বিশ্ব হাতি দিবস
মামলা হয়, বিচার হয় না হাতি হত্যার
গত ৯ বছরে ১৪৬ হাতির মৃত্যু বন আদালতে মামলা মাত্র ২০
পাহাড়ের ঢালে বন্যহাতির পাল। শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার বাতকুচ এলাকায়। সম্প্রতি তোলা সমকাল
জাহিদুর রহমান
প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৪৬ | আপডেট: ১২ আগস্ট ২০২৬ | ১৭:৫৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
একের পর এক হাতি মারা পড়ছে। কোথাও বৈদ্যুতিক ফাঁদে, কোথাও গুলিতে, আবার কোথাও দলবদ্ধ মানুষের আক্রমণে। হাতি হত্যার ঘটনায় মামলা হয়, কিন্তু বিচার শেষ হয় না। বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকায় অপরাধীদের মধ্যে শাস্তির ভয় তৈরি হচ্ছে না। এই প্রাণীর ওপর সহিংসতা দিনে দিনে বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে আজ বুধবার পালিত হচ্ছে হাতি দিবস। হাতির টেকসই পরিবেশ, খাদ্য ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে দিবসটিকে বিশ্বব্যাপী গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত ৯ বছরে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নেত্রকোনা, শেরপুর, ময়মনসিংহ ও জামালপুরে ১৪৬টি হাতি মারা গেছে। এসব ঘটনায় বন আদালতে মামলা হয়েছে মাত্র ২০টি। এর মধ্যে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ১১৪টি হাতির মৃত্যুর ঘটনায় বন আদালতে মামলা হয়েছে ১৯টি। এসব এলাকার থানায় সাধারণ ডায়েরি হয়েছে ৭৫টি। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নেত্রকোনা, শেরপুর, ময়মনসিংহ ও জামালপুরে ৩২টি হাতি মারা গেলেও বন আদালতে মামলা হয়েছে মাত্র একটি। থানায় মামলা হয়েছে একটি এবং সাধারণ ডায়েরি হয়েছে সাতটি।
এদিকে ১৯৯২ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সারাদেশে হাতি হত্যার অভিযোগে ৩৭টি মামলা হলেও কোনোটিই নিষ্পত্তি হয়নি। ২০২১ সালের শেষে চট্টগ্রাম, চকরিয়া ও কক্সবাজারের আদালতে হাতি হত্যার ১৫টি মামলা বিচারাধীন ছিল। চট্টগ্রাম বন আদালতে ২০১৭ সালের একটি মামলায় ছয়জন, ২০১৮ সালের আরেক মামলায় দুজন এবং ২০১৯ সালের একটি মামলায় চারজন আসামি ছিলেন।
২০২১ সালের ৩০ নভেম্বর চট্টগ্রামের বাঁশখালীর লটমনি পাহাড়ি এলাকায় বৈদ্যুতিক ফাঁদে একটি বন্য হাতির মৃত্যু হয়। পরে সেটিকে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল। বন বিভাগ তদন্ত করে হত্যার অভিযোগে মামলা করে। ওই মামলায় দুই আসামি আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করলে বাঁশখালীর আমলি আদালত জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। বন বিভাগের কর্মকর্তারা তখন বলেছিলেন, হাতি হত্যায় দেশে কোনো আসামিকে কারাগারে পাঠানোর প্রথম ঘটনা এটি।
মামলা না করে জিডিতেই দায় শেষ
হাতি হত্যার ক্ষেত্রে বন বিভাগের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। আইন অনুযায়ী বন কর্মকর্তাদের বন আদালতে প্রসিকিউশন অফেন্স রিপোর্ট বা পিওআর মামলা করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ ঘটনায় তারা মামলা না করে থানায় সাধারণ ডায়েরি করে দায় শেষ করছে। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত ৯ বছরে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ১১৪টি হাতি মারা গেলেও বন আদালতে মামলা হয়েছে মাত্র ১৯টি। থানায় সাধারণ ডায়েরি হয়েছে ৭৫টি।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুর্গম এলাকায় হাতি হত্যার ঘটনায় আসামি শনাক্ত করা কঠিন। আবার লোকজনকে আসামি করে মামলা করলে বন কর্মকর্তা ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এসব কারণেও বন কর্মকর্তাদের অনেকে বন আদালতে মামলা করতে অনাগ্রহী।
বিচারহীনতায় বাড়ছে সহিংসতা
বাংলাদেশে হাতির আবাসস্থল ও চলাচলের করিডর ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। বনভূমি দখল, কৃষিজমি ও বসতি সম্প্রসারণ, সড়ক ও রেলপথ নির্মাণ এবং বিভিন্ন শিল্প ও অর্থনৈতিক অঞ্চল হাতির চলাচলের পথে বাধা তৈরি করছে। তাই খাবারের সন্ধানে হাতি লোকালয়ে ঢুকছে। হাতি তাড়াতে মানুষ ব্যবহার করছে বৈদ্যুতিক ফাঁদ, গুলি ও নানা ধরনের প্রাণঘাতী পদ্ধতি। বন বিভাগের সর্বশেষ হিসাবে ২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে আবাসিক, অনাবাসিক ও বন্দি মিলিয়ে অন্তত ১৪৮টি হাতি মারা গেছে। চলতি বছরে আরও তিনটি মৃত্যুর ঘটনা যুক্ত হলে সংখ্যা দাঁড়ায় ১৫১।
চলতি বছরের ২৫ এপ্রিল রাঙামাটিতে চিকিৎসাধীন একটি হাতির মৃত্যু হয়। এর আগে মার্চে বান্দরবানের বনে তিন মাস বয়সী একটি হাতিশাবক মানুষের হাতে নিহত হয়। ১৯ জানুয়ারি সিলেটে ট্রেনের সঙ্গে সংঘর্ষে একটি বন্দি হাতি মারা যায়। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে মারা যাওয়া ১১৪টি হাতির মধ্যে সাতটি গুলিতে এবং ২৬টি বৈদ্যুতিক ফাঁদে মারা গেছে। দুর্ঘটনায় ১৮টি, অসুস্থ হয়ে ৪০টি, বয়সজনিত কারণে ১৫টি এবং অজ্ঞাত কারণে ১০টির মৃত্যু হয়েছে।
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ আলী রেজা খান বলেন, হাতির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ অনেক সময় আড়াল করা হয়। বিশেষ করে বৈদ্যুতিক ফাঁদ বা গুলিতে মৃত্যুর ঘটনাকে অসুস্থতা কিংবা বার্ধক্যজনিত মৃত্যু হিসেবে দেখানোর অভিযোগও রয়েছে। এ কারণে প্রথমেই বৈদ্যুতিক ফাঁদ বন্ধ করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে হাতির আবাসস্থল ও চলাচলের পথ দখলমুক্ত করতে হবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বন্যপ্রাণী গবেষক মনিরুল এইচ খান বলেন, হাতি রক্ষায় শুধু নতুন প্রকল্প, সচেতনতামূলক প্রচার কিংবা এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম গঠন যথেষ্ট নয়। হাতি হত্যার প্রতিটি ঘটনায় দ্রুত তদন্ত, নির্ভুল ময়নাতদন্ত, মামলা এবং বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী বলেন, হাতি সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল। একে সেভাবেই দেখতে হবে। জনবসতি উচ্ছেদ করে তাদের বসবাসের অভয়াশ্রম গড়ে তুলতে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।