্মপুত্র ও নীলকমল নদের চরাঞ্চলগুলোতে স্তূপ করে রাখা পাট নৌকায় উঠিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ধুবরি জেলার কাটামারি এলাকায় নিয়ে যায়।
সম্প্রতি মধ্যরাতে জেলা সদরের যাত্রাপুর নৌঘাট থেকে পাট পরিবহন করা একটি নৌকার যাত্রী হন সমকালের এই প্রতিবেদক। কয়েকজন পাটচাষির সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, ভালো দাম পাওয়ায় এক মাস ধরে ভারতের ধুবরির কাটামারিতে পাট বিক্রি করেন স্থানীয় লোকজন। প্রতি রাতে ১০-১২টি নৌকা বিভিন্ন চর থেকে পাট সংগ্রহ করে ভোর হওয়ার আগেই সেগুলো ভারতে পাচার করা হয়। সেই হিসাবে প্রতি মাসে জেলার নদীপথ দিয়ে ৩০-৩৫ হাজার মণ পাট ভারতে পাচার হচ্ছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাত হলেই বদলে যায় নদীপথের চিত্র। দিনে নদীপথে নৌযান চলাচল স্বাভাবিক মনে হলেও রাত গভীর হলেই নদনদীর প্রায় ২০-২৫টি পয়েন্টে বাড়ে চলাচল।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে চর নারায়ণপুরের এক পাটচাষি বলেন, ‘বাংলাদেশে প্রতি মণ পাটের বর্তমান বাজারমূল্য তিন হাজার ৮০০ থেকে চার হাজার ২০০ টাকা। অন্যদিকে, ভারতে প্রতি মণ পাটের বর্তমান বাজার মূল্য পাঁচ হাজার ৫০০ থেকে ছয় হাজার টাকা। লাভ বেশি, কষ্ট নাই তাই পাট বিক্রি করি ভারতে।’
চর শৌলমারীর আরেক পাটচাষি বলেন, ‘নৌকাত করি যাত্রাপুর নিয়া যাওয়া নাগে পাট। কামলা খরচ, নৌকা ভাড়া সোগ হিসাব করি পাটের লাভ তেমন থাকে না। সরকার তো আর পাটের দাম বাড়ায় না। ভারতের সাথে যোগাযোগ করে এখানকার লোকজন দিনের বেলা বাড়িত আসি পাট দেখে, ভালো পাটগুলো আলাদা করে মেপে দাম দিয়া যায়। রাতে তারাই নৌকাতে পাট তুলি নিয়া যায়। হামারগুল্যার তেমন কোনো ক্ষতি হয় না।’
কৃষক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেলার সব চেয়ে বড় যাত্রাপুর হাটে মৌসুমে সপ্তাহের শনি ও মঙ্গলবার হাটের দিনে চার-পাঁচ হাজার মণ পাট বেচাকেনা হয়। কিন্তু মাসখানেক ধরে হাটে বিক্রি নেমে এসেছে অর্ধেকেরও নিচে।
পাট ব্যবসায়ী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘আমাদের দেশ থেকে নৌপথে যেভাবে ভারতে পাট পাচার হচ্ছে, এতে আমরা সাধারণ ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। অন্যদিকে, ভারতে পাচার হওয়ায় বাংলাদেশ রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।’
আরেক ব্যবসায়ী শাহানুর ইসলাম বলেন, ‘আমাদের সোনালি আঁশ আরেকটা দেশে পাচার হবে– এটা মেনে নেওয়ার মতো না। ভারত চাইলে বৈধভাবে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে পাট কিনতে পারে। কিন্তু রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে এমন কাজ শোভনীয় নয়। আমরা শুরুর দিকে বিজিবিকে বললেও তারা কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।’
নদীপথে রাতের বেলায় পাট পরিবহনের ঘটনা ঘটলেও প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত নজরদারি নেই। নৌ পুলিশের টহল না থাকায় চক্রটি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম পাট অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মুখ্য পরিদর্শক এটিএম খায়রুল হক বলেন, ‘আমরা কয়েকজনের নাম পেয়েছি, কিন্তু তারা স্বীকার করে না। আমার জনবল নাই, আমি একাই কী করব?’
জানতে চাইলে কুড়িগ্রাম ২২ বিজিবি ব্যাটালিয়নের সহকারী পরিচালক মো. মতিউর রহমান বলেন, ‘আমরা এ রকমটা লোকমুখে শুনেছি। শোনার পর থেকে গত সাত দিন ধরে টহল আরও বাড়িয়েছি। কিন্তু আমরা কাউকে পাট পাচার করতে দেখছি না। আপনার (সাংবাদিক) কাছে পাচারের সময় তথ্য থাকলে জানাইয়েন আমরা অ্যাকশনে যাব।’
- বিষয় :
- পাট
- সীমান্ত
- সোনালি আঁশ