ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কূটনীতি

দ্বিধাদ্বন্দ্ব দূর করে বলিষ্ঠ নীতি নিয়ে এগোতে হবে

সরকারের ছয় মাস

দ্বিধাদ্বন্দ্ব দূর করে বলিষ্ঠ নীতি নিয়ে এগোতে হবে
×

এম. হুমায়ুন কবির

এম. হুমায়ুন কবির

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৫৫ | আপডেট: ১৯ আগস্ট ২০২৬ | ১৫:১৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশের পররাষ্ট্রনীতি ও বৈশ্বিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পৌঁছেছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকারপ্রধানের সাম্প্রতিক দুই বড় অর্থনৈতিক শক্তি মালয়েশিয়া ও চীন সফর দেশের জন্য কিছু ইতিবাচক বার্তা এনেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ধারাবাহিক ও ইতিবাচক পথে এগোচ্ছে। তবে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে এক ধরনের দোদুল্যমানতা দেখা যাচ্ছে।

সাম্প্রতিক কূটনৈতিক উদ্যোগগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, এগুলোর কেন্দ্রবিন্দুতে আছে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সাড়া দেওয়া। বিশেষ করে দেশের অর্থনীতিকে পুনরায় চাঙ্গা করা, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা ছিল সরকারপ্রধানের বিদেশ সফর ও দ্বিপক্ষীয় আলোচনার প্রধান লক্ষ্য। কোনো দেশের পররাষ্ট্রনীতির ইতিবাচক সুফল তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া সম্ভব নয়। এ জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও ধৈর্যের প্রয়োজন হয়। তবে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সমন্বিত কৌশল নিয়ে এগোতে পারলে দীর্ঘ মেয়াদে এসব কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ইতিবাচক ফল জাতীয় অর্থনীতিতে দৃশ্যমান হবে। 

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং পূর্ব এশিয়ার দুই বড় অর্থনৈতিক শক্তি মালয়েশিয়া ও চীনে সাম্প্রতিক উচ্চ পর্যায়ের সফরগুলো বাংলাদেশের জন্য বেশ কিছু ইতিবাচক বার্তা নিয়ে এসেছে। এ সফরগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল দেশের অর্থনীতিকে একটি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানো। চীন বাংলাদেশে প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চলে নতুন বিনিয়োগ করতে এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এগিয়ে নিতে প্রবল আগ্রহ প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে মোংলা বন্দরের আধুনিকীকরণের ব্যাপারেও তারা ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। দীর্ঘদিনের আলোচিত তিস্তা নদীবিষয়ক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ সম্পন্ন করতে চীনের কারিগরি সহযোগিতার আশ্বাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তা ছাড়া চীনা নেতৃত্বের পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডোর-সংক্রান্ত প্রস্তাব সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা গেলে তা বাংলাদেশের সামগ্রিক ভূ-অর্থনৈতিক অবস্থান আন্তর্জাতিক বলয়ে শক্তিশালী করে তুলতে পারে।

অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ধারাটি একটি ধারাবাহিক ও ইতিবাচক পথে অগ্রসর হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ প্রতিনিধির আগমন এবং সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বড় একটি ব্যবসায়িক প্রতিনিধি দলের বাংলাদেশ সফর দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য প্রসারের স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ভারসাম্য রক্ষা ও অভ্যন্তরীণ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানি বৃদ্ধিতে সচেষ্ট রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিদ্যমান সম্পর্কের এই ইতিবাচক সুফল পুরোপুরি ঘরে তুলতে হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সুযোগগুলো কীভাবে নিজেদের জাতীয় স্বার্থের উপযোগী করে তোলা যায়, সে সম্পর্কে সুদূরপ্রসারী কৌশল গ্রহণ করতে হবে। ভূরাজনৈতিক মেরূকরণ সামলে নিজস্ব অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারকে প্রাধান্য দেওয়াই এখানে প্রধান চ্যালেঞ্জ।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যমান সম্পর্কে এখনও এক ধরনের অনিশ্চয়তার ছায়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে কূটনৈতিক পর্যায়ে সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা থাকলেও সাম্প্রতিক কূটনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে কিছু জটিলতা ও টানাপোড়েন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনা করলে এখানে বিচ্ছিন্ন অবস্থানের কোনো সুযোগ নেই। ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ও অমীমাংসিত ইস্যুগুলোর টেকসই সমাধানে বাংলাদেশকে অত্যন্ত বলিষ্ঠ ও সুস্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। নিজস্ব সার্বভৌম স্বার্থ ও উদ্বেগের জায়গাগুলো প্রতিবেশীর কাছে স্পষ্টভাবে তুলে ধরার পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য অব্যাহত রাখতে হবে। একই সঙ্গে নিকট প্রতিবেশী হিসেবে পারস্পরিক নির্ভরতা মাথায় রেখে দুই দেশের সম্পর্ককে ইতিবাচক উপায়ে সামনের দিকে পরিচালনা করার বাস্তববাদী উদ্যোগ প্রয়োজন।

মিয়ানমার সীমান্ত পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যায়, দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে এখনও দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন সম্ভব হয়নি। ভূরাজনৈতিক জটিলতার কারণে প্রক্রিয়াটি কিছুটা স্থবির হয়ে পড়লেও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সুচিন্তিত চাপ এবং দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় তৎপরতা অব্যাহত রাখতে হবে। সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য এই কূটনৈতিক সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া ছাড়া বিকল্প পথ নেই। বৈশ্বিক বলয়ে রোহিঙ্গা সংকটকে ক্রমাগত দৃশ্যমান রাখা এবং প্রধান শক্তিগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে কার্যকর সমাধানের পথ উন্মোচনের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যেসব অর্থনৈতিক চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়, সেগুলোর সফল বাস্তবায়ন সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর। বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের সবচেয়ে বড় পূর্বশর্ত হলো দেশে একটি স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ ও রাজনৈতিকভাবে অনুকূল পরিবেশ বজায় রাখা। একই সঙ্গে প্রশাসনিক দক্ষতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা এবং সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কার্যকর সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি। বিনিয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে না পারলে যেখানে দেশীয় উদ্যোক্তারাই নতুন বিনিয়োগে সাহস পান না, সেখানে নতুন বৈদেশিক বিনিয়োগ আশা করা প্রায় অবাস্তব। তাই পুরোনো চিন্তাভাবনা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পরিহার করে বাস্তবতার নিরিখে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।

বৈশ্বিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা, যা অর্থনীতি থেকে শুরু করে প্রযুক্তিতেও সমানভাবে দৃশ্যমান। এ দুই পরাশক্তির সঙ্গে একইভাবে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সুসম্পর্ক টিকিয়ে রাখা যে কোনো উদীয়মান দেশের জন্য ভারসাম্য রক্ষার একটি কঠিন পরীক্ষা। সম্পর্কের এই টানাপোড়েনে কোনো কূটনৈতিক চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে বাংলাদেশ যদি প্রশাসনিক দিক থেকে দক্ষ, রাজনৈতিকভাবে একতাবদ্ধ এবং নীতিগত সিদ্ধান্তে দৃঢ় থাকে, তবে এই ধরনের আন্তর্জাতিক ঝুঁকি সামলানো পুরোপুরি সম্ভব। বিশ্বরাজনীতিতে বহু রাষ্ট্রই নিজেদের সুচিন্তিত পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তির সঙ্গে সফলভাবে সম্পর্ক বজায় রাখছে। বাংলাদেশকেও নিজস্ব জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্রে রেখে রাজনৈতিক সহমত ও দৃঢ় অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ের মাধ্যমে এই আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।

সার্বিকভাবে বিগত মাসগুলোতে বাংলাদেশের বৈদেশিক সম্পর্ক নির্মাণের কার্যদক্ষতা মূল্যায়ন করলে একে একটি মিশ্র চিত্র হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। একদিকে চীন ও মালয়েশিয়ার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ও বাণিজ্য প্রসারের যে ইতিবাচক গতি দেখা গেছে, তা নিঃসন্দেহে সফল। অন্যদিকে ভারতের মতো নিকটতম প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কে এক ধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও অনিশ্চয়তা স্পষ্ট। একটি সুদৃঢ় ও সময়োপযোগী পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নে আমাদের পুরোনো অনুমান বাতিল করে নতুন বাস্তবতার আলোকে সামনের দিকে এগোতে হবে। বৈদেশিক কূটনীতিতে দ্বিধাদ্বন্দ্ব দূর করে বলিষ্ঠ নীতির ওপর ভিত্তি করে এগিয়ে যেতে হবে। তাহলে দেশের অর্থনৈতিক চাঙ্গা ভাব ফিরে আসবে এবং বৈশ্বিক অঙ্গনে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান সুসংহত হবে।

লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত

 

আরও পড়ুন

×