নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষে নারী কর্মীরা অনিরাপদ
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৩১
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) মাঠপর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নারী কর্মীদের প্রতি কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করাসহ হয়রানির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে নারী কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সংস্থাটির নারী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে পৃথক ‘উইমেন হ্যারাসমেন্ট প্রিভেনশন সেল’ গঠনের দাবি জানিয়েছেন।
বিএফএসএ সূত্রে জানা গেছে, সংস্থাটির সাবেক এক নারী বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা উচ্চশিক্ষার জন্য সুইডেনে যান। সেখানে অবস্থানকালে সামাজিক মাধ্যমে তাঁর দেওয়া ব্যক্তিগত ছবি নিয়ে সাবেক কয়েকজন সহকর্মী একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে কুরুচিপূর্ণ ও যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ তাঁর। গত ১১ আগস্ট ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বিষয়টি তুলে ধরেন এবং অভিযুক্তদের নাম উল্লেখ করে ট্যাগ করেন।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, ‘সংগ্রাম সৈনিকদের সঞ্চয়’ নামে ওই হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে তাঁর শরীর, দাম্পত্য ও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করা হয়। গ্রুপটির কিছু স্ক্রিনশট তাঁর কাছে পৌঁছানোর পর তিনি বিষয়টি প্রকাশ্যে আনেন।
এ ঘটনায় রাজশাহীর নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা চিন্ময় প্রামাণিক, সিলেটের সৈয়দ সারফরাজ হোসেন, জামালপুরের আবু নাসের মোহাম্মদ শফিউল্লাহ, রংপুরের মো. লোকমান হোসেন, মৌলভীবাজারের মো. শাকিব হোসাইন, বিএফএসএর সাবেক কর্মকর্তা ও বর্তমানে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ওষুধ তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মাদ আলী জিন্নাহ এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক শাকিল আহম্মেদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রধানদের কাছে ইমেইলে অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী।
পাশাপাশি গত ১১ আগস্ট বিএফএসএর চেয়ারম্যান বরাবর সংস্থাটির সাত নারী কর্মকর্তার স্বাক্ষরিত একটি চিঠি দেওয়া হয়। এতে ওই বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার ঘটনার পাশাপাশি সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ের আরেক নারী কর্মীর তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগের বিষয় তুলে ধরা হয়। চিঠিতে বলা হয়, ওই ঘটনায় বিভাগীয় তদন্ত শুরু হলেও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে নারী কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
এমন পরিস্থিতিতে বিএফএসএর নারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য স্থায়ী ‘উইমেন হ্যারাসমেন্ট প্রিভেনশন সেল’ গঠনের দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযুক্তদের মধ্যে চিন্ময় প্রামাণিক ও সৈয়দ সারফরাজ হোসেন এর আগেও ‘ব্যাড বয়েজ’ নামে একটি গ্রুপের সদস্য ছিলেন বলে বিএফএসএ সূত্র জানিয়েছে। ওই গ্রুপের সদস্যরা সেমিনারের নাম করে বিএফএসএর প্রধান কার্যালয়ের এক কর্মকর্তাকে নিয়ে সরকারি টাকায় সিলেটে প্রমোদ ভ্রমণে গিয়েছিলেন।
বিএফএসএ সূত্রে আরও জানা গেছে, অভিযুক্ত কয়েকজন কর্মকর্তার ‘নবভূমির সংগ্রাম’ নামে আরেকটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ রয়েছে। ওই গ্রুপের আলোচনায় বগুড়ায় ২৪ কাঠা জমি কেনার তথ্য পাওয়া গেছে। গত ২৪ জুন জমি রেজিস্ট্রির জন্য কয়েকজন কর্মকর্তা স্ব স্ব কর্মস্থল থেকে ছুটি না নিয়েই বগুড়ায় গিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযুক্তদের মধ্যে সিলেটের নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা সৈয়দ সারফরাজ হোসেন সমকালকে বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমার কোনো মন্তব্য নাই। জমি রেজিস্ট্রির জন্য যাইনি।’ মোহাম্মাদ আলী জিন্নাহ বলেন, ‘আমি কী বলেছি তা গ্রুপে আছে।’ এরপর তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। শাকিল আহম্মেদ বলেন, ‘আমি কুরুচিপূর্ণ কোনো মন্তব্য করিনি।’ জমি রেজিস্ট্রির জন্য তিনি ছুটি নিয়েই বগুড়ায় গিয়েছিলেন বলেও দাবি করেন।
সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মচারী তাঁর নারী সহকর্মীর প্রতি এমন ভাষা বা আচরণ করতে পারবেন না, যা অশোভন, দাপ্তরিক শালীনতাবিরোধী বা তাঁর মর্যাদাহানিকর। সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী সহকর্মীর বিরুদ্ধে চরিত্রহনন, ডিজিটাল মাধ্যমে কুরুচিপূর্ণ আলোচনা ও অশালীন মন্তব্য অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হতে পারে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধিমালা অনুযায়ী চাকরি থেকে অপসারণ বা বরখাস্ত পর্যন্ত শাস্তির বিধান রয়েছে।
জানতে চাইলে বিএফএসএর চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম সমকালকে বলেন, ‘অভিযোগ এসেছে। তদন্ত করে দোষী প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
- বিষয় :
- নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ