শতভাগ অকৃতকার্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার
ছবি: সমকাল
সাব্বির নেওয়াজ
প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬ | ০৪:৩৯ | আপডেট: ১৬ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৪০
চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় সব শিক্ষার্থী ফেল করায় ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার। প্রাথমিকভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কারণ দর্শাও নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়েছে। কেন সব শিক্ষক মিলে একজন শিক্ষার্থীও পাস করাতে পারেননি তা জানতে চাওয়া হয়েছে। জবাব সন্তোষজনক না হলে এমপিওভুক্তি ও সরকারি স্বীকৃতি বাতিল করা হবে।
এছাড়া শতভাগ ফেল করা ২২৬ মাদ্রাসার অঞ্চলভিত্তিক মাদ্রাসাপ্রধানদের ডেকে ফল খারাপ হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে বলা হয়েছে। আজ রোববার থেকে তাদের মাদ্রাসা বোর্ডে ব্যাখ্যা দিতে হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, শোকজ নোটিশ দিয়ে শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে প্রথমে জানতে চাওয়া হচ্ছে–কেন একজন শিক্ষার্থীও উত্তীর্ণ হতে পারেনি। প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের কাছ থেকে জবাব পাওয়ার পর শিক্ষার্থী সংখ্যা, শিক্ষকসংখ্যা, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক রয়েছে কিনা, নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, অবকাঠামো, ব্যবস্থাপনা এবং আগের বছরগুলোর ফলসহ বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করা হবে। এরপর প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হবে।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সমন্বয়ক ও ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান সমকালকে বলেন, শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের জবাব পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শূন্য পাস করা ৩১২ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২২৬টি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীন। সাধারণ ৯টি শিক্ষা বোর্ডের অধীন এমন বিদ্যালয় রয়েছে ৫৭টি। এছাড়া কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীন ২৯টি ভোকেশনাল প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি। গত বছর কোনো ভোকেশনাল প্রতিষ্ঠান থেকেই শূন্য পাস ছিল না।
মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীন শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের ইতোমধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক মো. ফারুক আহম্মেদ সমকালকে জানান, অঞ্চলভিত্তিক মাদ্রাসাপ্রধানদের ডেকে তাদের প্রতিষ্ঠানের ফল খারাপ হওয়ার কারণ জানতে চাওয়া হবে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলো এমপিওভুক্ত কিনা এবং কী ধরনের সমস্যা রয়েছে, তা চিহ্নিত করা হবে। এরপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হবে।
সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর অধীন শূন্য পাসের বিদ্যালয়ের সংখ্যা গত বছরের ৪৮ থেকে বেড়ে এবার ৫৭টিতে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডে সবচেয়ে বেশি ১৮টি বিদ্যালয় রয়েছে। যশোর বোর্ডে ১১, চট্টগ্রামে ৮, রাজশাহী ও বরিশালে ৫টি করে এবং ময়মনসিংহ বোর্ডে ৪টি বিদ্যালয় থেকে কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি।
অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার্থী নামমাত্র
শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোর ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এসব প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগ থেকে ১৫ জনের কম শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। শতাধিক প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার্থী ছিল পাঁচ থেকে সাতজন। আবার কয়েকটি প্রতিষ্ঠান থেকে মাত্র একজন পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে।
শিক্ষক আছেন, পাস নেই
শূন্য পাস করা কিছু প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার্থীর তুলনায় শিক্ষকসংখ্যা বেশি হওয়ায় সরকারি অর্থ ব্যয়ের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার শ্যামপুর এখলাছিয়া মহিলা দাখিল মাদ্রাসায় ১৫ শিক্ষক থাকলেও, ১০ পরীক্ষার্থীর কেউ পাস করেনি। যশোরের মনিরামপুর উপজেলার হেলাঞ্চি কৃষ্ণবাটি বালিকা বিদ্যালয়ে ৯ জন শিক্ষক থাকলেও, একমাত্র পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। কুড়িগ্রামের তালতলা উচ্চবিদ্যালয়ে ১২ শিক্ষক ও ১২ পরীক্ষার্থী থাকলেও কেউ পাস করেনি। জামালপুরের কদমতলী কারিপাড়া উচ্চবিদ্যালয়ে ১১ শিক্ষক থাকলেও এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া তিন শিক্ষার্থী ফেল করেছে।
তিন বছর ভালো ফল অর্জনের শর্ত দেওয়ার চিন্তা
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, এমপিও বাতিলের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে পরবর্তী কমপক্ষে তিন বছর ভালো ফল করার নির্দিষ্ট শর্ত পূরণের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে তিন বছরের মধ্যে, পরীক্ষার্থীদের অন্তত ৫০ শতাংশকে পাস করানোর শর্ত আরোপের চিন্তা রয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানে ন্যূনতম ৬০ জন শিক্ষার্থী থাকার শর্তও যুক্ত হতে পারে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান পর্যালোচনা করা হবে।
শুধু শাস্তি নয়, কারণও খুঁজে দেখার তাগিদ
শিক্ষাবিদরা বলছেন, শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি কেন এমন ফল হয়েছে, সেটিও বস্তুনিষ্ঠভাবে অনুসন্ধান করা জরুরি। সব প্রতিষ্ঠানের জন্য একই ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে সমস্যার ধরন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে. চৌধুরী সমকালকে বলেন, একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি–এমন ৩১২টি প্রতিষ্ঠান নিয়ে গবেষণা করে কারণ চিহ্নিত করা দরকার। একই সঙ্গে শিক্ষক সংকট দূর করা এবং গ্রাম-শহরের শিক্ষাবৈষম্য কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও ধারাবাহিকভাবে ফল খারাপ হচ্ছে, সেখানে শিক্ষার মানের ভিত্তিতে জবাবদিহি নিশ্চিত করা দরকার। তা না হলে সরকারি অর্থ ব্যয়ের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।
- বিষয় :
- এসএসসি
- ফেল
- শিক্ষা মন্ত্রণালয়
- শোকজ
- এমপিওভুক্তি
- মাদ্রাসা