সাড়ে পাঁচ মাস কমিশন নেই, অকার্যকর হয়ে পড়ছে দুদক
ফাইল ছবি
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬ | ২১:৪৮
সাড়ে পাঁচ মাস ধরে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম ‘কমিশন’ নেই। ফলে দুর্নীতির অভিযোগে নতুন মামলা করা, আদালতে চার্জশিট দেওয়া এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের অর্থ-সম্পদ ক্রোক বা অবরুদ্ধ করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম কার্যত বন্ধ হয়ে আছে। কমিশন না থাকায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমও ধীরে ধীরে অকার্যকর হয়ে পড়ছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
দুদকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ৩ মার্চ থেকে কমিশন শূন্য রয়েছে। দীর্ঘ সময় কমিশন না থাকায় দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান, মামলা ও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না। এতে একদিকে যেমন দুদকের বিপুলসংখ্যক অভিযোগ ও মামলার কার্যক্রম আটকে আছে, অন্যদিকে দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সম্পদ সরিয়ে নেওয়া বা হস্তান্তরের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
দুদকের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, কমিশনের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে বিপুলসংখ্যক অভিযোগ। মামলার সুপারিশ করে শত শত অনুসন্ধান প্রতিবেদন তৈরি হলেও কমিশনের অনুমোদন না থাকায় সেগুলোর ভিত্তিতে মামলা করা যাচ্ছে না। আবার অনেক মামলার তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হলেও কমিশনের অনুমোদন ছাড়া আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা সম্ভব হচ্ছে না।
সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধের সুযোগও নেই
দুদক আইন অনুযায়ী, দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তির সম্পদ অপরাধলব্ধ হিসেবে প্রমাণিত হলে তা রাষ্ট্রের কোষাগারে জমা হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ জন্য মামলার বিভিন্ন পর্যায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তির সম্পদ ক্রোক বা অবরুদ্ধ করার প্রয়োজন হতে পারে।
কিন্তু কমিশন না থাকায় এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। ফলে দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত বা মামলার আসামিরা তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ বিক্রি, হস্তান্তর বা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন।
দুদকের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, দুর্নীতির অর্থ বা সম্পদ দ্রুত সরিয়ে ফেলার সুযোগ তৈরি হলে পরবর্তী সময়ে তা উদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে দুর্নীতি দমনের কার্যক্রম যেমন বাধাগ্রস্ত হয়, তেমনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃষ্টান্ত স্থাপনের সুযোগও কমে যায়।
কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা
দীর্ঘদিন কমিশন না থাকায় দুদকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও হতাশা তৈরি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে এত দীর্ঘ সময় কমিশন শূন্য থাকার নজির নেই বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
একজন কর্মকর্তা বলেন, প্রতিদিনই কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানতে চান, নতুন কমিশন কবে আসবে। কিন্তু কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার বিষয়ে এখনো কোনো নিশ্চিত সময়সীমা নেই।
ছয়জনের নাম পাঠানোর অপেক্ষা
দুদকের তিন সদস্যের কমিশন গঠনের জন্য ছয়জন যোগ্য ব্যক্তির নাম বাছাই করে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাতে গত ২২ জুন সরকার পাঁচ সদস্যের বাছাই কমিটি গঠন করে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল হককে প্রধান করে গঠিত ওই কমিটির সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি, হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারপতি, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সদ্যবিদায়ী সচিব এবং সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান।
তবে কমিটি গঠনের দুই মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো রাষ্ট্রপতির কাছে ছয়জনের নামের সুপারিশ পাঠানো হয়নি বলে জানা গেছে।
ফলে বাছাই কমিটি কবে সুপারিশ করবে, রাষ্ট্রপতি কবে তা অনুমোদন করবেন এবং নতুন কমিশন কবে দায়িত্ব নেবে- এসব বিষয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।
একযোগে পদত্যাগের পর শূন্য কমিশন
গত ৩ মার্চ দুদকের তৎকালীন চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন এবং দুই কমিশনার মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাফিজ আহসান ফরিদ একযোগে পদত্যাগ করেন। এরপর থেকেই কমিশনের তিনটি পদ শূন্য রয়েছে।