সিপিডির সমীক্ষা
পোশাক কারখানার ছাদে ২৮১৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব
এই খাতের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার অন্তত ১৪ শতাংশ মেটানো যাবে
আলোচনা অনুষ্ঠানে সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম (ডানে) - সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:৩১ | আপডেট: ২১ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:৪৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের মধ্যে জ্বালানির নতুন ও টেকসই উৎস হতে পারে শিল্পকারখানাগুলোর ছাদ। শুধু তৈরি পোশাকের তিন হাজার ৩২০টি কারখানার ছাদ ব্যবহার করে দুই হাজার ৮১৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। এতে এই খাতের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার অন্তত ১৪ শতাংশ মেটানো যাবে। বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে সৌরবিদ্যুৎ থেকে পোশাকশিল্পের জোগান মাত্র ৩ শতাংশ।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক সমীক্ষায় এই তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ‘পোশাক কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা: চীনা প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ সুযোগ’ শিরোনামের এক আলোচনা অনুষ্ঠানে সমীক্ষার তথ্য তুলে ধরা হয়। রাজধানীর মহাখালী ব্র্যাক সেন্টার ইনে আয়োজিত অনুষ্ঠান পরিচালনা ও সভাপতিত্ব করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
সমীক্ষায় বলা হয়, পোশাক খাতের ৯৭ লাখ বর্গমিটার ছাদের এই সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রয়োজন। বর্তমানে ৩৭৫টি কারখানার ছাদ সৌর প্যানেল স্থাপনের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত এবং আরও এক হাজার ১৪২টি কারখানায় বিনিয়োগ সহায়তা প্রয়োজন। এ ধরনের উদ্যোগে সরকারি প্রতিষ্ঠান ইডকল এবং চীনা বিভিন্ন সংস্থা অর্থ ও কারিগরি সহায়তা দিতে প্রস্তুত। তবে সরকারি সংস্থাগুলোর দীর্ঘসূত্রতা এবং সৌর সরঞ্জাম আমদানিতে ৪০ শতাংশেরও বেশি শুল্ক এই বিনিয়োগের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সমীক্ষার প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা সহযোগী আবরার আহাম্মেদ ভূঁইয়া ও নূর ইয়ানা জান্নাত। এতে বলা হয়, দেশে বস্ত্র ও পোশাক খাতের মোট ৯৭ লাখ বর্গমিটার অব্যবহৃত ছাদ রয়েছে। এই জায়গা সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এক হাজার ৭৬৮ মেগাওয়াট-পিক (এমডব্লিউপি) থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ দুই হাজার ৮১৫ মেগাওয়াট-পিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। বর্তমানে এই খাতে ব্যবহৃত মোট জ্বালানির মাত্র ৩ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসে। সোলার প্যানেল পুরোদমে চালু হলে এই খাতের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১৪ শতাংশ সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে মেটানো সম্ভব হবে।
ছাদ বিদ্যুতে ব্যয় প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতীয় গ্রিড থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কিনতে যে খরচ হয়, সৌরবিদ্যুতে ইউনিটপ্রতি গড় খরচ পড়বে মাত্র ৩ টাকা ৪ পয়সা। কারখানার বিদ্যুৎ চাহিদার ৩০ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে মেটানো সম্ভব হলে প্রতি মাসে বিদ্যুৎ খরচ ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ কমবে।
প্রতিবেদনে পোশাক খাতে সৌরবিদ্যুতের সফল উদাহরণ হিসেবে হা-মীম গ্রুপের চিত্র তুলে ধরা হয়। গ্রুপটির কালীগঞ্জ ও মাওনার ডেনিম, স্পিনিং ও টেক্সটাইল কারখানাগুলোয় চাহিদার ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ বিদ্যুৎ আসছে ছাদ থেকে। অনুষ্ঠানে হা-মীম গ্রুপের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের প্রধান তানুল চক্রবর্তী জানান, সিলেটে তাদের নিজস্ব চা বাগানের জমি ব্যবহার করে ৭৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে উচ্চ শুল্ক, চড়া ব্যাংক সুদ ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটকে তিনি প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন।
সমীক্ষায় বলা হয়, এইচ অ্যান্ড এম, ইনডিটেক্স, ওয়ালমার্ট ও গ্যাপের মতো বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে কঠোর শর্ত কার্যকর করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতি অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে পোশাক খাতে ৩৫ শতাংশ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে বিকেএমইএর পরিচালক মিনহাজ উল হক বলেন, জ্বালানি সংকটে ইতোমধ্যে তুরস্কে পাঁচ হাজার কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। সরকারকে বাংলাদেশের পরিণতি সম্পর্ক ভাবতে হবে। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী স্বপন কুমার বণিক বলেন, বর্তমানে ৬৪১টি সেচ পাম্প সৌরবিদ্যুতে চলছে। আগামীতে সারাদেশের সব সেচ পাম্প এই সুবিধার আওতায় আনা হবে।
বাংলাদেশ টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি সমিতির সহসভাপতি জাহিদুল আলম বলেন, বাণিজ্যিকভাবে প্যানেল আমদানির ক্ষেত্রে সাড়ে ১৩ শতাংশ শুল্কের কথা বলা হলেও প্রতি কেজিতে তিন ডলার শুল্কায়ন করা হচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ আহমেদ বলেন, সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা টেকসই ও নবানযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ নিজের কাজ নয় এমন অনেক কাজ করে। এ কারণে তারা প্রকৃত কাজ করতে পারে না।