ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সিপিডির সমীক্ষা

পোশাক কারখানার ছাদ থেকে ২৮১৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব

পোশাক কারখানার ছাদ থেকে ২৮১৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব
×

ছবি: ফাইল

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ | ২২:১১ | আপডেট: ২০ আগস্ট ২০২৬ | ২২:৫২

শিল্প কারখানায় ছাদের সৌর বিদ্যুৎ হতে পারে জ্বালানির ভালো উৎস। শুধু তৈরি পোশাকের ৩ হাজার ৩২০টি কারখানার ছাদে ২ হাজার ৮১৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব, যা পোশাক খাতে বিদ্যুতের মোট চাহিদার অন্তত ১৪ শতাংশ জোগান দেওয়া যায়। অথচ বর্তমানে ছাদের সৌর বিদ্যুৎ থেকে পোশাক শিল্পের জোগান মাত্র ৩ শতাংশ। 

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক সমীক্ষায় এই উপাত্ত উঠে এসেছে। আজ বৃহস্পতিবার ‘পোশাক কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা: চীনা প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ সুযোগ’ শিরোনামের এক আলোচনা অনুষ্ঠানে সমীক্ষার তথ্য তুলে ধরা হয়। রাজধানীর মহাখালী ব্র্যাক সেন্টার ইনে আয়োজিত অনুষ্ঠান পরিচালনা ও সভাপতিত্ব করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। সমীক্ষায়ও নেতৃত্ব দেন তিনি। পোশাক খাতের প্রতিনিধি, সরকারি–বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা আলোচনায় অংশ নেন। 

সমীক্ষায় বলা হয়, ছাদ বিদ্যুতের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রয়োজন। এর মধ্যে ৩৭৫টি কারখানার ছাদে এখনই সৌরবিদ্যুৎ বিনিয়োগ করা যায়। এসব কারখানার ছাদ সৌর প্যানেলের জন্য প্রস্তুত। এক হাজার ১৪২ কারখানায় বিনিয়োগ সহায়তা প্রয়োজন। অন্যদিকে ৩৯৭ কারখানায় এ ধরনের বিনিয়োগ করতে প্রস্তুতির প্রয়োজন হবে। এ ধরনের বিনিয়োগ সরকারি প্রতিষ্ঠান অবকাঠামো উন্নয়ন কোম্পানি লিমিটেডের ( ইডকল) সহায়তা নেওয়া যায়। চীনা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও অর্থ ও কারিগরি সহায়তা দিতে প্রস্তুত। তবে ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপনের সরকারি বিভিন্ন সংস্থার অতিরিক্ত খবরদারি ও অকারণ দীর্ঘসূত্রতা বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করছে। সৌর সরঞ্জাম আমদানিতে উচ্চ শুল্কও বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা। এ ধরনের সরঞ্জামের গড় শুল্ক ৪০ শতাংশেও বেশি। 

সিপিডির সমীক্ষাটি পরিচালনায় গ্লোবাল স্যাটেলাইটি ইমেজের মাধ্যমে ৩ হাজার ৩২০টি পোশাক কাখানার ছাদ ও সৌর বিদ্যুতের তথ্য সংগ্রহ করা হয় সমীক্ষায়। সমীক্ষার প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা সহযোগী আবরার আহাম্মেদ ভূঁইয়া ও নূর ইয়ানা জান্নাত। এতে বলা হয়, গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে বস্ত্র ও পোশাক খাতের মোট ৯৭ লাখ বর্গমিটার অব্যবহৃত ছাদ রয়েছে। এই জায়গা সঠিকভাবে ব্যবহার করলে গড়ে এক হাজার ৭৬৮ মেগাওয়াট-পিক (এমডব্লিউপি) থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৮১৫ মেগাওয়াট-পিক ছাদে উৎপাদিত সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। বর্তমানে এই খাতে ব্যবহৃত মোট জ্বালানির মাত্র ৩ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসে। সোলার প্যানেল পুরোদমে চালু হলে এই খাতের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১৪ শতাংশ সৌর বিদ্যুতের মাধ্যমে মেটানো সম্ভব হবে। এত বড় সুযোগ সত্ত্বেও গ্যাস–বিদ্যুতের অভাবে পোশাক কারখানায় উৎপাদন কম হচ্ছে সক্ষমতার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত। 

ছাদ বিদ্যুতে ব্যয় প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতীয় গ্রিড থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কিনতে যে খরচ হয়, ছাদে উৎপাদিত সোলার বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি গড় খরচ পড়বে মাত্র ৩ টাকা ৪ পয়সা গ্রিডের বিদ্যুতের মূল্যের অর্ধেকেরও কম। কারখানার মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ৩০ শতাংশ সৌর বিদ্যুৎ দিয়ে মেটানো সম্ভব হলে প্রতি মাসে সার্বিক বিদ্যুৎ খরচ ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ কমবে। এমনকি মাত্র ১০ শতাংশ চাহিদা মেটালেও খরচ কমে আসবে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। 

পোশাক খাতে ছাদ বিদ্যুতের সফল উদাহরণ হিসেবে দেশের বড় শিল্প গ্রুপ হা–মীম গ্রুপের কথা বরা হয় প্রতিবেদনে। গ্রুপের কালিগঞ্জ ও মাওনায় ডেনিম, স্পিনিং ও টেক্সটাইলসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্রুপে কারখানাগুলো ছাদ বিদ্যুৎ থেকে বড় সহায়তা পাচ্ছে। এসব কারখানার মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ আসে সৌর বিদ্যুৎ থেকে। এই হিস্যা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা আছে গ্রুপের। হা–মীমে এ ধরনের সফল সৌর বিদ্যুতের অর্থায়নের প্রক্রিয়া তুলে ধরা হয় প্রতিবেদনে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত হা–মীম গ্রুপের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ বিভাগের প্রধানের নাম তানুল চক্রবর্তী বলেন, সৌর বিদ্যুৎব্যবস্থা আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। সিলেটে গ্রুপের নিজস্ব চা বাগানের জমি ব্যবহার করেই ৭৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। সেখান থেকে কারখানায় বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। তবে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তিনি বলেন, বিদেশিদের আস্থার সংকট প্রকট। এছাড়া সরঞ্জামের উচ্চ শুল্ক ও অর্থায়নে উচ্চ সুদ হার বড় এ ধরনের উদ্যোগ বড় বাধা। তবে ব্র্যান্ড–ক্রেতাদের কাছে সবুজ জ্বালানির বিষয়ে জবাবদিহিতার জন্য হা–মীম গ্রুপ প্রস্তুত রয়েছে। 

সমীক্ষা প্রতিবেদনে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাতে সৌর বিদ্যুতের ব্যবহার গুরুত্ব তুলে ধরা বলা হয়, বৈশ্বিক ব্র্যান্ড–ক্রেতারা নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে উৎপাদন উৎসাহিত করছে। এইচ অ্যান্ড এম, ইনডিটেক্স, ওয়ালমার্ট, গ্যাপ, ও এম অ্যান্ড এসের মত ব্যান্ড প্রতিষ্ঠান কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের বাধ্যতামূলক শর্তাবলি কার্যকর করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্বন সাসটেইনেবলটি ডিউ ডিলিজেন্স ডাইরেক্টিভসের (ইউসিএসডিডিডি) আওতায় ২০৩৫ সালের মধ্যে ৩৫ শতাংশ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহারের আবশ্যকতা রয়েছে।

আলোচনায় বিকেএমইএর পরিচালক মিনহাজ উল হক বলেন, জ্বালানি সংকটে তুরস্কে ৫ হাজার কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। সরকারকে বাংলাদেশের পরিণতি সম্পর্ক ভাবতে হবে। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী স্বপন কুমার বণিক বলেন, বর্তমানে ৬৪১টি সেচ পাম্প সৌর বিদ্যুতে চলছে। আগামী সারা দেশের সব সেচ পাম্প এই সুবিধার আওতায় আনা হবে।

বাংলাদেশ টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি সমিতির সহসভাপতি জাহিদুল আলম বলেন, বাণিজ্যিকভাবে প্যানেল আমদানির ক্ষেত্রে সাড়ে ১৩ শতাংশ শুল্কের কথা বলা হলেও প্রতি কেজিতে তিন ডলার করে শুল্কায়ন করা হচ্ছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ আহমেদ বলেন, সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা টেকসই ও নবানযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা) নিজের কাজ নয় এরকম অনেক কাজ করে এ কারণে তারা নিজের প্রকৃত কাজ করতে পারে না।

আরও পড়ুন

×