পুষ্প
মনকাড়া কমলা বাউহিনিয়া
সাভারের একটি নার্সারিতে কমলা বাউহিনিয়া ফুল- লেখক
মৃত্যুঞ্জয় রায়
প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৪৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
মাঝে মাঝে কোনো গাছের নাম শুনে দ্বিধায় পড়তে হয়। নামের সঙ্গে তার গোত্র ও প্রজাতিগত পরিচয় ঠিক মেলাতে পারি না। দুই বছর আগে বৈশাখের এক দুপুরে ও শ্রাবণের এক সকালে গিয়েছিলাম সাভারের এক নার্সারিতে। দুবারই গিয়ে একটি মনকাড়া ফুলের দেখা পেয়েছিলাম। গাছটি ছোট, কিন্তু সেই ছোট গাছেই যেন ফুল ফুটে উপচে পড়ছিল।
হলদে, কমলা আর লাল রঙের ফুলের মিশেলে অপূর্ব লাগছে দেখতে। নার্সারির মালী যখন বললেন, ওটা বাউহিনিয়া ফুল, তখনই পড়লাম মহাদ্বন্দ্বে। জানতাম, কাঞ্চন ফুলগুলো বাউহিনিয়া গণের গাছ। কিন্তু এ গাছ তো দেখতে কাঞ্চনগাছের মতো না। এ দেশে গাছটিকে নতুন মনে হলো।
সাভারেও দেখা সেই ফুলগাছের সাধারণ নাম পেলাম Orange Bauhinia বা কমলা বাউহিনিয়া, অন্য নাম ক্লাইম্বিং বাউহিনিয়া; বাংলা নাম জানি না। বাউহিনিয়া মানে কাঞ্চন গণের ও গোত্রের গাছ– এ কথা মানতে বাধ্য। কিন্তু মন কিছুতেই তাকে কাঞ্চন পরিবারের সদস্য হিসেবে মেনে নিতে সায় দিচ্ছিল না। কেননা, গাছ, পাতা ও ফুলের সঙ্গে কাঞ্চন ফুলগুলোর মিল নেই। ফ্যাবাসি গোত্রের সিসালপিনিয়াসি উপগোত্রের এ গাছের একসময় প্রজাতিগত নাম ছিল Bauhinia kockiana. সে কারণেই হয়তো এর সাধারণ নাম দেওয়া হয়েছিল কমলা বাউহিনিয়া। কেননা, এ গাছের ফুলের রং কমলা-হলুদ। লোকমুখে এ দেশে গাছটি বাউহিনিয়া নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। বর্তমানে এর প্রজাতিগত নামকরণ করা হয়েছে Phanera kockiana. কিন্তু গোত্র একই রয়ে গেছে।
কমলা বাউহিনিয়া একটি লতানে বা শায়িত কাষ্ঠল লতানো গাছ। সারাবছরই এ গাছ চমৎকার সবুজ পাতায় ভরা থাকে। লতানোর অবলম্বন পেলে এ গাছ ৩০ মিটার পর্যন্ত লতাতে পারে। যেখানে লতায়, সেখানে অবলম্বনকে আকর্ষী দিয়ে আঁকড়ে ধরে। বেশ ঝোপালো ও শাখায়িত গাছ। শাখার আগায় ও পাশে পাতার কোল থেকে থোকা ধরে গুচ্ছাকারে ফুল ফোটে। ফুলে পাপড়ি থাকে পাঁচটি। পাপড়িগুলো কিছুটা কুঁচকানো ও কিনারা ঢেউ খেলানো। রং হলুদ থেকে কমলা, শেষে লালচে আভা ধারণ করে। ফুলের মাঝখানে তিনটি পুরুষ কেশর থাকে। একই থোকায় হলেও ফুল সব একসঙ্গে ফোটে না। সেজন্য একই থোকায় ফুলের রং হলুদ, কমলা বা লাল-কমলা দেখা যায়। এই রং বৈচিত্র্যই এ ফুলের গাছকে আকর্ষণীয় করেছে। তাছাড়া প্রায় সারাবছর প্রচুর ফুল ফোটে।
এ গাছের পাতা দেখতে খানিকটা তেজপাতা পাতার মতো, সরল, ডিম্বাকার থেকে উপবৃত্তাকার, মসৃণ ও চকচকে বুজ, অগ্রভাগ দীর্ঘ ও সূচালো। পাতা ৭-১৪ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। ফল কাষ্ঠল ও চ্যাপ্টা, পাকা ফল দুভাগে ভাগ হয়ে ফেটে যাওয়া শুঁটি বা শিমের মতো। বীজ গাঢ় বাদামি।
এ গাছের চারা তৈরির জন্য বায়ব দাবা কলম বা গুটিকলম সেরা উপায়। এক থেকে তিন মাসের মধ্যেই গুটিকলম করে চারা তৈরি করা যায়। বসন্ত থেকে গ্রীষ্মকাল গুটিকলম করার ভালো সময়। কাষ্ঠল কাণ্ড কেটে কাটিং করেও চারা তৈরি করা যায়। তবে সে ক্ষেত্রে সফলতার হার কম থাকে, শিকড় গজায় ধীরে ধীরে ও চারা বৃদ্ধি হয় ধীর।
সামান্য অম্লীয় বা লাল মাটিতে এ গাছ ভালো বাড়ে, রোদ চাই ভালো বৃদ্ধি ও ফুলের উজ্জ্বল রঙের জন্য। গাছে অবশ্যই ঠেকনা দিতে হবে। বাগানে মাটিতে ও বড় টব বা ড্রামে লাগানো যায়। টবে পর্যাপ্ত জৈব সার মাটির সঙ্গে মিশিয়ে লাগাতে হয়। দুই বছর পর সে টব বদল করতে হয়। গাছ বেশি বড় হয়ে গেলে ছেঁটে দিতে হয়। কয়েক দিন ঘরে রাখার পর আবার বাইরে বের করে দিতে হয়।
লেখক : কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ
- বিষয় :
- ফুল চাষ