মিয়ানমারের দাবি
বাংলাদেশে ১০ লাখ রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের তথ্য সঠিক নয়
এ দাবিকে কূটকৌশল বলছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৫৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
মিয়ানমার থেকে ১০ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের তথ্যটি সঠিক নয় বলে দাবি করেছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তাদের দাবি, ঘটনার সময় ৭ লাখ ৪০ হাজারের বেশি বাঙালি মিয়ানমারের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাস করছিল। সেসব বাঙালির মধ্য থেকে দুই লাখ এখনও সেখানেই রয়ে গেছে, আর ৫ লাখ ৪০ হাজারের বেশি বাংলাদেশে পালিয়ে গেছে। ফলে ১০ লাখ প্রবেশের দাবি সঠিক নয়।
গতকাল শনিবার এক বিবৃতিতে এসব তথ্য প্রকাশ করে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি তারা তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গা ফিরিয়ে নিতে রাজি হওয়ার কথা জানায়।
গতকাল রাতে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম সমকালকে বলেন, হঠাৎ মিয়ানমারের তরফ থেকে রোহিঙ্গাদের নিয়ে এমন বক্তব্যে এক ধরনের কূটকৌশল রয়েছে। এর আগে কফি আনান কমিশনে তারা রোহিঙ্গাদের ‘উত্তর আরাকানের মুসলিম জনগোষ্ঠী’ হিসেবে পরিচয় দেওয়ার কথা বলেছিল। এর আগে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া যেসব রোহিঙ্গাকে তারা মিয়ানমারের নাগরিক বলে নিশ্চিত হওয়ার কথা বলেছিল, সেখানেও দেশটি কূটকৌশলের আশ্রয় নেয়। একই পরিবারের কোনো সদস্যকে বলা হয়েছিল মিয়ানমারের নাগরিক; বাকিদের বিষয়ে তারা অস্বীকৃতি জানায়। এ কারণে মিয়ানমারে তাদের ফেরত নেওয়ার বিষয়টি এগোয়নি।
এমদাদুল ইসলাম বলেন, রাখাইনের যে অংশে রোহিঙ্গাদের বসবাস, সেটি এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। তারা রোহিঙ্গাদের আরাকান আর্মির মুখোমুখি করছে কিনা, সে ব্যাপারেও সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।
মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী সমর্থিত সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গতকাল শনিবার এক বিবৃতিতে জানায়, বাংলাদেশে শরণার্থী শিবিরে বসবাসকারী তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গা রাখাইনের বাসিন্দা বলে যাচাই করেছে তারা। নিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নত হলে তাদের ফিরিয়ে নেওয়া হবে।
২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে সামরিক বাহিনীর তীব্র দমনপীড়নের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা। পরে বিষয়টি পরিণত হয় মানবিক সংকটে। জাতিসংঘসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর ওই অভিযানকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করে। এতদিন মিয়ানমার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে গড়িমসি করলেও সম্প্রতি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম জানান, বাংলাদেশ থেকে তিন লাখের বেশি রোহিঙ্গা ফিরিয়ে নিতে রাজি হয়েছে মিয়ানমার। এরও বেশ কিছুটা সময় পর গতকাল শনিবার দেশটির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক তথ্য এলো এ বিষয়ে।
মিয়ানমার জানিয়েছে, জুলাইয়ের শেষে বাংলাদেশের কাছ থেকে পাওয়া ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জন রোহিঙ্গার তালিকা খতিয়ে দেখেছে তারা। তালিকার তিন লাখ আট হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনকে যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং চার হাজার ২৪১ জন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল বলে প্রমাণ মিলেছে।
মিয়ানমারের সরকার বিবৃতিতে জানায়, যাচাই করা রাখাইনের বাসিন্দাদের ফিরিয়ে নিতে তারা বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ অব্যাহত রাখবে। রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও স্থিতিশীল হলে তারা ফিরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু করবে বলেও জানায়।
এদিকে, মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা হান উইন অঙ অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন, এই প্রত্যাবাসন কর্মসূচি শুধু যাচাই করা মিয়ানমারের নাগরিকদের জন্য, যারা মালয়েশিয়ার বিভিন্ন আটক কেন্দ্রে বর্তমানে রয়েছে। সরকার রোহিঙ্গাদের গ্রহণ করবে– এমন খবর প্রত্যাখ্যান করেন তিনি।
‘বেশির ভাগই বাঙালি’
বিবৃতিতে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, ২০১৬ সালের অক্টোবর ও নভেম্বর এবং ২০১৭ সালের আগস্টে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আরসা পুলিশ চৌকি ও ব্যাটালিয়নের ওপর সমন্বিত আক্রমণ চালায়। এর জেরে তারা তাতমাদাওয়ে বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী পদক্ষেপ নেয়।
বিবৃতিতে আরও দাবি করা হয়, সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আরসার হুমকি ও আক্রমণে স্থানীয় জাতিগোষ্ঠীর মানুষরা অন্যান্য শহর ও গ্রামে আশ্রয় নেয় এবং বাঙালিদের বড় একটি অংশ সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।
মিয়ানমারের দাবি, তাদের রেকর্ড অনুসারে আরসা আক্রমণের আগে ৭ লাখ ৪০ হাজারের বেশি বাঙালি বুথিডঙ, মঙডাও ও রাথেডঙয়ে বসবাস করছিলেন। আক্রমণের পর দুই লাখের বেশি বাঙালি রয়ে যায় এবং ৫ লাখ ৪০ হাজারের বেশি বাঙালি বাংলাদেশে পালিয়ে যায়। এই সংখ্যার ভিত্তিতে বলা যায়, রাখাইন থেকে ১০ লাখের বেশি বাস্তুচ্যুতির বয়ানটি সঠিক নয়।
মিয়ানমার আরও দাবি করেছে, বাস্তুচ্যুত বাসিন্দাদের ফিরিয়ে নিতে তারা দুই মাসের মধ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে তিনটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করেছে। চুক্তি অনুযায়ী মিয়ানমার তিনটি ভিন্ন ভিন্ন তারিখে সব ধরনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছিল। তবে কোনো বাস্তুচ্যুত বাসিন্দা মিয়ানমারে ফেরেনি।
- বিষয় :
- রোহিঙ্গা